হরমুজে ইরান টোল বসাবে না, তবে আমেরিকা বসাতে পারে: ট্রাম্প
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে কোনো টোল দিতে হবে না, তবে সেই টোল যদি যুক্তরাষ্ট্র নিজে আদায় করে—তবে হিসাব ভিন্ন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার এমনই এক ঘোষণা দিয়েছেন।
শনিবার বিকেলে সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ ট্রাম্প এই বিবৃতি দেন। ট্রাম্প লেখেন, 'যুদ্ধবিরতির ৬০ দিন এবং এই ৬০ দিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও হরমুজ প্রণালিতে কোনো টোল থাকবে না। তবে হ্যাঁ, যদি যুক্তরাষ্ট্র নিজে এই টোল আরোপ করে বা নিজেদের জন্য আদায় করে, তাহলে বিষয়টা আলাদা।'
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর থেকেই তেহরান অত্যন্ত সফলভাবে হরমুজ প্রণালিকে দর-কষাকষির একটি প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে এবং এই কৌশলগত জলপথটি বন্ধ করে দিয়েছে।
তবে গত বুধবার সই হওয়া সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, প্রণালিটি আপাতত ৬০ দিনের জন্য খুলে দেওয়ার কথা। আর এই সময়ের মধ্যে ইরান কোনো জাহাজের কাছ থেকে টোল বা ফি আদায় করতে পারবে না।
কিন্তু শনিবার ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড জানায়, চুক্তির প্রতিশ্রুতির 'স্পষ্ট লঙ্ঘন' হওয়ায় তারা হরমুজ প্রণালি আবারও বন্ধ করে দিয়েছে।
অন্যদিকে, এই অঞ্চলে সামরিক অভিযান তদারককারী মার্কিন সংস্থা সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে, প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল এখনো অব্যাহত রয়েছে।
উল্লেখ্য, এই সমঝোতা স্মারকটি কোনো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ছিল না। এটি মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনার একটি সূচনা মাত্র।
এই স্মারকে বেশ কয়েকটি অমীমাংসিত বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ৬০ দিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রণালিতে কোনো টোল আদায় করা যাবে কি না, সে বিষয়ে স্মারকে কিছুই বলা হয়নি।
যুদ্ধ শুরুর আগে এই প্রণালি দিয়ে পারাপারের জন্য কোনো মাশুল দিতে হতো না। এমনকি দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প নিজেও বলেছিলেন, এই জলপথটি 'চিরকালের জন্য টোলমুক্ত' থাকা উচিত।
মধ্যপ্রাচ্যের 'অভিভাবক' যুক্তরাষ্ট্র?
কিন্তু শনিবারের পোস্টে ট্রাম্প পুরনো সুর পাল্টে ফেলেন। তিনি আবারও এই সম্ভাবনা উসকে দেন যে ইরানকে বাধা দিলেও যুক্তরাষ্ট্র নিজে এই প্রণালিতে টোল আদায় করতে পারে।
ট্রাম্প লেখেন, কোনো ফি ধার্য করা উচিত নয়, 'তবে যদি চুক্তিটি সম্পন্ন না হয়, সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এই ফি আরোপ করতে পারে।'
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, এই ধরনের চার্জ যুক্তরাষ্ট্রকে 'মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর পাহারাদার বা অভিভাবক (গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল) হিসেবে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সেবার খরচ পুষিয়ে নিতে' সাহায্য করবে।
চলতি সপ্তাহে নিউইয়র্ক টাইমসের সাক্ষাৎকারেও ট্রাম্প একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করেছিলেন। সেখানে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের মোট আয়ের ২০ শতাংশের বিনিময়ে এই অঞ্চলের 'অভিভাবক' হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
শনিবারের এই পোস্ট ট্রাম্পের জন্য নতুন কিছু নয়। এর আগেও তিনি প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের টোল বসানোর কথা বলেছিলেন।
যেমন, গত এপ্রিলে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেছিলেন, 'আমরা যদি টোল বসাই, তাহলে কেমন হয়? তাদের (ইরানকে) এই সুবিধা দেওয়ার চেয়ে আমি নিজেই এটা করতে চাই। কেন করব না? আমরাই বিজয়ী। আমরাই জিতেছি।'
তবে ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা এ অঞ্চলের দেশগুলোর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে কি না, এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। যুদ্ধের সময় এই দেশগুলোর অনেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় পক্ষের সঙ্গেই অত্যন্ত সতর্কভাবে ভারসাম্য বজায় রেখে চলছে।
ইরানের সার্বভৌমত্বের দাবি
অন্যদিকে ইরানি কর্মকর্তারা বারবার বলেছেন যে, তারা প্রণালিতে টোল আরোপের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না। তারা এই ইস্যুকে নিজেদের সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক দর-কষাকষির বিষয় হিসেবেই দেখছেন। উল্লেখ্য, এই প্রণালিটি ইরান ও ওমানের মধ্যে অবস্থিত।
আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কিন্তু লেবাননে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের কারণে এই আলোচনা হুমকির মুখে পড়েছে। কারণ এই অভিযান বুধবারের যুদ্ধবিরতি চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করা হচ্ছে।
ইরান দাবি করেছে, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েল নতুন করে হামলা চালিয়েছে এবং এতে ডজন ডজন মানুষ নিহত হয়েছেন। এর প্রতিবাদেই শনিবার হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
ইরানি কর্মকর্তারা আরও বলেছেন, আগামী আলোচনায় প্রাথমিক সমঝোতা স্মারকের সঠিক বাস্তবায়নের ওপরই বেশি জোর দেওয়া উচিত। এটি মীমাংসা হওয়ার পরই বুধবারের চুক্তিতে বলা ৬০ দিনের আলোচনার সময় শুরু হবে।
সুইজারল্যান্ডে আলোচনা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনায় অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান জানিয়েছে, রোববার সুইজারল্যান্ডে ফলোআপ বা পরবর্তী আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে।
সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র দপ্তর নিশ্চিত করেছে যে পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির নেতৃত্বে ইরানের একটি প্রতিনিধিদল ইতিমধ্যে আলোচনার জন্য পৌঁছেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই আলোচনায় অংশ নেবেন।
