হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া ১১ হাজার নাবিককে সরিয়ে নিচ্ছে জাতিসংঘ
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের পর উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকে পড়া ১১ হাজারেরও বেশি নাবিককে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেছে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও)। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক এবং অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তির পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে চুক্তির বিভিন্ন শর্ত, বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ এখনো রয়ে গেছে।
আইএমও'র মহাসচিব আর্সেনিও ডমিঙ্গেজ মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বলেন, 'ইরান, ওমান, এ অঞ্চলের অন্যান্য উপকূলীয় রাষ্ট্র, যুক্তরাষ্ট্র এবং সামুদ্রিক শিল্প খাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমে এই বৃহৎ পরিসরের কার্যক্রম পরিচালিত হবে।'
তিনি বলেন, 'এই কার্যক্রমে সহায়তা করার জন্য আমরা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চয়তা পেয়েছি এবং নিরাপদ নৌচলাচলের উপযোগী পরিস্থিতি রয়েছে কি না তা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করেছি।'
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলা শুরু হওয়ার পর তেহরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে শত শত জাহাজ ও ১১ হাজারের বেশি নাবিক জলপথটিতে আটকা পড়ে। প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারেরও বেশি হয়ে যায়। একই সঙ্গে জ্বালানি এবং সারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
তবে গত সপ্তাহে চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে নৌযান চলাচল আবার বাড়তে শুরু করেছে। জাহাজ চলাচল–সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ক্লেপলার জানিয়েছে, সোমবার অন্তত ৩৬টি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে, যা যুদ্ধ শুরুর পর একদিনে সর্বোচ্চ চলাচলের রেকর্ড। সংস্থাটির আরেকটি তথ্য অনুযায়ী, পুনরায় চালু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত অন্তত ১৭২টি জাহাজ প্রণালিটি ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে শুধু শনিবারই ৪২টি জাহাজ চলাচল করেছে।
তবে ১৮ জুন, অর্থাৎ চুক্তি স্বাক্ষরের পরের দিন থেকে শুরু হওয়া এই চলাচল এখনো সংঘাত-পূর্ব সময়ের দৈনিক গড়ে প্রায় ১৩৮টি জাহাজ চলাচলের তুলনায় অনেক কম। বিবিসি ভেরিফাইয়ের বিশ্লেষণ করা জাহাজ-পর্যবেক্ষণ তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার পর্যন্ত ২০০টিরও বেশি তেলবাহী জাহাজ প্রণালিটির ভেতরে অপেক্ষমাণ অবস্থায় ছিল।
ওমানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কয়েক মাস ধরে আলোচনায় থাকা আইএমওর পরিকল্পনা অনুযায়ী সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে সম্পন্ন হবে।
মন্ত্রণালয়টি বলেছে, 'বর্তমান পরিস্থিতিতে সংঘর্ষের ঝুঁকি বেশি থাকায় জাহাজ চলাচল ধীরে ধীরে এবং নিয়ন্ত্রিত উপায়ে স্বাভাবিক করতে হবে।'
আইএমওর সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে দুটি অস্থায়ী নৌপথ ব্যবহার করা হতে পারে। ওমানের জারি করা নৌযান চলাচল–সংক্রান্ত নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি জাহাজের সঙ্গে পৃথকভাবে যোগাযোগ করে পরবর্তী নির্দেশনা দেওয়া হবে।
আইএমও জানিয়েছে, অঞ্চলটি থেকে নিরাপদে কতগুলো জাহাজ বেরিয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে প্রতিদিন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
ডেনমার্ক মঙ্গলবার ঘোষণা দিয়েছে যে, গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ পুনরায় চালু করতে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক অভিযানে তারা যোগ দেবে।
হরমুজ প্রণালি থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি তোহিদ আসাদি জানিয়েছেন, শান্তি চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা 'কিছুটা ইতিবাচক দিকে এগিয়েছে'।
তিনি বলেন, 'আজ আমরা ওমান ও ইরানের পক্ষ থেকে একটি যৌথ বিবৃতি পেয়েছি, যেখানে বলা হয়েছে যে তারা হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করছে। এটি একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।'
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রণালিটি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, তা এখনো স্পষ্ট নয় এবং এখনো হরমুজের উভয় পাশে শত শত জাহাজ আটকে রয়েছে।
যদিও যুদ্ধবিরতি ও শান্তি চুক্তির অগ্রগতি হয়েছে, তবুও সমঝোতা স্মারকের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মতবিরোধ অব্যাহত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, সমঝোতা স্মারকে এমন নিশ্চয়তা রয়েছে যে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার পরিদর্শনের আওতায় আসবে।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, 'ইরান ভবিষ্যতে অনির্দিষ্টকাল ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ের পারমাণবিক পরিদর্শনে সম্পূর্ণ ও নিঃশর্তভাবে সম্মত হয়েছে। এর মাধ্যমে পারমাণবিক কার্যক্রমে সততা নিশ্চিত হবে।'
তবে ট্রাম্পের এই মন্তব্যের কিছুক্ষণ আগে ইরান জানিয়েছিল, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলো জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক সংস্থা পরিদর্শন করতে পারবে না।
এর জবাবে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, 'ইরানিরা তাদের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির অবশিষ্ট অংশে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার কঠোর পরিদর্শনে সম্মত হয়েছে। নিজেদের দেশের জনগণের উদ্দেশ্যে ইরানি সরকার যা বলার প্রয়োজন মনে করবে, তা বলবেই।'
এদিকে পাকিস্তান সফরকালে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, 'আমাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে আমরা কোনো ব্যক্তির সঙ্গে, কোনো পরিস্থিতিতে, কখনোই আলোচনা করব না।'
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো আলোচনা হয়নি এবং বিষয়টি আলোচনার অংশ ছিল না।
তিনি আরও বলেন, সমঝোতা স্মারকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের কোনো উল্লেখ নেই এবং বিষয়টি নিয়ে কোনো ধরনের বিভ্রান্তির সুযোগ নেই।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মঙ্গলবার সংযুক্ত আরব আমিরাতে উপসাগরীয় সফর শুরু করেছেন। তিনি কুয়েত ও বাহরাইনও সফর করবেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। সফরের উদ্দেশ্য হলো তেহরানের সঙ্গে হওয়া চুক্তি নিয়ে আলোচনা করা।
রুবিও একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেছেন, কোনো চূড়ান্ত চুক্তির আওতায় ইরানকে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে টোল বা ফি আদায়ের অনুমতি দেওয়া হবে না।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে পৌঁছে তিনি বলেন, 'এটি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ। আন্তর্জাতিক জলপথে কোনো দেশ টোল বা ফি আরোপ করতে পারে না। এটি বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আইন।'
তিনি আরও বলেন, 'আমার বিশ্বাস, এ অঞ্চলের সব দেশই এ বিষয়ে আমাদের সঙ্গে একমত হবে।'
তবে তেহরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এর আগে জোর দিয়ে বলেছেন, যোগাযোগের ব্যবস্থা চালু রেখে প্রণালিটি খোলা রাখার বিষয়ে দুই পক্ষ সম্মত হলেও হরমুজ প্রণালি 'কখনোই যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরে যাবে না'।
আইএমওর মহাসচিব ডমিঙ্গেজ বলেছেন, নাবিকদের সহায়তায় হওয়া এই চুক্তি 'সামুদ্রিক নিরাপত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বেসামরিক জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে অগ্রহণযোগ্য হামলার অবসান ঘটানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ'।
তিনি বলেন, 'হাজার হাজার নিরীহ নাবিকের দীর্ঘ মাসের দুর্ভোগ, মানসিক কষ্ট এবং এর ফলে সারা বিশ্বে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, তার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পাদিত শান্তি চুক্তিকে আমি গভীর সন্তোষের সঙ্গে স্বাগত জানাই।'
