পাঁচ আলোকচিত্রীর চোখে: ভাষা আন্দোলন
ভাষার দাবিতে ছাত্র-জনতার মিছিল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো কলাভবনের আমতলা থেকে ছাত্ররা মিছিল নিয়ে যাবে সেক্রেটারিয়েটের দিকে। এই আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী আবুল জামাল মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ। আবাসিক ছাত্র হিসেবে তিনি থাকেন ফজলুল হক হলে। এই হলই ভাষা আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র। হলে রাত জেগে বন্ধুদের নিয়ে লিখলেন প্রতিবাদী পোস্টার। পরদিন ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভোর বেলা কলাভবনে গিয়ে লাগাতে শুরু করলেন পোস্টার। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছাত্র-জনতার পদচারণে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে আমতলা। যখন মিছিল বের হবে তার আগমুহূর্তে হঠাৎ ক্যামেরাটির কথা মনে হয় তকীয়ূল্লাহর। এক দৌড়ে হলে গিয়ে ক্যামেরাটি নিয়ে আসেন আমতলায়। আমতলায় আসতে আসতেই সেক্রেটারিয়েট অভিমুখে মিছিল শুরু হলো। তকীয়ূল্লাহ মিছিলটিকে এমনভাবে তার বক্স ক্যামেরায় ধরলেন যেন মিছিলকারীদের সঙ্গে পোস্টারও দেখা যায়। পোস্টারে লেখা―'শিক্ষা ও কৃষ্টির মূলে কুঠারাঘাত'।
মিছিলের সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে চলছেন তকীয়ূল্লাহ। মিছিলটি কার্জন হলের ভেতর দিয়ে হাইকোর্ট এলাকায় গিয়ে পৌঁছে। সেক্রেটারিয়েটের প্রবেশমুখ আবদুল গণি রোডে সারিবদ্ধ পুলিশ। তাদের হাতে থ্রি নট থ্রি রাইফেল। পরিবেশটা বেশ থমথমে। ঝটপট কয়েকটি ছবি তুললেন তকীয়ূল্লাহ। এর মধ্যে সেক্রেটারিয়েটের সামনে ছাত্রদের উপর পুলিশের লাঠিচার্জ শুরু হয়ে গেছে। তাদের মিছিলটি তোপখানা রোডের গেট দিয়ে সেক্রেটারিয়েটে ঢোকার চেষ্টা করে। পুলিশ লাঠিচার্জের মাধ্যমে এই মিছিলটিও ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ছাত্ররাও বিক্ষুব্ধ হয়ে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। সবকিছুর নির্দেশ দিচ্ছিলেন আইজি জাকের হোসেন। রাস্তায় পাশেই পড়ে ছিল একটি মরা গরুর মাথা। হাতের কাছে ইট না পেয়ে আইজির দিকে গরুর মাথাই ছুড়ে মারেন। পুলিশ তাকে ধরার জন্য এগিয়ে আসে। তিনি ভাবলেন, এখন যদি ধরা পড়ে যান, তাহলে মূল্যবান ছবিগুলো চিরতরে নষ্ট হয়ে যাবে। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি পালাতে সক্ষম হলেন। বাসায় গিয়ে মাকে বললেন ক্যামেরাটি লুকিয়ে রাখতে।
ঘণ্টাখানেক পর তিনি আবার ছুটে এলেন রমনা পোস্ট অফিসের কাছে। ওখানে ছাত্রদের সঙ্গে তিনিও পিকেটিং করতে থাকেন। এ সময় পুলিশ বেশ কয়েকজন ছাত্রকে আটক করে। পুলিশ তাকেও আটক করার চেষ্টা করে। তিনি পালিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে চলে আসেন। পরে ডিআইজি ওবায়েদুল্লাহ তাকে ক্যাম্পাস থেকে আটক করে। সেদিন শত শত ছাত্রকে আটক করে কয়েকটি ট্রাকে ভরে তাদের টঙ্গীর কাছে নিয়ে যায়। সারা দিন আটকে রেখে রাতে তাদের বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে ছেড়ে দেয়। ছাড়া পেয়ে তকীয়ূল্লাহ যখন হলে ফেরেন, তখন বেশ রাত।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নয় ছেলেমেয়ের ষষ্ঠ সন্তান মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ। ১৯২৬ সালের ৪ নভেম্বর দীপাবলির রাতে তার জন্ম। ১৯৪৩ সালে যখন ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন, তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। ঢাকায় তখন একটু একটু করে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াচ্ছে। মাঝে মাঝেই হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে দাঙ্গা বেধে যাচ্ছে। সেই সময় বড় ভাই মুহম্মদ সফিয়ূল্লাহর কাছ থেকে তিনি একটি ক্যামেরা পান। তার মাধ্যমেই কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে তকীয়ূল্লাহর যোগাযোগ। ১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের সভা ডাকা হলো। কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী হিসেবে তকীয়ূল্লাহ ও তার বন্ধুরা সেই সভায় উপস্থিত হন। ওই বছরের শেষের দিকে বাংলা ভাষার দাবিকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য 'তমদ্দুন মজলিশ' নামে একটি সংগঠন গড়ে ওঠে। তকীয়ূল্লাহ ছিলেন সেই সংগঠনের সদস্য। ঢাকা মেডিকেল কলেজের পুব পাশে সেই সুরত জামাল মেসের দোতলায় তমদ্দুন মজলিশের অফিসঘরে ভাষার দাবিতে জনসমক্ষে তুলে ধরতে প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম, ড. মুস্তাফা নূরউল ইসলামসহ দলীয় কর্মীদের সঙ্গে ভাঙা টেবিলে বসে প্রচারপত্র ও পোস্টার লিখতেন তকীয়ূল্লাহ।
১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে ভাষা ও শ্রমিক আন্দোলনকে সংগঠিত করতে নারায়ণগঞ্জে গিয়ে গ্রেপ্তার হন তকীয়ূল্লাহ। এ খবর দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছালে কর্তৃপক্ষ তাকে জামিনে ছাড়িয়ে আনেন। কয়েক দিনের মধ্যেই জানাজানি হয়ে যায়, তিনি নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী। এর সত্যতা পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে বহিষ্কার করে। কয়েক মাসের মধ্যেই তার নামে হুলিয়া জারি হয়। তখন পার্টির পক্ষ থেকে তাকে 'আন্ডারগ্রাউন্ডে' চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই শুরু হয় তার পলাতক জীবন। ওই সময় তাকে গ্রেপ্তারের জন্য পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে সরকার। ১৯৫১ সালে বাবা কমিউনিস্ট পার্টির ঢাকা জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ঢাকেশ্বরী কটন মিলে ভাষা আন্দোলনের প্রচার চালাতে গিয়ে তিনি, শহীদুল্লা কায়সার, মোহাম্মদ তোহাসহ কয়েকজন ছাত্রনেতা গ্রেপ্তার হন। ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত বাবা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজবন্দী ছিলেন। তাই তার পক্ষে বায়ান্নর ছবি তোলা সম্ভব হয়নি।
মৃত্যুর নয় মাস আগে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে 'পলাতক জীবনের বাঁকে বাঁকে' শিরোনামে তার স্মৃতিকথার একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ভাষা আন্দোলনে অবদানে বিশেষ অবদান রাখায় ২০১৮ সালে তাকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হয়।
ঢাকায় প্রথম ধর্মঘট
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকায় প্রথম ধর্মঘট পালিত হয়। সেদিন পুলিশের বর্বর হামলায় সেক্রেটারিয়েটের সামনের পথ রক্তে রঞ্জিত হয়। কারাগার ভরে যায় সংগ্রামী ছাত্রদের গ্রেপ্তারের কারণে। ওই দিন প্রতিবাদের যে ভিত রচিত হয়, তারই পথ ধরে আসে বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি। আটচল্লিশের সেই উত্তাল দিনের নানা মুহূর্ত কোডাক ফোল্ডিং ক্যামেরায় ধারণ করেছিলেন শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুব। তার তোলা ভাষা আন্দোলনের ওই ছবিগুলো হয়ে ওঠেছিল পাকিস্তানি স্বৈর সিদ্ধান্তের বিপরীতে প্রতিবাদের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। ভাষা আন্দোলনের গবেষণায় তার ছবি বারবার ব্যবহৃত হলেও কোনো গবেষক বা ঐতিহাসিকের লেখায় এই আলোকচিত্রীর অবদানের কথা উঠে আসেনি। ফলে ভাষা আন্দোলনে তার ত্যাগের মহিমা কিংবা অসম সাহসের গল্প দীর্ঘকাল মানুষের কাছে অজানা থেকে গেছে। এই প্রজন্মের কেউ এই সাহসী আলোকচিত্রীর নামটি পর্যন্ত জানে না।
আটচল্লিশের রক্তাক্ত অধ্যায় যে ইয়াকুব ক্যামেরায় ধরা তার প্রমাণ পাই বাংলা একাডেমিতে পুরোনো পত্রিকার ফাইল ঘাঁটতে গিয়ে। ১৯৭৪ সালের ৭ জুন দৈনিক বাংলার শেষ পৃষ্ঠায় একটি বিশেষ প্রতিবেদনের সঙ্গে ইয়াকুবের তোলা তিনটি দুর্লভ ছবি ছাপা হয়। প্রথম ছবিতে দেখা যায়―আহত ছাত্রনেতা শওকত আলীকে রিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন শেখ মুজিবুর রহমান। দ্বিতীয় ছবিটি হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্র সমাবেশের। ছবিটি ১৯৪৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তোলা বলে ক্যাপশনে উল্লেখ করা হয়। তৃতীয় ছবিটি হলো সেক্রেটারিয়েটের এক নম্বর গেটে আহত ছাত্রনেতা মোহাম্মদ বায়তুল্লাহর (দেশ স্বাধীনের পর বাংলাদেশের প্রথম ডেপুটি স্পিকার)। তাকে ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন কয়েকজন ছাত্রনেতা। আহত শওকত আলীর ছবিটি সবার দেখা হলেও বায়তুল্লাহ ও আমতলার সমাবেশ―এই ছবি দুটি দীর্ঘকাল লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল।
শওকত আলী ও শেখ মুজিবের ছবিটির একটি খণ্ডিত অংশ ফ্রেমবন্দি অবস্থায় দেয়ালে টাঙানো আছে বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসে ভাষা আন্দোলন জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এবং শহীদ আবুল বরকত স্মৃতি জাদুঘর ও সংগ্রহশালায়। প্রদর্শিত ছবিটির নিচে ঘটনার উল্লেখ থাকলেও আলোকচিত্রীর নাম নেই। এ ছাড়া ভাষা আন্দোলন নিয়ে এখন পর্যন্ত যত বই বের হয়েছে, তার কোনোটিতেই এই ছবির আলোকচিত্রীর নাম উল্লেখ করা হয়নি। কোনো কোনো বইয়ে দায়সারাভাবে লেখা হয়েছে 'সংগৃহীত'। দৈনিক বাংলায় ছবিটির ক্রেডিট না ছাপা হলে এই আলোকচিত্রীর নাম কিংবা তার অবদানের কথা অন্ধকারে হারিয়ে যেত।
আটচল্লিশের ভাষা আন্দোলনের একমাত্র আলোকচিত্রী মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ―এ কথা বহুল প্রচারিত। জীবদ্দশায় তকীয়ূল্লাহ ভাষাসংগ্রাম নিয়ে তার অবদানের কথা লিখে গেছেন। চিহ্নিত করে গেছেন তার তোলা ছবিগুলোও। ফলে আটচল্লিশের ভাষাসংগ্রামে অন্য যেসব ছবি বিভিন্ন প্রকাশনায় বেনামে দেখা যেত, সেগুলো কার তোলা―এই প্রশ্নের উত্তর এত দিন ছিল অমীমাংসিত। দৈনিক বাংলার পাতায় ইয়াকুবের তোলা ছবিগুলো ছাপা হওয়ার কারণে এই অমীমাংসিত বিষয়টির সমাধানের পথ তৈরি হলো। দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত তিনটি ছবি ছাড়া ইয়াকুবের বাকি ছবিগুলো আর কখনোই দেখা সম্ভব নয়। কারণ, অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে তার সারা জীবনের কাজ।
ইয়াকুবের কথা আমি প্রথম জানতে পারি বঙ্গবন্ধুর 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' বইয়ে। ছেচল্লিশের দাঙ্গা নিরসনে তার তোলা মর্মস্পর্শী ছবিগুলো কী প্রভাব ফেলেছিল, সে সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন শেখ মুজিব। শেখ মুজিবের লেখা পড়েই আমি ইয়াকুবের ব্যাপারে কৌতূহলী হয়ে উঠি। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে যাই সাপ্তাহিক বিচিত্রার ১৯৯০ সালের ঈদসংখ্যা। ২০ এপ্রিল প্রকাশিত ঈদসংখ্যায় 'সংবাদ চিত্রগ্রাহকদের স্মৃতি: স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজ' শিরোনামে আসিফ নজরুলের একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। আসিফ নজরুলের প্রবন্ধ পাঠে জানতে পারি, দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে ইয়াকুবের নিযুক্তির মাধ্যমে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে পিআইডির ফটোগ্রাফি সেকশনের যাত্রা শুরু হয়।
ইয়াকুবের জন্ম ১৯২৭ সালে, কলকাতায়। ১৯৪৫ সালে স্কুলে পড়ার সময় এক খ্রিষ্টান যুবকের কাছ থেকে বিশ টাকা দিয়ে কোডাকের বি-টু সাইজের ফোল্ডিং ক্যামেরা কিনে তিনি ফটোগ্রাফি শুরু করেন। তিনি যখন অষ্টম বা নবম শ্রেণির ছাত্র তখন দাঙ্গার ভয়াবহতা তার মনে ভীষণভাবে দাগ ফেলে। তখন কলকাতার কিছু কিছু এলাকায় হিন্দুরা নির্মমভাবে মুসলমানদের হত্যা করতে লাগল। ইয়াকুব সেসব নির্মমতার ছবি তুলতে শুরু করেন। ছবি তুলে পাকসার্কাসে এক মুসলমানের স্টুডিওতে গোপনে নেগেটিভ ডেভেলপ ও ছবি প্রিন্ট করতেন। ওই সময় বিহারে ব্যাপকভাবে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। মুসলিম লীগের একটি স্বেচ্ছাসেবী দলের সঙ্গে তিনি সেখানে গেলেন।
বিহারের দাঙ্গায় নিহতদের ছবি তোলার জন্য একদিন রেডক্রসের কর্মী সেজে তিনি এক হাসপাতালে প্রবেশ করলেন। হাত-পা ভাঙা, মাথা গুঁড়িয়ে দেওয়া লাশের ছবি তুললেন। মেয়েদের অনেকের স্তন কেটে ফেলা হয়েছে, ছোট ছোট বাচ্চাদের হাত-পা ভেঙে থেঁতলে দেওয়া হয়েছে―এসব ছবি তুলতে তুলতে তিনি আবেগে বিহ্বল হয়ে পড়েন। এ সময় তাদের দলের একজন এসে বললেন, 'হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ছবি তোলার ঘটনা টের পেয়ে গেছে। এখনই পালাতে হবে।' এই কথা শুনে ক্যামেরা ব্যাগে ভরে অন্য দিকের দরজা দিয়ে পালাতে সক্ষম হন ইয়াকুব। এরপর বিহারে যত দিন ছিলেন, আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের গাড়িতে করে ছবি তুলেছেন। ছবিগুলো তখনকার মুসলিম সমাজে বেশ প্রশংসিত হয়। ছবি তোলার ঘটনা জানাজানি হয়ে যাওয়ায় পাড়ার হিন্দু ছেলেরা ইয়াকুবের ওপর খেপে ওঠে। তখন দেশভাগ হয়ে গেছে। ইয়াকুব সিদ্ধান্ত নিলেন ঢাকায় চলে আসবেন। আসার আগে পাকিস্তানের ডন পত্রিকার ঠিকানায় ডাকযোগে দাঙ্গার কিছু ছবি পাঠালেন।
ঢাকায় এসে নবাবপুর হাইস্কুলের রিফিউজি ক্যাম্পে উঠলেন। একদিন রাস্তায় হাঁটছিলেন। খাজা শাহাবুদ্দিন তখন পূর্ব পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী। মন্ত্রীর প্রাইভেট সেক্রেটারি আবদুর রশীদ কলকাতায় থাকতেই ইয়াকুবকে চিনতেন। ইয়াকুবকে দেখেই তিনি গাড়ি থামালেন। কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন। চাকরি-বাকরি নাই শুনে তিনি ইয়াকুবকে তথ্য মন্ত্রণালয়ের ফটোগ্রাফার পদে আবেদন করতে বললেন। আবেদন করার কিছু দিনের মধ্যেই তার চাকরি হয়ে যায়। পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ফটোগ্রাফার হিসেবে ইয়াকুবের এই নিযুক্তি ছিল পিআইডির প্রথম নিয়োগ। ছবি তোলার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে তাকে একটি রোলিফ্লেক্স ক্যামেরা দেওয়া হয়।
১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি যে ছবি তুলেছিলেন, সে বিষয়টি কেমন করে যেন পিআইডি কর্মকর্তারা জেনে যান। ফলে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের শুরুতে তার উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। ১৯৬৬ সালে তাকে রাওয়ালপিন্ডিতে বদলি করা হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সেখানে আটকে পড়েন ইয়াকুব। দেশ স্বাধীনের পর দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে, খচ্চরে চরে, ট্রাকে করে পাকিস্তানের সীমান্ত পার হয়ে আফগানিস্তানে প্রবেশ করেন। সেখান থেকে দিল্লি হয়ে ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশে আসেন। পাকিস্তান থেকে পালানোর তার সমস্ত ছবি ও নেগেটিভ একজন বাঙালি সহকর্মীর কাছে রেখে আসেন। কিছুদিন পর সেই সহকর্মী তার এক আত্মীয়ের মাধ্যমে ছবি ও নেগেটিভ পাঠান ইয়াকুবের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। কিন্তু কাস্টমস চেকের ভয়ে সেই লোক সমস্ত ছবি ও নেগেটিভ পুড়িয়ে ফেলেন। এই কথা মনে করে মাঝে মাঝে নিজেকে রিক্ত মনে করতেন ইয়াকুব।
একুশের উত্তাল সময়
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সকালবেলা যখন ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র রফিকুল ইসলামের মনে হয়, এই ঐতিহাসিক ঘটনার ছবি তুলে রাখা দরকার। তার ছিল একটি ভয়েগল্যান্ডার ফোল্ডিং ক্যামেরা। তাতে এক রোল ফিল্মে আটটি ছবি তোলা যায়। ক্যামেরায় এক রোল ফিল্ম লোড করে আর পকেটে আরেকটি রোল নিয়ে তিনি ছুটলেন পুরোনো কলাভবনের আমতলায়। একুশের সকালে কলাভবন প্রাঙ্গণে সভা শুরু হয়। ওই সভা এতটাই জনাকীর্ণ ছিল যে প্রাঙ্গণ থেকে তার পুরোটা তোলা যাচ্ছিল না। এই ছবির টপ ভিউ তুলতে হলে তাকে কলাভবনের ছাদে উঠতে হবে। কিন্তু দোতলা এই ভবনটির ছাদে ওঠার কোনো সিঁড়ি ছিল না, ছিল একটি ফোকর। ওই ফোকর দিয়ে বন্ধুরা তাকে ছাদে উঠিয়ে দিলেন। রৌদ্রোজ্জ্বল ফাল্গুনের দুপুরে ওই ছাদ থেকে তিনি ছাত্রসভার এক রোল ছবি তুললেন। এরপর একটু ছায়ায় গিয়ে শার্টের নিচে ক্যামেরা রেখে বদলে নিলেন ফিল্ম।
বেলা ১১টার দিকে সিদ্ধান্ত হলো ১৪৪ ধারা ভঙ্গের। শিক্ষার্থীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার জন্য কলাভবনের সিংহদ্বারের বন্ধ করা লোহার গেটের দিকে অগ্রসর হলেন। এ সময় তিনি ছবি তুললেন আরও এক রোল। এর মধ্যে গেটের অপর দিকে শুরু হয়ে গেল পুলিশের লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ আর ধরপাকড়। ছাদ থেকে তিনি এসব দৃশ্য দেখতে পেলেন না। তাই বাধ্য হয়ে নিচে নেমে এলেন। এর মধ্যে তার ফিল্মও শেষ হয়ে যায়।
সারা দিন ধরে পুলিশ-ইপিআরের সঙ্গে ছাত্রদের সংঘর্ষ চলছে। রফিকুল সেই সংঘর্ষের একেবারে সামনে কাতারে। বেলা তিনটার দিকে মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসের গেট দিয়ে কিছু সশস্ত্র পুলিশ ভেতরে ঢুকে। তারা সমবেত ছাত্র-জনতার দিকে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়ে। পুলিশ যখন গুলিবর্ষণ শুরু করে, তখন তিনি দ্রুত হোস্টেল প্রাঙ্গণ ছেড়ে মেডিকেল কলেজ ভবনের মাঝখানের প্রবেশপথে অবস্থান করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই মেডিকেলের ওয়ার্ড বয়রা অ্যাম্বুলেন্স থেকে একটি মরদেহ স্ট্রেচারে করে নামালেন। গুলিতে মাথার খুলি উড়ে গেছে, সেখান থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে; মগজ গলে পড়ছে। লাশটা জরুরি বিভাগে না রেখে একটি গুদাম ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। গুমের উদ্দেশ্যেই ওখানে রাখা হয় লাশটা। পরে জেনেছেন, ওটা রফিকউদ্দিন আহমেদের লাশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এমএ ক্লাসের ছাত্র আবুল বরকতের গুলি লাগে ঊরু ও তলপেটে। অনেকের সঙ্গে রফিকুলও তাকে ধরাধরি করে জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। বরকতের শরীর থেকে কলকল করে রক্ত বের হচ্ছে। গুলির ব্যথায় কাতর বরকত বারবার পানি পানি করছিলেন। তার সারা মুখে বৃষ্টির ফোঁটার মতো ঘাম। স্পষ্ট করে বললেন, 'আপনারা পুরানা পল্টনে বিষ্ণুপ্রিয়া ভবনে খবর দেন। ওখানে আমার বোন আর ভগ্নিপতি আছেন।' রফিকুল কার যেন একটা সাইকেল নিয়ে বিষ্ণুপ্রিয়া ভবনে যান। বরকতের ভগ্নিপতি বাড়িতে নেই, তাই বোনকে খবরটা দিলেন। সন্ধ্যায় হাসপাতালে আসেন তার ভগ্নিপতি। সে রাতেই অপারেশন থিয়েটারে মারা যান বরকত।
রফিকুল সেদিন যত ছবি তোলেন, সেগুলো রক্ষা করা নিয়ে শঙ্কায় পড়লেন। চারদিকে পুলিশ আর গোয়েন্দা সংস্থার লোক। এক্সপোজড করা ফিল্ম বাসায় রাখা নিরাপদ নয়, যেকোনো সময় তল্লাশি হতে পারে। কী করা যায় তাৎক্ষণিকভাবে ভেবে গেলেন ১৯ তোপখানা রোডের জাইদিস ফটোগ্রাফার্সে। রফিকুল ফিল্ম দুটি সেই স্টুডিওতে রেখে নতুন ফিল্ম নিয়ে বাসায় ফেরেন। ফিল্মটি এমন জায়গায় রাখলেন যেন সহজে কেউ খুঁজে না পায়। কিছুক্ষণ পর গোয়েন্দা সংস্থার দুই সদস্য তার বাসায় এসে হাজির। ছবি তুলেছেন কি না―জানতে চান। রফিকুল ক্যামেরা এগিয়ে দিয়ে বললেন, 'ফিল্ম ছিল না বলে ছবি তুলতে পারি নাই।' ক্যামেরায় ফিল্ম না পেয়ে গোয়েন্দারা চলে গেলেন।
পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারি শহীদের রক্তশপথে ঢাকা শহর উত্তাল হয়ে ওঠে। দিনের আলো ফুটতেই বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো মানুষ রাজপথে নেমে আসে। ক্যামেরায় নতুন ফিল্ম লোড করে বেরিয়ে পড়েন রফিকুল। পুলিশের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে পুরাতন কলাভবনের আমতলায় ছাত্রছাত্রীরা জমায়েত হয়। ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে কলাভবনের চূড়ায় উত্তোলন করা হয় শোকের পতাকা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় গায়েবানা জানাজা। জানাজা শেষে বের করা হয় শোক শোভাযাত্রা। আহত হৃদয়ে ওই শোকাবহ মুহূর্তের ছবি তুললেন রফিকুল। এরপর ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত টানা একুশ উদ্্যাপনের ছবি তুলেছেন তিনি। রফিকুলের রক্তের আখরে রচিত সেই আলোকচিত্রের ভান্ডার এখন বাংলা একাডেমির ভাষা আন্দোলন জাদুঘরে রক্ষিত আছে।
রফিকুল যে ক্যামেরা দিয়ে ভাষা আন্দোলনের ছবি তুলেছিলেন, সেটি ১৯৪৯ সালে উপহার পেয়েছিলেন তার বিলেতফেরত এক ভাইয়ের কাছ থেকে। ১৯৪৩ সালে মাত্র নয় বছর বয়সে প্রথম কোডাকের একটি সিক্স টোয়েন্টি বক্স ক্যামেরা হাতে পেয়েছিলেন রফিকুল। ওই সময় থেকে বাবার চাকরিসূত্রে তিনি ঢাকায়। তার বাবা মো. জুলফিকার আলী ছিলেন রেলওয়ে হাসপাতালের চিকিৎসক। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদর দপ্তর ছিল ফজলুল হক হল। আর ফজলুল হক হলের উল্টো দিকের রেলওয়ে কলোনিতেই ছিল তাদের বাসা। তখন স্কুলের ছাত্র হলেও এই আন্দোলনের উত্তাপ এসে লাগে তার উন্মীলিত কৈশোরে। ক্যাম্পাস এলাকায় বসবাস হওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত আন্দোলন-সংগ্রামের স্রোতোধারা তার রক্তের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে।
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রয়ারি ১৬টি ছবি তুলেছিলেন রফিকুল। ভাষার দাবির জন্য ছাত্রদের উপর গুলি হতে পারে―এটা তার কল্পনাতেও ছিল না। ফিল্ম শেষ হয়ে যাওয়ায় ওই দিন তিনি গুলিবিদ্ধ বরকত আর নিহত রফিকের ছবি তুলতে পারেননি; এই ঘটনাকে জীবনের বড় ট্র্যাজেডি বলে মনে করেন। তার ছবির কপিরাইট নিয়ে জানতে চাইলাম। রফিকুল বললেন, 'আমি ছবি তুলেছি ইতিহাসকে ধরে রাখার জন্য। এখন ইতিহাসের প্রয়োজনে কেউ যদি আমার তোলা ছবি ব্যবহার করতে চায়, করবে। এর জন্য আমার কাছে এসে অনুমতি নেওয়ার দরকার নেই। ছবিতে ক্রেডিট লাইন উল্লেখ করলেই চলবে।'
রফিকের মাথার খুলি
কপালে গুলি লেগে মাথার খুলি চূর্ণ হয়ে মগজ বেরিয়ে গেছে। মগজগুলো অনেকখানি জায়গা জুড়ে বকুল ফুলের মতো থোকায় থোকায় ছড়িয়ে আছে। গুমের উদ্দেশ্যে লাশটা রাখা হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অ্যানাটমি হলের পেছনে একটা গোপন কক্ষে। কেউ যেন সেখানে ঢুকতে না পারে, সে জন্য ছিল কঠোর নজরদারি। কিন্তু পুলিশের সতর্ক প্রহারা এড়িয়ে সেই গোপন কক্ষে ঢুকে ছবি তোলেন আমানুল হক। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, তা তৎকালীন সরকার অস্বীকার করে। নানাভাবে প্রচার করে, ছাত্রদের উপর উদ্দেশ্যমূলকভাবে গুলি চালানো হয়নি। গুলি চালানো হয়েছে প্রতিরক্ষার জন্য। ছাত্র হত্যার ঘটনা নিয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সে সময় অস্বীকারের যে বয়ান তৈরি করে, সেই বয়ানকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এই একটিমাত্র ছবি।
আমানুলের তোলা ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ রফিকউদ্দিন আহমেদের মরদেহের সাদাকালো বিমূর্ত ছবিটি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মসনদ কাঁপিয়ে দেয়। পরিনামে তাকে চাকরি ছেড়ে কলকাতায় আশ্রয় নিতে হয়। আমানুল কেমন করে এই ঐতিহাসিক ছবিটি তুলেছিলেন―তার কাহিনি বেশ দীর্ঘ ও শ্বাসরুদ্ধকর। ১৯৫২ সালে আমানুল ঢাকা মেডিকেল কলেজে 'শিল্পী' হিসেবে চাকরি করতেন। ২১ তারিখ যে কিছু একটা ঘটবে―তা আগের দিনই টের পেয়েছিলেন তিনি। তাই জাইস আইকন ক্যামেরাটি গলায় না ঝুলিয়ে ফুল-হাতা হাওয়াই শার্টের ভেতর লুকিয়ে রাখেন।
সকাল থেকেই চারদিকে চাপা উত্তেজনা। ক্রমে বাড়ছে সেই উত্তেজনা। দুপুরের দিকে পুরাতন কলাভবন, মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাস প্রাঙ্গণ ও এর সামনের রাস্তায় পুলিশ বেপরোয়াভাবে লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। ছাত্র-জনতাও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করছে। বেসামাল অবস্থা। বেলা তখন তিনটা। উত্তেজনার চূড়ান্ত পরিস্থিতিতে পুলিশ ছাত্রাবাস প্রাঙ্গণে ঢুকে দুই দফা গুলি চালায়। আমানুল তখন হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়ানো। কয়েকজন ছাত্র একটি রক্তমাখা দেহ ধরাধরি করে নিয়ে আসছেন। ক্রোধে, ক্ষোভে একজন চিৎকার করে বলছেন, 'ওরা গুলি করেছে, ওরা মেরে ফেলেছে।' আহত ছেলেটির শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এ দৃশ্য দেখে ছাত্র-শিক্ষক, ডাক্তার-নার্স, মেথর-কর্মীরাও কাঁদছেন। আমানুল জানতে পারলেন, গুলিবিদ্ধ ওই তরুণের নাম আবুল বরকত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।
এরপর আমানুল ছাত্রাবাসে গিয়ে দেখেন, এর বারান্দা ও বাইরে নানা জায়গায় রক্ত। একটা জায়গায় রক্ত জমাট বেঁধে আছে। রক্তের উপর ছোট্ট একটি ইশতেহার রেখে এক খণ্ড মাটির টুকরায় চাপা দিয়ে গেছেন কোনো এক অজ্ঞাতনামা ভাষাসংগ্রামী। ব্যাপারটা তার কাছে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ মনে হলো। দ্রুত ছবি তুলে তিনি জনতার কাতারে মিশে যান। মেডিকেল কলেজের বারান্দার সামনের যে মাঠ, সেখানে প্রখ্যাত সাংবাদিক কাজী মোহাম্মদ ইদরিসের সঙ্গে দেখা। ইদরিস সাহেব আমানুলকে বললেন, 'একজন ছাত্রের মাথার খুলি উড়ে গেছে। তার দেহটা হাসপাতালের পেছনের দিকে একটা ঘরে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। তুমি কি তার ছবি তুলতে পারবে?' শুনে আমানুলের রক্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে। মেডিকেল কলেজের ছাত্রী হালিমা খাতুনের পিছু পিছু রওনা হলেন আমানুল। হাসপাতালের পেছনে একটি ঘর। ঘরটি গুদামঘরের মতো। সেই ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে একটি লাশ। প্রায়ান্ধকারের মধ্যে নিশ্বাস বন্ধ করে ক্যামেরায় শার্টার চাপেন। ছবি তুলেই আমানুল হাসপাতাল ছাড়েন।
বাসায় গিয়ে হারিকেনের আলোয় নিজের ডার্করুমে কয়েকটি ছবি প্রিন্ট করেন। সন্ধ্যার আগে আগে আমানুলের বাসায় আসেন ইদরিস সাহেব। তিনি তার কাছ থেকে তিনটি ছবি চেয়ে নেন। এর একটি কপি পাঠালেন দৈনিক আজাদ অফিসে, বাকি দুই কপি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক মাজেদ খান এবং স্পোর্টস ফেডারেশেনের এ এস এম মহসিন সাজুকে। দৈনিক আজাদ ছবিটা ছাপানোর সিদ্ধান্ত হয়। কিছু কপি ছাপার পর শুরু হয় মালিকপক্ষের আপত্তি। পুলিশ ছাপা পত্রিকাগুলোকে ধ্বংস করে। পরে গভীর রাতে ছবি ছাড়াই আজাদ ছাপা হয়।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের পর দেশে যে গণতান্ত্রিক ধারা ফিরে আসে, তাতে আমানুলের মাথার উপর থেকে হুলিয়ার ভার নামে। ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারির ফলে যে দুঃশাসন নেমে আসে, তাতে আমানুল কলকাতায়ই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পর তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন। মুক্তিযুদ্ধের অনিশ্চিত সময়ে আমানুল ভাষা আন্দোলনের নেগেটিভ তার ভাবি লুৎফা হকের কাছে রাখেন। লুৎফা হক তার ট্রাংকে শাড়ির ভাজে নেগেটিভ লুকিয়ে তালা দিয়ে রাখেন।
রফিকের মরদেহের ছবি ছাড়াও কারফিউ আগ্রাহ্য করে ২৩ ফেব্রুয়ারি এক রাতে ছাত্রদের হাতে গড়ে ওঠা প্রথম শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ, শহীদের রক্তরাঙা জামাকাপড়, ফেস্টুন-ব্যানারে রক্তিম হরমে চলমান ইতিহাসের কথকতা, মাতৃভাষার দাবিতে উদ্বেল মিছিলে প্রতিবাদের অগ্রপথিক মওলানা ভাসানীর দৃপ্তভঙ্গি আর শহীদ মাতার অশ্রুসিক্ত আকুতি―আরও কত কী আঁকা ছিল আমানুলের ক্যামেরায়। এলোমেলো জীবনে এর অনেক কিছুই হারিয়ে যায়। ভাষা আন্দোলন আমানুলের গোটা জীবন পাল্টে দিয়েছিল। শহীদ মিনার তার কাছে ছিল পবিত্রতার প্রতীক। তাই তিনি বারবার ফিরে গেছেন শহীদ মিনারের কাছে। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শুরু করে দেশের নানা প্রান্তের অসংখ্য শহীদ মিনার তার ক্যামেরায় ধরা আছে। সেসব দিয়ে আমানুল হক রচনা করেন 'একুশের তমসুক' নামের গ্রন্থ। তমসুক ফার্সি শব্দ। এর বাংলা অর্থ ঋণস্বীকার করা। আমানুল সারা জীবন একুশের কাছে ঋণস্বীকার করে গেছেন।
রফিকের ভিন্ন ছবি
শহীদ রফিকউদ্দিনের মরদেহের আরেকটি ভিন্ন অ্যাঙ্গেলের ছবি ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের বিশেষ সংখ্যায় ছাপা হয়। ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগের ফ্লোরে রাখা স্ট্রেচারে শায়িত রফিকউদ্দিন। মাথা থেকে মগজ বের হয়ে আছে। পেছনে দেখা যায় কয়েকজনের পা। ওই বছর ভাষা শহীদদের স্মরণে পূর্ব বাংলা ছাত্রলীগ যে লিফলেট প্রকাশ করে সেখানেও ছবিটি ক্রপ করে ছাপা হয়। পরবর্তী সময়ে বশীর আলহেলালের 'ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস' এবং আবদুল মতিন ও আহমদ রফিকের 'ভাষা আন্দোলন: ইতিহাস ও তাৎপর্য' গ্রন্থেও রফিকের ছবিটি ছাপা হয় এবং এ ছবি সম্পর্কে বিস্তারিত লেখা হয়। কিন্তু এই ঐতিহাসিক ছবিটি কে তুলেছেন―ভাষা আন্দোলন-বিষয়ক কোনো বইয়ে তার উল্লেখ নেই। দীর্ঘ ৭৪ বছরেও কোনো গবেষক বা ইতিহাসবিদ এই গুণী আলোকচিত্রীর পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেননি। দীর্ঘ কয়েক বছর গবেষণার পর ইতিহাসের মলিন পৃষ্ঠা এই আলোকচিত্রীর নাম-পরিচয় ও রফিকের ছবি তোলার বিস্তারিত বিবরণ উদ্ধার করি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে রফিকের এই ছবিটি তুলেছিলেন ইত্তেফাকের আলোকচিত্রী মীজানুর রহমান।
দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে যে কয়েকজন মানুষের হাত ধরে এ দেশের ফটোসাংবাদিকতার গোড়াপত্তন হয়―মীজানুর রহমান তাদের অন্যতম। নিভৃতচারী ছিলেন বলে বর্তমান সময়ে তিনি অনেকটাই অনালোকিত। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে মীজানুর রহমানের যে অবদান―তার এক ঝলক খুঁজে পাই আসিফ নজরুলের 'সংবাদ চিত্রগ্রাহকদের স্মৃতি: স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজ' শিরোনামের প্রবন্ধে। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির ছবি তোলার মাধ্যমে মীজানুর রহমানের চিত্রসাংবাদিকতা জীবনের শুরু। এর আগের বছর তিনি সাপ্তাহিক ইত্তেফাকে সহসম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ও ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন।
২১ ফেব্রুয়ারিতে ১০ জন ১০ জন করে ছাত্রমিছিল যখন গণপরিষদের দিকে রওনা হয়, তখন এই আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে মীজানুর ঢাকা মেডিকেল কলেজের গেটের কাছে অবস্থান করছিলেন। তার হাতে বক্স ক্যামেরা। পুলিশের গুলি শুরু হলে প্রাণভয়ে সবাই বিক্ষিপ্তভাবে ছুটোছুটি করতে থাকে। তার একটু দূরে দৌড়ে সরে যাওয়ার সময় রফিকের মাথায় গুলি লাগে। ছাত্ররা তাকে ধরাধরি করে ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যান। মীজানুরও ইমার্জেন্সিতে গিয়ে রফিকের মরদেহের ছবিটি তোলেন। প্রেস সেন্সরশিপের কারণে ১৯৫২ সালে ছবিটি ছাপা সম্ভব হয়নি। পরের বছর ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের বিশেষ সংখ্যায় ছবিটি ছাপা হয়।
আবদুল মতিন ও আহমদ রফিক লিখিত 'ভাষা আন্দোলন: ইতিহাস ও তাৎপর্য' গ্রন্থে ছাপা হওয়া ছবিটির ক্যাপশনে লেখা হয়―'বাহান্নর প্রথম শহীদ রফিকউদ্দিন।' ছবির ক্রেডিট লাইনে লেখকদ্বয় ডা. হুমায়ূন কবির হাইয়ের নাম উল্লেখ করেন। কিন্তু তাদের লেখায় প্রতীয়মান হয়, ডা. হুমায়ূন কবীর হাই এই ছবিটির সংগ্রাহক। হুমায়ূন তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। 'ভাষা আন্দোলন : ইতিহাস ও তাৎপর্য' গ্রন্থে হুমায়ূনের ভাষ্য লিপিবদ্ধ আছে। গুলিবিদ্ধ রফিকউদ্দিন সম্পর্কে তার জবানবন্দি―'বিকেল তিনটার দিকে হোস্টেলের গেটের কাছে একজনকে (আবুল বরকত) গুলিবিদ্ধ হতে দেখেছি। আর মাথার খুলি উড়ে যাওয়া একজন শহীদের লাশ আমরা প্রথমে ইমার্জেন্সিতে, পরে অ্যানাটমি হলের পেছনের বারান্দায় নিয়ে আসি। তার একটা ফটো নেওয়া হয় এবং সে ফটো কপি আমার কাছেও ছিল। পরবর্তীকালে তা ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়।' আহমদ রফিক উল্লেখ করেন, মাথায় গুলিবিদ্ধ শহীদ রফিকউদ্দিনের এই আলোকচিত্র তার সংগ্রহেও ছিল। কিন্তু ১৯৫৪ সালের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার কারণে হারিয়ে যায়।
বশীর আলহেলাল 'ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস' গ্রন্থে উল্লেখ করেন, স্ট্রেচারের উপর মাথার খুলি উড়ে যাওয়া এক শহীদের লাশের ছবি আমরা কোথাও কোথাও মুদ্রিত দেখি। ছবিটি ১৯৫৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক নতুন দিন পত্রিকায় ছাপা হয়। ছবিটি শহীদ রফিকের উল্লেখ করে তিনি লিখেন, নতুন দিনে প্রকাশিত ছবিটি ইত্তেফাকের সৌজন্যে ছাপা হয়। ছবিটি প্রথম ছাপা হয়েছিল ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের বিশেষ সংখ্যায়।
আসিফ নজরুলের লেখা পড়ে ইতিহাসের আবিলতায় হারিয়ে যাওয়া পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদচিত্রী মীজানুর রহমানকে আবিষ্কারের চেষ্টা চালাই। ইত্তেফাকের বেশ কয়েকজন প্রবীণ সাংবাদিকের কাছে তার সম্পর্কে জানতে চাই। তারা মীজানুরের কথা স্মরণ করতে পারলেও তার পরিবার কোথায় আছে কিংবা তার গ্রামের বাড়ি কোথায়―এ সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেন না। পরে ইত্তেফাক গ্রুপের ইংরেজি দৈনিক দ্য নিউনেশনের সাবেক আলোকচিত্রী এ কে এম মহসীন স্মৃতি হাতড়ে জানালেন, তার গ্রামের বাড়ি গাজীপুরে। গাজীপুর প্রেসক্লাবের কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানাতে পারি, মীজানুর ছিলেন গাজীপুর প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা। সাংবাদিক আতাউর রহমানের কাছে পাই মীজানুরের বড় ছেলে শাহারিয়ার জিয়াউর রহমানের ফোন নম্বর।
১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ওয়ারিতে গিয়ে শাহারিয়ারের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। শাহারিয়ার জানান, স্কুলে পড়ার সময়ই জয়দেবপুরের একজন স্টুডিও ফটোগ্রাফারের কাছে ছবি তোলা শেখেন তার বাবা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় ১৯৫১ সালে ইত্তেফাকের সহসম্পাদক হিসেবে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। কিন্তু বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। আন্দোলনের ছবি তুলতে তুলতে একপর্যায়ে ফটোগ্রাফিই তার কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে। ১৯৬৪ সালের দিকে তিনি স্পোর্টস রিপোর্টিংয়ে ঝুঁকে পড়েন। পরে তিনি ইত্তেফাকের ক্রীড়া সম্পাদক ও প্রধান প্রতিবেদক হন। ১৯৭২ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ প্রেস ইন্টারন্যাশনাল (বিপিআই) প্রতিষ্ঠিত হলে তাকে এই প্রতিষ্ঠানের সম্পাদক ও প্রশাসক নিযুক্ত করা হয়। ১৯৭৫ সালে বিপিআই ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা একীভূত হলে তিনি বাসসের বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক হন। তিনি পাকিস্তান টাইমস পত্রিকারও স্ট্রিঙ্গার ছিলেন। ২০০৩ সালের ১৮ জুলাই প্রয়াত হন বাংলাদেশের এই পথিকৃৎ সংবাদচিত্রী।