ট্রাম্পের ইরান চুক্তিতে ক্ষোভে ফুঁসছেন নেতানিয়াহু; চটেছেন মিত্ররাও, করছেন ব্যক্তিগত আক্রমণ
বুধবার যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি সই করেন ও সেটি প্রকাশ করেন, তখন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নীরব ছিলেন। তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা চুক্তি সইকে কৌশলগত ও রাজনৈতিকভাবে বড় ধরনের বিপর্যয় হিসেবে দেখছেন।
এই চুক্তি ঘিরে নেতানিয়াহু নিজ দেশে ইরান নীতিতে 'পূর্ণ বিজয়'-এর যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা কার্যত পূরণ হয়নি। চার মাস পর আসন্ন নির্বাচনের আগে তিনি এখন ট্রাম্পের করা 'মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং'-এর মুখোমুখি। তিনি নিজেও চুক্তি নিয়ে একাধিক সমালোচনামূলক মন্তব্য করেছেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নেতানিয়াহু অনেকটা একা হয়ে পড়েছেন। তিনি মনে করেন এই চুক্তিটি 'ভুল' এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। এমনকি উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যেও সবচেয়ে কড়া অবস্থান নেওয়া সংযুক্ত আরব আমিরাতও এখন আঞ্চলিকভাবে চুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
ওয়াশিংটনে নেতানিয়াহুর মিত্র হিসেবে পরিচিত রিপাবলিকান পার্টির অনেক নেতাই এবং বিভিন্ন মিডিয়া ব্যক্তিত্বও ট্রাম্পের স্বাক্ষরিত এই চুক্তির প্রকাশ্য বিরোধিতা করতে অনিচ্ছুক। ফলে ২০১৫ সালের মতো যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসে গিয়ে সরাসরি বিরোধিতা গড়ে তোলার সুযোগও এবার তার নেই।
পর্দার পেছনে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলোচনায় চুক্তি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। একই সময়ে নেতানিয়াহু-ঘনিষ্ঠ কিছু গণমাধ্যম (যারা আগে ট্রাম্পের প্রতি দৃঢ় সমর্থন জানাত) ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের সমালোচনা শুরু করেছে।
ওয়ান প্রাইম টাইম টিভি চ্যানেলের একজন উপস্থাপক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে অপমানজনক ভাষায় আক্রমণ করেন এবং ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনারের বিরুদ্ধে ইসরায়েলকে 'বিক্রি করে দেওয়ার' অভিযোগ তোলেন।
জি-৭ সম্মেলনে ট্রাম্প নেতানিয়াহুর সঙ্গে সম্পর্ককে 'অসাধারণ অংশীদারত্ব' হিসেবে উল্লেখ করলেও তাকে নিয়ে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি। তিনি বলেন, 'বিবি ভালো মানুষ। কিন্তু মাঝে মাঝে খুব বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়েন। আমরা বড় অংশীদার, তিনি ছোট অংশীদার।'
এর আগে অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, লেবাননে এক হামলার ঘটনায় নেতানিয়াহুর 'বিচক্ষণতার অভাব' দেখা গেছে, যা চুক্তি প্রায় ভেস্তে দিতে বসেছিল।
চুক্তি ঘোষণার সময় নেতানিয়াহু অপ্রস্তুত ছিলেন বলে জানা গেছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা মঙ্গলবার পর্যন্ত দাবি করছিলেন, চুক্তির খসড়া তাদের দেখানো হয়নি। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা পরে জানান, ইসরায়েলকে নিয়মিতভাবে বিস্তারিত ব্রিফিং দেওয়া হয়েছে এবং হোয়াইট হাউসের দাবি অনুযায়ী চূড়ান্ত নথিও তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
ওয়াশিংটন বলছে, নেতানিয়াহু ব্যক্তিগতভাবে কিছু উদ্বেগ প্রকাশ করলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান যদি তাদের দেওয়া পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিতের বিষয়টি বাস্তবায়ন করে, তবে এটি একটি 'বড় সাফল্য' হতে পারে।
চুক্তির সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশগুলোর একটি হলো লেবানন ইস্যু। নথি অনুযায়ী, ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধবিরতিও এই সমঝোতার অন্তর্ভুক্ত এবং চূড়ান্ত চুক্তি হলে ইসরায়েলকে লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে।
তবে নেতানিয়াহুর এক উপদেষ্টা বলেছেন, ইসরায়েল এই অংশকে বাধ্যতামূলক হিসেবে মনে করে না। তার মতে, হিজবুল্লাহ নিরস্ত্র না হলে দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না ইসরায়েল।
ট্রাম্প নিজেও বলেছেন, 'লেবানন নিয়ে আমাদের একটু মতবিরোধ আছে।'
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, এটি একতরফা যুদ্ধবিরতি নয় এবং হিজবুল্লাহ হামলা চালালে ইসরায়েল পাল্টা জবাব দিতে পারবে। একই সঙ্গে আশা করা হচ্ছে, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতার অগ্রগতি হবে। এর ফলে সেনা প্রত্যাহার চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
তবে ট্রাম্প আবারও লেবাননে ইসরায়েলের কৌশল নিয়ে সমালোচনা করে বলেন, কোনো লক্ষ্য খুঁজতে গিয়ে বারবার আবাসিক ভবন ধ্বংস করা গ্রহণযোগ্য নয়।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এমন একজন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকেই ইসরায়েল এখন সবচেয়ে কঠোর কূটনৈতিক চাপ ও সমালোচনার মুখে পড়েছে, যার সঙ্গে দেশটির দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।
