নতুন ঋণ প্যাকেজে ১৫% একক ভ্যাট হার, টার্নওভার ট্যাক্সের শর্ত আইএমএফের
বাংলাদেশের নতুন ঋণ লাভের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে, রাজস্ব আদায় ও ব্যাংকিং খাতে সংস্কার সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা চেয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, আইএমএফ চায় মূল্য সংযোজন করের (ভ্যাট) একটি নির্দিষ্ট হার হবে এবং সেটি ১৫ শতাংশ। পাশাপাশি টার্নওভার ট্যাক্স আরোপ করার পক্ষে সংস্থাটি। এছাড়া ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা, দুর্বল প্রতিষ্ঠান একীভূতকরণ এবং ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় সরকারের হস্তক্ষেপ বন্ধ করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা চেয়েছে সংস্থাটি।
নাম না প্রকাশের শর্তে মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র এক কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, সরকারও একক ভ্যাট হার চালু করার পক্ষে, তবে সেটি ১০% থেকে ১২% এর বেশি নয়। আর টার্নওভার ট্যাক্স এখনই আরোপ করবে না সরকার। সরকার মনে করে, রাজস্ব বিভাগের হিসাব পদ্ধতির আরও উন্নয়নের পরে টার্নওভার ট্যাক্স আরোপ করা যেতে পারে। কারণ প্রতিষ্ঠান লাভ করতে না পারলেও টার্নওভার ট্যাক্স দিতে হয়। সরকার মনে করে, ব্যবসায়ীদের থেকে এই কর তখনই নেওয়া ঠিক হবে, যখন সঠিক হিসাবের মাধ্যমে করদাতাকে তা ফেরতও দেওয়া যাবে।
''এছাড়া ব্যাংক খাতের সংস্কারের বিষয়ে সরকার আগ্রহী। এজন্য সরকার ব্যাংক রেজুলেশন অ্যাক্ট পাশ করেছে। তবে নতুন আইনে একীভূত করা ব্যাংকের মালিকানা ফেরত সংক্রান্ত বিষয়ে ১৮ক নামে যে নতুন ধারা বর্তমান সরকার যোগ করেছে, সেটি নিয়ে আইএমএফের আপত্তি রয়েছে। যদিও আইএমএফকে সন্তুষ্ট করতে সরকার এই ধারাটি বাদ দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে'' —জানান ওই কর্মকর্তা।
ডিসেম্বরে হতে পারে নতুন ঋণ চুক্তি
২০২৩ সালে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার আইএমএফের সঙ্গে ৪.৭ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার চুক্তি করে। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এর পরিমাণ বাড়িয়ে ৫.৫ বিলিয়ন ডলার করে। ৭টি কিস্তিতে এই ঋণ ছাড় করার কথা ছিল। এরমধ্যে ঋণ কর্মসূচির ৫টি কিস্তিতে ৩.৭ বিলিয়ন ডলার ছাড় করে আইএমএফ।
তবে শর্তসমূহ পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়ায় পরবর্তী কিস্তিগুলোর অর্থ ছাড় স্থগিত রাখে সংস্থাটি। এর প্রতিক্রিয়ায় বর্তমান বিএনপি সরকার আগের চুক্তিটি বাতিল করে সম্পূর্ণ নতুন একটি ঋণ চুক্তি সইয়ের জন্য গত ১ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব দেয় আইএমএফকে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই নতুন প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করতে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল আগামী জুলাই মাসের মাঝামাঝিতে বাংলাদেশ সফরে আসছে। এই মিশনের মূল্যায়ন প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে, আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভায় চূড়ান্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। যদি উভয় পক্ষ শর্তাবলীতে একমত হয়, তবে আগামী ডিসেম্বর মাসেই নতুন চুক্তিটি সই হতে পারে।
অর্থমন্ত্রণালয় সুত্র জানায়, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) বাংলাদেশের বর্তমান কোটা হলো ১০৬৬.৬ মিলিয়ন এসডিআর (স্পেশাল ড্রয়িং রাইটস), এটি আইএমএফের নিজস্ব রিজার্ভ সম্পদ। আইএমএফের নিয়ম অনুযায়ী, একটি দেশ কোটার সর্বোচ্চ ৪৩৫% সাধারণ ঋণ পেয়ে থাকে। অর্থাৎ ,বাংলাদেশ এই কোটার বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদে সব মিলিয়ে প্রায় ৪৬৪০.৭১ মিলিয়ন এসডিআর, বা বর্তমান বিনিময় হারে প্রায় ৬.১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত ঋণ সুবিধা পেতে পারে।
বাংলাদেশ আইএমএফ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায়, ইতোমধ্যেই ২৮৮৬.৫৭ মিলিয়ন এসডিআর ঋণ ব্যবহার করছে। বকেয়া ঋণ বাদ দিলে বাংলাদেশ পরবর্তীতে সর্বোচ্চ আরও প্রায় ১৭৫৪.১৪ মিলিয়ন এসডিআর বা ২.৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ পেতে পারে।
কর্মকর্তারা জানান, সরকার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলাসহ বাংলাদেশের অর্থনীতির সক্ষমতা বৃদ্ধি করার অন্যান্য উদ্যোগের জন্য, আইএমএফ থেকে বাড়তি আরও ১.৬৮ বিলিয়ন ডলার চাইছে। অর্থাৎ সরকার নতুন কর্মসূচির আওতায়, সবমিলিয়ে ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ চাইছে।
অর্থনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি আইএমএফ ঋণ
ওই কর্মকর্তা বলেন, আইএমএফের ঋণে অর্থের পরিমাণ মূখ্য নয়। আইএমএফ ঋণ কর্মসূচি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বা কান্ট্রি রেটিং করে থাকে। এই রেটিংকে অন্যান্য আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী সংস্থা ও উন্নয়ন অংশীদার তাদের ঋণ কর্মসূচিরও বেঞ্চমার্ক বা মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে। কোনো দেশ আইএমএফের ঋণ কর্মসূচিতে না থাকলে—তখন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও অন্যান্য দেশ আইএমএফের আর্টিকেল-ফোর এর মূল্যায়নকে বিবেচনা করে। ফলে অন্যান্য সংস্থা সংশ্লিষ্ট দেশ সম্পর্কে সহজে ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এজন্য সরকার ঋণ কর্মসূচিতে যেতে চাচ্ছে।
তিনি বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি ধরা হয়েছে। এই ঘাটতি এবং আগে নেওয়া ঋণ পরিশোধের জন্য বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। এরমধ্যে বাজেট সহায়তা হিসেবে ধরা হয়েছে ৪৩ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা।
তিনি আরও বলেন, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২.৫ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা নেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ১ বিলিয়ন ডলার, জাইকা থেকে ৩০০ মিলিয়ন ডলার, এআইআইবি থেকে ৬০০ মিলিয়ন ডলার এবং বিশ্বব্যাংক থেকে নেওয়া হয় ৬০০ মিলিয়ন ডলার। তবে বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবি থেকে পাওয়া অর্থের বড় অংশ রি-পারপাজ লোন, অর্থাৎ অন্য প্রকল্পের ঋণ বাজেট সাপোর্ট অংশে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।
