বিদেশি নাগরিকদের জন্য জাপানে স্থায়ী বসবাসের আবেদন ফি ২০ গুণ বাড়ল
জাপানে বিদেশি নাগরিকদের স্থায়ী বসবাসের (পার্মানেন্ট রেসিডেন্সি) আবেদন ফি একলাফে ২০ গুণ বাড়িয়ে ২ লাখ ইয়েন (প্রায় ১,২৭০ মার্কিন ডলার) করা হয়েছে। এর পাশাপাশি দেশটিতে স্থায়ী হতে ইচ্ছুক বিদেশিদের জন্য আয়, পেনশন ও জাপানি ভাষার ওপর নতুন কিছু কঠিন শর্তও আরোপ করেছে দেশটির সরকার।
বর্ধিত ফি কার্যকর হওয়ার আগে আবেদন জমা দিতে চলতি সপ্তাহের শুরুতে জাপানের অভিবাসন দপ্তরগুলোর সামনে আবেদনকারীদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। রাজধানী টোকিওর মূল অভিবাসন ব্যুরোতে একেকজনকে সাত ঘণ্টারও বেশি সময় লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়।
প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির অভিবাসন নীতির অংশ হিসেবে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য, দেশটিতে দ্রুত বাড়তে থাকা বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা।
জুলাইয়ে সব বিদেশির ভিসা ফি পাঁচ গুণ বাড়িয়েছে জাপান। ৫০ বছরের মধ্যে এটিই ছিল দেশটির প্রথম ভিসা ফি বৃদ্ধি। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, 'মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হারের ওঠানামার বিষয়টি বিবেচনায়' এই ফি বাড়ানো হয়েছে।
জাপানে অভিবাসন এখনো রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ও নিয়ন্ত্রিত একটি বিষয়। তবে দেশটির বয়স্ক জনসংখ্যা বাড়তে থাকায় শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
২০২৫ সালের শেষ নাগাদ জাপানে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা ৪১ লাখ ২০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা ৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি, যা দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে বিদেশি জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিবাসন ও সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।
গত বছরের অক্টোবরে দায়িত্ব নেওয়ার পর অভিবাসন ব্যবস্থাপনা প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।
আবাসিক অনুমতির ফি বাড়ানোর কয়েক দিন আগে এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তাকাইচি লেখেন, জাপানে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা বাড়ায় 'জনসাধারণের কিছু অংশ উদ্বেগ বা অন্যায্যতার অনুভূতি পেতে পারেন'—এ বিষয়টি তার সরকার স্বীকার করে।
তিনি লেখেন, 'এসব উদ্বেগ মোকাবিলায় [সরকার] বিদেশিদের বিষয়ে তার নীতিগুলো সুশৃঙ্খলভাবে বাস্তবায়ন এবং জাপানি নাগরিক ও বিদেশি বাসিন্দা—উভয়েই যাতে নিরাপদ ও সুরক্ষিতভাবে বসবাস করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে।'
নতুন নিয়ম কার্যকরের আগে জাপানে অস্থায়ী বাসিন্দাদের ভিসার ধরন পরিবর্তন বা মেয়াদ বাড়ানোর জন্য প্রতিবার ৬ হাজার ইয়েন দিতে হতো। তবে ১ অক্টোবর থেকে অবস্থানের মেয়াদের ভিত্তিতে এই ফি নির্ধারণ করা হয়েছে—তিন মাস বা তার কম সময়ের জন্য ১০ হাজার ইয়েন থেকে শুরু করে পাঁচ বছর বা তার বেশির জন্য ৭৫ হাজার ইয়েন পর্যন্ত। তবে আর্থিক অসচ্ছলতা বা শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃত ব্যক্তিরা এতে বিশেষ ছাড় পাবেন।
স্থায়ীভাবে বসবাসের আবেদনকারীদের এখন থেকে জাপানের গড় আয়ের সমান বা তার বেশি স্থিতিশীল আয় থাকতে হবে। জুলাইয়ে প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জাপানে পরিবারের গড় বার্ষিক আয় ছিল ৫৭ লাখ ৫০ হাজার ইয়েন।
এছাড়া পেনশনের ক্ষেত্রেও ৩০ বছর মেয়াদি কর্মচারী পেনশন ব্যবস্থার সমপরিমাণ সুবিধার প্রমাণ দেখাতে হবে। আগামী বছরের এপ্রিল থেকে জাপানি ভাষায় প্রাথমিক দক্ষতার মতো আরও কঠোর নিয়ম চালু হবে।
টোকিওতে ১০ বছর ধরে বাস করা মিকাইয়াহ মাইকেলা-স্পেন্স (৩৭) প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করতে না পারায় বর্ধিত ফির আগেই আবেদন করতে পারেননি। নতুন এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে তিনি বিবিসিকে বলেন, 'আমার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল—বিদেশিদের সাথে একটু বেশিই সুবিধাবাদী আচরণ করা হচ্ছে। জাপানে কেবল কাজ করার অধিকার ও সরকারকে কর দেওয়ার জন্যই আমাদের গড় জাপানিদের চেয়ে বেশি উপার্জন করতে এবং অনেক বেশি ফি দিতে বলা হচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, 'এখানে আগে থেকেই ভাষা ও সংস্কৃতির বড় বাধা রয়েছে, যা অনেক প্রতিভাকে আসতে বাধা দেয়। এটি কোনো দীর্ঘমেয়াদি ও সুচিন্তিত পরিকল্পনা বলে আমার মনে হচ্ছে না।'
