‘যুদ্ধক্ষমতা সংক্রান্ত’ প্রস্তাব পাস: ইরানে যুদ্ধ চালাতে অনুমোদন নিতে হবে কংগ্রেসের, ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরান যুদ্ধ বন্ধ করতে অথবা সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে নির্দেশ দিয়ে একটি প্রস্তাব পাস করেছে মার্কিন সিনেট। রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত সিনেটেই মঙ্গলবার এই প্রস্তাব পাস হয়।
ভোটাভুটিতে ৫০-৪৮ ভোটে প্রস্তাবটি পাস হয়, যেখানে কয়েকজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাও ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যোগ দেন। চলতি মাসের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদেও (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) একই প্রস্তাব পাস হয়েছিল।
তবে এই রেজল্যুশন বা প্রস্তাবটি মূলত একটি প্রতীকী পদক্ষেপ। কংগ্রেসের উভয় কক্ষে পাস হওয়ার পরও এটি ট্রাম্পের বিবেচনার জন্য পাঠানো হবে না এবং এর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতাও নেই।
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ইরানের সই হওয়া শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে যখন খোদ রিপাবলিকানদের মধ্যেই সংশয় তৈরি হয়েছে এবং দেশে অজনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই যুদ্ধ পঞ্চম মাসে পা দিয়েছে, ঠিক তখনই এই ভোটাভুটি হলো।
১৯৭৩ সালে 'ওয়ার পাওয়ারস রেজল্যুশন' বা যুদ্ধক্ষমতা আইন প্রণয়নের পর এই প্রথমবার কংগ্রেসের উভয় কক্ষ এমন একটি 'কনকারেন্ট রেজল্যুশন' পাস করল, যেখানে একজন প্রেসিডেন্টকে সামরিক অভিযান অবসানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ধরনের 'কনকারেন্ট রেজল্যুশন' মূলত কংগ্রেসের মনোভাব বা ইচ্ছার প্রকাশ ঘটায়। অন্যান্য আইনের মতো এটি প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের জন্য পাঠানো হয় না। এর আগে ২০১৯ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ থেকে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীকে সরিয়ে আনার জন্য পাস হওয়া একটি জয়েন্ট রেজল্যুশনে ভেটো দিয়েছিলেন ট্রাম্প।
'হাতকড়া নয়, বরং হাতে চড়'
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক লরা ব্লুমেনফেল্ড এই প্রস্তাবকে 'হাতকড়ার চেয়ে বরং হাতে চড় মারার সঙ্গে' তুলনা করেছেন। কারণ এর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই।
তবে তিনি বিবিসিকে বলেন, 'এই প্রস্তাবটি আমেরিকার জনগণের প্রকৃত অনুভূতিরই প্রতিফলন ঘটাচ্ছে।'
এই প্রস্তাব পাস হওয়াটা ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোর ক্ষেত্রে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে পেট্রলের দাম বেড়ে যাওয়ায় যুদ্ধটি সাধারণ মানুষের কাছে চরম অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এখন হোয়াইট হাউসের ওপর যুদ্ধ শেষ করার চাপ আরও বাড়বে।
চলতি মাসের শুরুতে প্রতিনিধি পরিষদেও ২১৫-২০৮ ভোটে প্রস্তাবটি পাস হয়েছিল। সেখানে চারজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।
তবে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বিবিসিকে জানান, গত ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতিতে দুই পক্ষ একমত হওয়ার পর এখন আর এমন কোনো শত্রুতা বা সংঘাত নেই, যেখান থেকে আমেরিকান বাহিনীকে প্রত্যাহার করতে হবে।
ওই কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, মিচ ম্যাককনেল এবং ডেভ ম্যাককরমিক নামের দুজন রিপাবলিকান সিনেটর অনুপস্থিত থাকার কারণেই মূলত এই প্রস্তাবটি পাস হতে পেরেছে।
সিনেটে যে চারজন রিপাবলিকান ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন, তারা হলেন—র্যান্ড পল, লিসা মুরকোস্কি, সুসান কলিন্স এবং বিল ক্যাসিডি।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন ফেটারম্যান তার দলের একমাত্র সদস্য হিসেবে এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন।
রিপাবলিকানদের মধ্যে বিভক্তি
আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকানদের মধ্যে যে বিভক্তি বাড়ছে, এটি তারই সর্বশেষ প্রমাণ। এই নির্বাচনের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে কংগ্রেসের দুই কক্ষে রিপাবলিকানরা তাদের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারবে কি না।
সম্প্রতি কিছু বিষয়ে রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের বিরোধিতা করেছেন। সরকারের ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার রাজনৈতিক মিত্রদের ক্ষতিপূরণ দিতে ট্রাম্পের ১.৮ বিলিয়ন ডলারের 'অ্যান্টি-ওয়েপনাইজেশন' তহবিল গঠনের পরিকল্পনা তারা আটকে দিয়েছেন।
এদিকে ফেডারেল আইন অনুযায়ী, কোনো সামরিক অভিযান ৬০ দিনের বেশি চালাতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরু করেছিল। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি হলো, এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর থেকে এই ৬০ দিনের হিসাব আবার শূন্য থেকে শুরু হয়েছে।
এ ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে হোয়াইট হাউস এই সময়সীমা আরও ৩০ দিন বাড়াতে পারে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতি চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে এবং শত্রুতা অবসানের লক্ষ্যে কাজ করছে। গত সপ্তাহে উভয় দেশের প্রেসিডেন্ট একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছেন।
ওই সমঝোতা অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ও তেহরান ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করার বিষয়ে একটি বিস্তৃত চুক্তিতে পৌঁছাতে ৬০ দিনের জন্য আলোচনা করবে।
