বন্ধ ৪৪ রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা চালুর প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর, সস্তায় ঋণ ও গ্যাসের নিশ্চয়তা চাইলেন ব্যবসায়ীরা
রাষ্ট্রায়ত্ত ৪৪টি বন্ধ ও লোকসানী কারখানা নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে চালু করতে, সরকারের কাছ থেকে নীতি সহায়তার পাশাপাশি কম সুদের ঋণ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার সহায়তা চেয়েছেন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা।
গতকাল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এই দাবিগুলো উত্থাপন করা হয়। সভায় সরকারি কর্মকর্তারা এই কারখানাগুলোতে বিনিয়োগের সুযোগের কথা তুলে ধরেন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি), যৌথ উদ্যোগ, দীর্ঘমেয়াদি ইজারা এবং সরাসরি বিক্রির মাধ্যমে এগুলো চালুর পরিকল্পনা পেশ করেন।
বিনিয়োগের প্রস্তাব আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
বিনিয়োগকারীদের সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী কারখানাগুলোতে বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব জমা দেওয়ার আহ্বান জানান। তারেক রহমান বলেন, ''পিপিপি'র ভিত্তিতে, যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে কিংবা টার্ম লিজের মাধ্যমে এসব কারখানায় বিনিয়োগের প্রস্তাব আাপনারা দেন। আপনাদের কোন ধরণের সহযোগিতা দরকার—তা আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করব। আমরা আপনাদের সব ধরণের সহযোগিতা করব।"
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (পিএমও) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তারেক রহমানকে উদ্ধৃত করে এসব কথা জানানো হয়।
বিনিয়োগকারীদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল— রুগ্ণ ও বন্ধ শিল্পকারখানাগুলোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০,০০০ কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন (রিফাইন্যান্সিং) তহবিলের আওতায়, ঋণের সুদহার বা খরচ কমানো। ঋণের সুদ হার কমানোর ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হবে বলে সভায় আশ্বাস দিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
সুদের হার নিয়ে আলোচনা
সভায় উপস্থিত ছিলেন এমন একজন ব্যবসায়ী নেতা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে টিবিএসকে বলেন, ঋণের সুদের হার কমানোর বিষয়ে সভায় গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানান, এই স্কিমের ঋণের সুদহার ৫ থেকে ৬ শতাংশ। সুদহার ৫ শতাংশের চেয়ে কমানো হলে ব্যাংকগুলোর পরিচালক ব্যয় কঠিন হতে পারে। তা সত্বেও বন্ধ ও লোকসানী কারখানায় বিনিয়োগে আগ্রহীদের জন্য সুদহার আরও ১ থেকে ২ শতাংশ কমানো যায় কি-না, তা বাংলাদেশ ব্যাংক বিবেচনা করবে।
সভায় অংশ নেওয়া দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সামনে, শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ৪৪টি কারখানার বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে সরকার। কারখানাগুলোর অবস্থান, জমির পরিমাণ, বিদ্যমান অবকাঠামো, সমুদ্রবন্দর থেকে দূরত্ব, বিনিয়োগ সুবিধা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, উৎপাদন সম্প্রসারণের সম্ভাবনাসহ বিভিন্ন দিক তুলে সরকার।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু জানান, শিল্প মন্ত্রণালয়, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) যৌথভাবে এই কর্মসূচির আয়োজন করে।
বর্তমানে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা ১০৭টি কারখানার মধ্যে ২৬ শতাংশ লোকসানে রয়েছে এবং ৬৪ শতাংশ বন্ধ রয়েছে।
পুনরায় চালুর পরিকল্পনায় ৪৪ কারখানা
যে ৪৪টি কারখানা পুনরায় চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের আওতাধীন ১২টি কারখানা, বাংলাদেশ স্টিল এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের আওতাধীন ৪টি, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের ১০টি, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের ১৩টি ও বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের ৫টি বন্ধ ও লোকসানী কারখানা– বিক্রির মাধ্যমে, দীর্ঘমেয়াদি লিজের মাধ্যমে, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে বা যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে চালু করতে চায় সরকার।
এসব বন্ধ ও লোকসানী কারখানা চালু করার ক্ষেত্রে 'টার্মস এন্ড কন্ডিশন' (শর্তাবলী) সম্পর্কে জানতে চান ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান। একইসঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করেন তিনি।
বন্ধ চিনিকলগুলোর জমিতে বিট চাষ করে, তা থেকে চিনি উৎপাদনের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন একজন ব্যবসায়ী।
ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন প্রস্তাব ও মতামত শুনে প্রধানমন্ত্রী তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, "আমি আগেও বলেছি, আপনারা এগিয়ে যান এবং আমরা আপনাদের সহযোগিতা করতে চাই। আপনারা নানা বিষয়ে আলোচনা করেছেন। কীভাবে স্বল্প সময়ের মধ্যে এসব বিষয়ে আপনাদের সহযোগিতা দেওয়া যায়, সেই মতামতও দিয়েছেন। আমরা ইতোমধ্যে কিছু বিষয়ে কাজ শুরু করেছি।"
তারেক রহমান বলেন, "রাজনৈতিক সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো—প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠার পথ তৈরি করা। বাস্তবতা হলো, আমরা একবারে সব সমস্যার সমাধান করতে পারব না। তবে ধীরে ধীরে এবং পর্যায়ক্রমে সমাধান করা সম্ভব।"
শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতাদের অংশগ্রহণ
সভায় মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল, টিকে গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী, এসিআই লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আরিফ দৌলা, লাল তীর-এর এমডি মাহবুব আনাম, ওয়ালটন হাইটেক পার্কের এমডি মাহবুব আলম, রানার গ্রুপের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান খান, সায়হাম গ্রুপের চেয়ারম্যান সৈয়দ সাজ্জাদ আহমেদ, ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান, নাবিল গ্রুপের এমডি আমিনুল ইসলামসহ ব্র্যাক, স্কয়ার, আকিজসহ বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া, সভায় জাপানি কোম্পানি মারুবেনি কর্পোরেশন, টয়োটা সুশো কর্পোরেশন, সুমিতোমো কর্পোরেশন, এমইউএফজি ব্যাংক লিমিটেড, মিতসুই অ্যান্ড কোং (এশিয়া প্যাসিফিক) প্রাইভেট লিমিটেড, সোজিৎস এশিয়া প্রাইভেট লিমিটেড, জেট্রো বাংলাদেশ অফিসের প্রতিনিধি ও বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপান দূতাবাসের কর্মকর্তারা অংশ নেন।
সরকারের পক্ষ থেকে সভায় অংশ নেন: অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী; বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির; অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর; প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ; বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী; বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।
