প্রথম সাক্ষাতের তিন মাসের মধ্যেই বিয়ের প্রস্তাব: জাপানে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে করপোরেট ঘটকালি প্রতিষ্ঠান
সত্যিকারের ভালোবাসার কোনো দাম হয় না। কিন্তু জাপানে বিশের কোঠায় থাকা তরুণ-তরুণীদের অনেকেই এখন ভালোবাসার অপেক্ষায় না থেকে দ্রুত বিয়ের পিঁড়িতে বসার পথ খুঁজছেন। আর সেই পথ দেখাচ্ছে পেশাদার ঘটকালি প্রতিষ্ঠানগুলো। বিনিময়ে গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ।
শত শত বছর ধরে, এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়েও জাপানে বিয়ের ক্ষেত্রে 'ওমিয়াই' নামে একটি প্রথা প্রচলিত ছিল। আত্মীয়স্বজন, পারিবারিক বন্ধু কিংবা কর্মক্ষেত্রের ঊর্ধ্বতন কেউ ঘটকের ভূমিকা নিয়ে নিজেদের পরিচিত গণ্ডির অবিবাহিত নারী-পুরুষের মধ্যে যোগাযোগ করিয়ে দিতেন।
তবে সময়ের সঙ্গে সেই প্রথা জনপ্রিয়তা হারায়। তার জায়গা নেয় নিজেদের পছন্দে সম্পর্ক গড়ে তোলা, এরপর আসে একের পর এক ডেটিং অ্যাপ। পরিচিত গণ্ডির বাইরে নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের সহজ পথ খুলে দেয় এসব অ্যাপ।
কিন্তু এখন যেন সেই চক্র আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। রেকর্ডসংখ্যক তরুণ-তরুণী বিয়ের ঘটক প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্বারস্থ হচ্ছেন। সেখানে অ্যালগরিদম নয়, পেশাদার পরামর্শকেরাই হয়ে উঠছেন আধুনিক ঘটক।
টোকিওর বিভিন্ন মেট্রো ট্রেনে এখন চোখে পড়ে এসব প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন। কোনো বিজ্ঞাপনে যাত্রীদের আহ্বান জানানো হচ্ছে, 'জীবনের ভাগ্য নির্ধারণ সাক্ষাৎ পেশাদারদের ওপর ছেড়ে দিন।' আরেকটিতে লেখা, '১০০ বার সোয়াইপ করার চেয়ে একটি ওমিয়াই ভালো।'
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক ডেটিংয়ের নানা ঝামেলা ও হতাশা থেকেই এই পরিবর্তন। তরুণদের সামাজিক পরিসরও ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে। ডেটিং অ্যাপে পরিচয়ের পর হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া, ভুয়া পরিচয় এবং সম্পর্ক নিয়ে অনিশ্চয়তায় অনেকেই ক্লান্ত। তাই দ্রুত ও নিশ্চিতভাবে মনের মতো সঙ্গী খুঁজতে তরুণদের অনেকে আবার মানুষের সরাসরি পরামর্শ ও সহায়তার দিকে ফিরছেন।
জাপান যখন ক্রমশ কমতে থাকা জনসংখ্যা এবং তরুণ পরিবারের সংকটের মুখোমুখি, তখন এই প্রথার পুনরুত্থান ঘটছে। দেশটিতে সন্তান নেওয়ার বিষয়টি এখনো ব্যাপকভাবে বিয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে আরও বেশি মানুষকে বিয়েতে উৎসাহিত করাও জন্মহার বাড়ানোর বৃহত্তর জাতীয় উদ্যোগের একটি অংশ হয়ে উঠেছে।
প্রথম সাক্ষাতের পর মাত্র তিন মাসের মধ্যে বিয়ের প্রস্তাব পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জাপানে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে টোকিওভিত্তিক ঘটকালি প্রতিষ্ঠান 'আইবিজেই'। দেশজুড়ে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এই করপোরেট সংস্থার হাত ধরে সদস্যসংখ্যা ও মুনাফা যেমন বাড়ছে, তেমনি প্রতিষ্ঠানটির দাবি—বর্তমানে জাপানের প্রতি ২৫টি বিয়ের একটি সম্পন্ন হচ্ছে তাদের মাধ্যমে।
আইবিজেইতে যুক্ত হওয়া তরুণদেরই একজন ইয়াসুদা। পরিপাটি পোশাকে সম্প্রতি তিনি একটি নিভৃত পরামর্শকক্ষে তার নির্ধারিত কাউন্সিলরের মুখোমুখি বসেন। সংস্থায় যুক্ত হওয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় তিনি পাত্রীর তালিকা ছোট করে দুজনে নামিয়ে এনেছেন এবং তাদের একজনকে নিয়ে ঘুরে এসেছেন।
পরামর্শকক্ষে তাকে দিয়ে একটি 'মহড়া ডেট' করানো হয়। সেখানে বিব্রতকর প্রশ্নের উত্তর কীভাবে দিতে হবে এবং প্রার্থীর নিজস্ব আকর্ষণীয় দিকগুলো কীভাবে তুলে ধরতে হবে, তা প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছিল।
কর্মক্ষেত্রে অধস্তনদের কঠোর প্রতিক্রিয়া জানানোর বিষয়ে নিজের মানসিক চাপ কমে যাওয়ার কথা বললে কাউন্সিলর তৎক্ষণাৎ তাকে থামিয়ে দিয়ে সতর্ক করে বলেন, এমন বক্তব্যে তাকে নিষ্ক্রিয় মনে হতে পারে।
এরপর কাউন্সিলর তাকে উৎসাহ দিয়ে বলেন, 'আপনার হয়তো এই বিষয়ে আরও কিছুটা বুঝিয়ে বলা প্রয়োজন। তবে যা-ই হোক, আমি মনে করি আপনি অসাধারণ। আমি সবসময়ই ভাবি আপনি দুর্দান্ত!'
আইবিজেইর কাজের মূল ভিত্তিই হলো এমন নিবিড় দিকনির্দেশনা। এখানে প্রতিটি সদস্যের জন্য একজন করে পরামর্শক থাকেন, যারা পোশাক-আশাক ও বার্তা আদান-প্রদানের শিষ্টাচার থেকে শুরু করে অভিসারের সূচি পর্যন্ত প্রণয়পর্বের প্রতিটি ধাপ তদারকি করেন।
দুজন সদস্যের পছন্দ মিলে গেলে উভয় পক্ষের পরামর্শকেরা পর্দার আড়ালে সমন্বয় করে কাজ করেন, যাকে তারা বলছেন 'কিউপিড ওয়ার্ক'। সেখানে তারা সাক্ষাতের পর প্রতিক্রিয়া আদান-প্রদান ও যাচাই-বাছাই করেন এবং বিয়ের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পর্যন্ত সব পদক্ষেপের পরিকল্পনা সাজিয়ে দেন।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শিগেরু ইশিজাকা বলেন, 'আমরা এমন এক ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছি, যা কেবল মানুষই দিতে পারে—যাতে মানুষ যত দ্রুত সম্ভব বিয়ে করতে পারে।'
প্রণয়ের মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষণারত টোকিওর তোকাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক জুনকো ইয়ামাদা মনে করেন, অতিমাত্রায় প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে এখন 'সম্পর্কের ধাপগুলোতে একজন পথপ্রদর্শক পাওয়ার গভীর আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে।'
প্রথাগত 'ওমিয়াই' পদ্ধতির মতো বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পছন্দ নির্ধারণ মানসিক স্বস্তি এনে দেয় উল্লেখ করে তিনি জানান, বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সময় ও শ্রমের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে চায়। যারা বিয়ের বিষয়ে সত্যি আন্তরিক নন, তাদের বাদ দিয়ে দিতে পারায় এসব সংস্থা তরুণদের সেই মানসিকতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে।
তবে আইবিজেইর সদস্য হওয়া ও সেবা পাওয়ার খরচ এবং নিয়মাবলি বেশ কঠিন। সদস্যদের প্রতি মাসে ৩০ থেকে ১০০ ডলার দিতে হয়। এ ছাড়া ভর্তি ফি বাবদ ৬৫০ থেকে ১ হাজার ৩০০ ডলার এবং বাগদান সফল হলে 'সাফল্য ফি' হিসেবে অতিরিক্ত আরও ১ হাজার ৩০০ ডলার দিতে হয়।
বিয়ের আগে শারীরিক সম্পর্ক বা একসঙ্গে বসবাসের মতো 'নিষিদ্ধ কাজ'-এ জড়ালে গুনতে হয় আরও ১ হাজার ৩০০ ডলার জরিমানা। সংস্থাটির পরামর্শকেরা সার্বক্ষণিক যুগলদের সম্পর্কের অগ্রগতি নজরদারি করেন। সাধারণত নিয়মিত আয়ের প্রার্থীদেরই এখানে সদস্য করা হয়; যার মধ্যে সরাসরি পরিচালিত মূল সংস্থায় নারীদের বয়সসীমা ২০ থেকে ৩৯ এবং পুরুষদের জন্য ২৫ থেকে ৪৯ বছর।
টোকিও স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত এবং বছরে ১৩ কোটি ডলারের বেশি আয় করা এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সমালোচকদের অভিযোগ—তারা ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক ঘটকালির আবেগ নষ্ট করছে, উদ্বেগে থাকা তরুণদের ওপর নির্ধারিত সময়সীমা চাপিয়ে দিচ্ছে এবং প্রণয়কে কেবল অর্থ আয়ের মাধ্যমে পরিণত করছে।
সমালোচকদের একজন প্রবীণ ঘটক ইকুকো কাতো। টোকিওর উপকণ্ঠে নিজের বাড়ি থেকে গত ৪৪ বছরে ১ হাজার ৩০০টির বেশি সফল বিয়ে সম্পন্ন করার এবং একটিও বিচ্ছেদ না হওয়ার দাবি করে তিনি বলেন, 'তারা ব্যবসার দিকে খুব বেশি মনোযোগী। আমার বাবা-মা পাড়া-মহল্লার ঘটক ছিলেন। এটা আমার রক্তে মিশে আছে। আধুনিক করপোরেট সংস্থাগুলো আমার মতো কাজ করতে পারবে না।'
কাতো জানান, একপর্যায়ে তিনি জানতে পারেন তার মিলিয়ে দেওয়া এক নবদম্পতি আলাদা ঘরে ঘুমাচ্ছেন। ঘটনাটি মনে করে তিনি বলেন, 'আমি যখন তা জানলাম, তাদের চিৎকার করে বলেছিলাম: 'নির্বোধেরা! তোমাদের সন্তান হবে কীভাবে?' আমি তাদের নির্দেশ দিয়েছিলাম, 'আজ রাতেই এক বিছানায় ঘুমাও!' আধুনিক তরুণদের ক্ষেত্রে এতটা পথ পর্যন্ত শিখিয়ে দিতে হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক ঘটকালির বিপরীতে আইবিজেই পুরো বিষয়টিকে সমন্বিত বাণিজ্যিক প্যাকেজে রূপান্তর করেছে। ম্যাচমেকিংয়ের পাশাপাশি এদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো বিয়ের আয়োজন, আর্থিক পরামর্শ ও আবাসন সেবা প্রদান করে; এমনকি ভ্রু সাজানোর পার্লারের মতো প্রতিষ্ঠানেও সেবাগ্রহীতাদের পাঠানো হয়। গত পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটির সদস্য বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ এবং চলতি বছরের প্রথমার্ধে আয় ৪৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ কোটি ১০ লাখ ডলারে।
প্রধান নির্বাহী ইশিজাকা জানান, জনসংখ্যা হ্রাস ঠেকাতেই ২০০০ সালে ব্যাংকিং ছেড়ে তিনি এই খাতে যুক্ত হন। তিনি বলেন, 'যেহেতু জাপানি সমাজে বিয়ের বাইরে সন্তান নেওয়ার প্রচলন প্রায় নেই বললেই চলে, তাই আমি বুঝতে পেরেছিলাম কেবল বিয়ের উদ্দেশ্যে নিবেদিত ম্যাচমেকিং সার্ভিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যৎ রয়েছে।'
সম্প্রতি দেশটির স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, টানা দুই বছর বিয়ের সংখ্যা বাড়ার ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে জন্মহার শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে—যা গত ১১ বছরে এই নির্দিষ্ট সময়ে প্রথম বৃদ্ধি। সদস্য ইয়াসুদা জানান, তিন থেকে চারটি সন্তান নেওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে দ্রুত বিয়ে করতে চান তিনি।
ইশিজাকা মনে করেন, তরুণ প্রজন্ম বিয়ে থেকে দূরে সরে যাচ্ছে বলে যে ধারণা রয়েছে, তার বদলে তারা আসলে বিয়ে করার কার্যকর পথ খুঁজছে। তিনি বলেন, 'জরিপে ধারাবাহিকভাবে দেখা যায় যে ৮০ শতাংশেরও বেশি তরুণ উপযুক্ত সঙ্গী পেলে বিয়ে করতে চান। আমি নিশ্চিত যে আমাদের মাধ্যমে সম্পন্ন প্রতিটি বিবাহ জন্মহারের পতন ঠেকাতে সরাসরি ভূমিকা রাখছে।'
