ছিলেন গৃহহীন, মেষ চরাতেন, ঘুমাতেন রাস্তায়—সেই আলিরেজা বেইরানভান্দ এখন ইরানের বিশ্বকাপ নায়ক
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের বিপক্ষে সাতটি গোল দুর্দান্তভাবে আটকে দিয়ে ইরানের গোলরক্ষক যে অনবদ্য নৈপুণ্য দেখিয়েছেন এবং ম্যাচ সেরার পুরষ্কারও নিজের ঝুলিতে ভরেছেন। এটি গিনেস বিশ্বরেকর্ডধারী এই খেলোয়াড়ের অসাধারণ জীবনের গল্পে নতুন একটি অধ্যায় যোগ করেছে।
টুর্নামেন্টজুড়ে গোলরক্ষকদের একের পর এক চমকপ্রদ রক্ষণাত্মক পারফরম্যান্সের কারণে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপকে ক্রমেই 'গোলরক্ষকদের বিশ্বকাপ' বলা হচ্ছে। কুরাসাওয়ের অধিনায়ক এলোয় রুম, কাবো ভের্দের ভোজিনহা এবং সৌদি আরবের মোহাম্মদ আল-ওয়াইস বীরত্বপূর্ণ নৈপুণ্য দেখিয়ে শিরোনামে আসার পর সর্বশেষ আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন ইরানের আলিরেজা বেইরানভান্দ।
তবে বেলজিয়ামের বিপক্ষে বেইরানভান্দের পারফরম্যান্স ছিল আলাদা মাত্রার। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের নবম স্থানে থাকা বেলজিয়ামের বিপক্ষে তিনি সাতটি গোল দুর্দান্তভাবে আটকে দিয়ে ইরানকে গোলশূন্য ড্র এনে দেন। তার দৃঢ় উপস্থিতি, গুরুত্বপূর্ণ সেভ এবং প্রতিপক্ষকে গোল করতে না দেওয়ার ক্ষমতা তাকে ম্যাচসেরার পুরস্কার এনে দেয়।
বেইরানভান্দের রেকর্ড
তবে বিশ্বকাপের নায়ক হওয়ার অনেক আগেই বেইরানভান্দের জীবনকাহিনি ফুটবলের সবচেয়ে অসাধারণ যাত্রাগুলোর একটি হয়ে উঠেছিল।
তিনি দুটি গিনেস বিশ্বরেকর্ডের অধিকারী। একটি ফুটবল ম্যাচে সবচেয়ে দূরে বল নিক্ষেপের জন্য এবং অন্যটি সবচেয়ে দূরের ড্রপ-কিকের জন্য।
২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ইরানের ম্যাচে বেইরানভান্দ ২০০ দশমিক ১৪ ফুট (৬১ দশমিক ০০২ মিটার) দূরে বল ছুড়ে রেকর্ড গড়েন, যা এখনো অক্ষুণ্ন রয়েছে।
পরে তিনি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দূরের ড্রপ-কিকের রেকর্ডও গড়েন, যার দূরত্ব ছিল ২৫৫ দশমিক ৯৫ ফুট (৭৮ দশমিক ০১৪ মিটার)।
কঠিন শৈশব
১৯৯২ সালে ইরানের লোরেস্তান অঞ্চলের একটি গ্রামীণ এলাকায় যাযাবর কুর্দি 'লাক' পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন বেইরানভান্দ।
তিনি চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠেন। শৈশব থেকেই তার স্বপ্ন ছিল ফুটবলার হওয়ার। কিন্তু তার বাবা এই স্বপ্নের তীব্র বিরোধিতা করতেন। তিনি চাইতেন ছেলে প্রচলিত পেশায় যুক্ত হোক এবং পরিবারের ভরণপোষণে সাহায্য করুক।
এক পর্যায়ে ছেলেকে ফুটবল ছেড়ে দিতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে তার বাবা বেইরানভান্দের ফুটবল পোশাক ও হ্যান্ডগ্লভস পর্যন্ত নষ্ট করে দেন।
কিন্তু বেইরানভান্দ হাল ছাড়েননি। কিশোর বয়সে তিনি বাড়ি ছেড়ে নিজের ফুটবল স্বপ্নের পেছনে ছুটতে তেহরানে চলে যান।
রাজধানীতে পৌঁছানোর পর তার থাকার কোনো জায়গা ছিল না, ছিল না কোনো অর্থ কিংবা পরিচিত মানুষ। সুযোগের সন্ধানে মাসের পর মাস তিনি ফুটবল ক্লাবগুলোর বাইরে রাস্তায় ঘুমিয়েছেন।
বেঁচে থাকার জন্য তিনি নানা ধরনের অস্থায়ী কাজ করেছেন। এর মধ্যে ছিল রাস্তা ঝাড়ু দেওয়া, গাড়ি ধোয়া, পোশাক তৈরির কারখানায় কাজ করা এবং গভীর রাতের একটি পিৎজার দোকানে খামির প্রস্তুত করা।
জাতীয় দলে যাত্রা
তার ছয় ফুট চার ইঞ্চি (১৯৪ সেন্টিমিটার) উচ্চতার সুঠাম দেহ একসময় কোচদের নজর কাড়ে।
এ ছাড়া শৈশবে ভেড়া চরানোর সময় তিনি 'দালপারান' নামের একটি স্থানীয় খেলা খেলতেন, যেখানে ভারী পাথর অনেক দূরে ছুড়ে ফেলতে হতো।
সেই খেলা তাকে বল দূরে নিক্ষেপ করার অসাধারণ ক্ষমতা গড়ে তুলতে সাহায্য করে, যা পরবর্তীতে একজন গোলরক্ষক হিসেবে তার সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হয়ে ওঠে। এই যাত্রাই শেষ পর্যন্ত তাকে ইরানের জাতীয় দলে পৌঁছে দেয়।
সেখানে তিনি দেশের প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক এবং এশিয়ার অন্যতম নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ৮০টিরও বেশি ম্যাচ খেলেছেন। এ ছাড়া ২০১৮ ও ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপসহ একাধিক বড় টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছেন।
রাতারাতি তারকা
২০১৮ সালে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপেই বেইরানভান্দ বিশ্বজুড়ে পরিচিত নাম হয়ে ওঠেন।
গ্রুপ পর্বে পর্তুগালের বিপক্ষে ম্যাচে ৫৩তম মিনিটে পেনাল্টি নিতে এগিয়ে আসেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।
ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়কে সামনে পেয়েও বেইরানভান্দ শান্ত ছিলেন। তিনি রোনালদোর গতিবিধি বুঝে ফেলেন এবং বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে দুর্দান্তভাবে শটটি ঠেকান।
সেই সেভ ইরানকে ঐতিহাসিক ১-১ গোলের ড্র এনে দিতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে বেইরানভান্দকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের আলোচিত তারকায় পরিণত করে।
২০২৬ সালের কীর্তি
ইরানের জন্য এক কঠিন সময়ে বেইরানভান্দ ২০১৬ সালের বিশ্বকাপে যাত্রা শুরু করেছেন।
ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে দলটি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে প্রচলিত প্রস্তুতি শিবির গড়ে তুলতে পারেনি। পরিবর্তে তারা সীমান্তের ওপারে মেক্সিকোতে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।
তবে মাঠের বাইরের এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ইরান প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রেখেছে। দুই ম্যাচে দুই পয়েন্ট সংগ্রহ করে তারা নকআউট পর্বে ওঠার আশা জীবিত রেখেছে।
বেলজিয়ামের বিপক্ষে বেইরানভান্দ আবারও দেখিয়েছেন কেন তাকে বিশ্বের সবচেয়ে দৃঢ়চেতা গোলরক্ষকদের একজন মনে করা হয়।
ম্যাচের শেষ দিকে তার সেরা মুহূর্তটি আসে। বেলজিয়ামের ম্যাক্সিম ডে কুইপার তখন প্রায় নিশ্চিতভাবেই জয়সূচক গোল করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু বেইরানভান্দ মুহূর্তের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখান।
তিনি নিচু হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে শটটি প্রতিহত করেন এবং পরে আলগা হয়ে যাওয়া বলটিও নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন।
তেহরানের রাস্তায় রাত কাটানো এক কিশোর থেকে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে শট ঠেকানো নায়ক হয়ে ওঠা—আলিরেজা বেইরানভান্দের এই যাত্রা বিশ্বকাপের সবচেয়ে অসাধারণ গল্পগুলোর একটি হয়ে থাকবেন।
