ওবামা আমলের চুক্তির মতো পারমাণবিক কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শনে রাজি ইরান: ভ্যান্স
ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। এর ফলে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে তেহরানের সঙ্গে হওয়া পারমাণবিক চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা ব্যবস্থা পুনরায় ফিরে আসছে, যা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একসময় বাতিল করেছিলেন।
সোমবার সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক রিসোর্টে এক সংবাদ সম্মেলনে ভ্যান্স বলেন, 'এটি মার্কিন জনগণের জন্য একটি বড় মাইলফলক এবং ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি স্থায়ীভাবে বন্ধ করার বা নিরস্ত্রীকরণের প্রথম পদক্ষেপ।'
তিনি জানান, গত সপ্তাহের নড়বড়ে যুদ্ধবিরতিকে আরও বিস্তৃত শান্তি চুক্তিতে রূপ দিতে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা কাজ করছেন। কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা এগিয়ে যাওয়ায় তিনি শিগগিরই দেশে ফিরবেন বলেও জানান।
ভ্যান্সের মতে, গত রোববার ট্রাম্পের এক হুঁশিয়ারির পর ইরানিরা আলোচনা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছিল। ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ইরানকে আবারও 'কঠোর আঘাত' করতে পারে। তবে আলোচকরা স্থানীয় সময় রাত ১টার পরও বৈঠক চালিয়ে যান এবং কারিগরি বিশেষজ্ঞদের দল তখনও সেখানে উপস্থিত ছিল।
তিনি বলেন, 'গতকাল আমরা ইরানিদের বলেছি, আপনারা যদি এমন কিছু করেন, যাকে আমাদের প্রজন্মের মানুষ হয়তো মুখের লড়াই বলবে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া আসবে না—এমন আশা করতে পারেন না।'
ট্রাম্পের হুমকি আলোচনার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করেছে—এমন অভিযোগও ভ্যান্স অস্বীকার করেন।
বুধবার ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে ট্রাম্প স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি স্মারকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে তাদের সবচেয়ে কঠিন বিরোধগুলো মেটাতে ৬০ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। এসব বিরোধের মধ্যে রয়েছে ইরানের ইউরেনিয়াম মজুতের ভবিষ্যৎ এবং হরমুজ প্রণালির বিষয়টি।
গত সপ্তাহের শেষে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা এই চুক্তিকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। এর প্রেক্ষিতে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল।
যুদ্ধবিরতির শর্তে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধের কথা বলা হলেও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার এই চুক্তিতে সই করেনি। নেতানিয়াহু এই সমঝোতার সমালোচনা করেছেন এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, তিনি হামলা অব্যাহত রেখে এই চুক্তি নস্যাৎ করার চেষ্টা করতে পারেন।
নেতানিয়াহুর মুখপাত্র ডেভিড মেনসার বলেন, 'ইসরায়েল এই চুক্তির পক্ষ নয়। আমরা দেখেছি ইরানি শাসকরা সবসময় মিথ্যা বলে ও প্রতারণা করে, তারা কখনোই সত্য বলে না।'
ভ্যান্স সোমবার আরও জানান, আলোচকরা ইসরায়েল, লেবানন, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং সংঘাত নিরসনে একটি সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন।
দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সেনা উপস্থিতির বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে, যা লেবানন সেনাবাহিনী এবং হিজবুল্লাহর ওপর ইরানের চাপের ওপর নির্ভর করছে।
ভ্যান্স বলেন, হরমুজ প্রণালি এখনও উন্মুক্ত রয়েছে। রোববারের আলোচনায় এটি খোলা রাখার জন্য একটি 'প্রক্রিয়া' নিয়ে আলাপ হয়েছে।
ইরান কোনো ধরনের টোল আরোপ করলে সেটি মেনে নেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। তবে ট্রাম্প শনিবার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, চুক্তি ভেস্তে গেলে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এমন ফি আরোপের কথা বিবেচনা করতে পারে।
ভ্যান্স জানান, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকদের সঙ্গে আলোচনা সোমবারই শুরু হতে পারে। ২০১৫ সালের যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে ইরানের অঙ্গীকার পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব ছিল এই সংস্থার ওপর। ওই চুক্তিটিই ওবামা প্রশাসনের পারমাণবিক চুক্তি হিসেবে পরিচিত, যার কঠোর সমালোচক ছিলেন ট্রাম্প।
২০১৮ সালে ট্রাম্প চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর ইরান কিছু স্থাপনায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রবেশাধিকার সীমিত করে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা চালানোর পর থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বর্তমান অবস্থা যাচাইয়ের সুযোগও পরিদর্শকরা পাননি।
এদিকে সোমবার যুদ্ধবিরতির ৬০ দিনের মেয়াদের জন্য ইরানি তেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়।
