হাই-ভ্যালু পলিয়েস্টার ইয়ার্ন উৎপাদন সম্প্রসারণে ৭.৫ মিলিয়ন ডলার নতুন বিনিয়োগ করছে টিকে গ্রুপ
হাই-ভ্যালু পলিয়েস্টার ইয়ার্ন উৎপাদনের লক্ষ্যে নতুন করে ৭.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে মডার্ন সিনটেক্স লিমিটেড। এই সম্প্রসারণ প্রকল্পের জন্য প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) থেকে নতুন জমি বরাদ্দ পেয়েছে।
টিকে গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান মডার্ন সিনটেক্স ইতোমধ্যে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ন্যাশনাল স্পেশাল ইকোনমিক জোন (এনএসইজেড)-এ পলিয়েস্টার ইয়ার্ন উৎপাদন করছে। উৎপাদন আরও বাড়াতে একই অর্থনৈতিক অঞ্চলে তারা নতুন করে ৩.৭৫ একর জমি ইজারা নিয়েছে।
১৫ এপ্রিল ঢাকায় বেজা কার্যালয়ে এ সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠিত হয়। চুক্তির আওতায় এই বিনিয়োগ উচ্চমূল্যের পলিয়েস্টার সুতা উৎপাদন সম্প্রসারণে সহায়তা করবে, রপ্তানিমুখী খাতে মূল্য সংযোজন বাড়াবে এবং দেশীয় বাজারে আমদানি বিকল্প পণ্য উৎপাদনকে উৎসাহিত করবে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে মডার্ন সিনটেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু সুফিয়ান চৌধুরী বলেন, 'বেজার সহযোগিতায় এনএসইজেডে আমরা আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি, যা আমরা এখন দ্রুত সম্প্রসারণ করছি।'
উন্নত মানের পলিয়েস্টার ইয়ার্ন টেকসই, মজবুত ও বহুমুখী ব্যবহারের জন্য টেক্সটাইল ও শিল্পখাতে বহুল ব্যবহৃত একটি কাঁচামাল। এটি তুলার সঙ্গে মিশিয়ে সুতা তৈরি করা হয় এবং টি-শার্ট, স্পোর্টসওয়্যার, পর্দা, বেডশিট, টায়ার কর্ড ও দড়িসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশের পলিয়েস্টার ও সিনথেটিক ইয়ার্নের বড় একটি চাহিদা চীন, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত থেকে আমদানি করে পূরণ করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশীয় উৎপাদন বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, সরবরাহ সময় কমানো এবং শিল্পখাতে ব্যয় হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)-এর সহ-সভাপতি (অর্থ) মিজানুর রহমান বলেন, দেশে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প এখনো পর্যাপ্ত নয় এবং হাই-ভ্যালু পলিয়েস্টার ইয়ার্ন উৎপাদনে বিনিয়োগ এই ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি আরও বলেন, টিকে গ্রুপের মতো বড় শিল্পগোষ্ঠীর এ ধরনের উদ্যোগ ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করছে। 'নীতিগত সহায়তা ও অবকাঠামো উন্নয়ন নিশ্চিত হলে আরও উদ্যোক্তা এ খাতে আসবেন, যা ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শক্তিশালী করবে এবং পোশাক শিল্প সম্প্রসারণে সহায়ক হবে।'
বর্তমান সুতা উৎপাদন
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান, এনএসইজেডে তাদের বিদ্যমান কারখানাটি প্রায় ১,৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে জার্মানির অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্থাপন করা হয়েছে। এটি দেশের প্রথম আমদানি বিকল্প কন্টিনিউয়াস পলিমারাইজেশন প্ল্যান্ট এবং এ ধরনের ম্যান-মেড ফাইবার উৎপাদনকারী একমাত্র প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠানটির দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৪৬০ টন। এখানে পলিয়েস্টার ড্র টেক্সচার্ড ইয়ার্ন, ফুললি ড্রন ইয়ার্ন, পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার এবং পলিইথিলিন টেরেফথ্যালেট চিপসসহ আমদানি বিকল্প পণ্য উৎপাদন করা হয়, যা এসব পণ্যের অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৪৫ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম।
দেশীয় বাজারে মডার্ন সিনটেক্স স্কয়ার টেক্সটাইলস, ডিবিএল গ্রুপ, ইপিলিয়ন গ্রুপ, এনভয় গ্রুপ এবং ফকির ফ্যাশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাদের পণ্য সরবরাহ করে।
টিকে গ্রুপের পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রায় ১২০ জনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তিনি আরও জানান, বিদ্যমান মডার্ন সিনটেক্স লিমিটেড কারখানা থেকে দেশীয় বাজারে সরবরাহের পাশাপাশি ইতোমধ্যে প্রায় ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, তুলার বিকল্প হিসেবে বৈশ্বিক বাজারে ম্যান-মেড ফাইবারের চাহিদা বাড়ছে, ফলে হাই-ভ্যালু পলিয়েস্টার ইয়ার্ন উৎপাদন সম্প্রসারণ সময়োপযোগী উদ্যোগ।
বেজার নির্বাহী সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) সালেহ আহমেদ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, দেশীয় শিল্পগোষ্ঠীর এ ধরনের বিনিয়োগ আমদানি নির্ভরতা কমাতে সহায়ক হবে। তিনি বলেন, শিল্পায়নের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে বেজা প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা অব্যাহত রাখবে।
বেজার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এনএসইজেডে প্রায় ১৫টি শিল্প প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে রয়েছে এবং আরও প্রায় ২০টি নির্মাণাধীন। ২৫ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকা জুড়ে গড়ে ওঠা এই অঞ্চলকে দেশের বৃহত্তম পরিকল্পিত অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে উন্নয়ন করা হচ্ছে।
