মার্কিন সহায়তার পরও হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন বেড়েছে সামান্যই
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি খোলা রাখতে যুক্তরাষ্ট্র যখন নতুন করে আলোচনার চেষ্টা চালাচ্ছে, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে জাহাজ ও তেল পরিবহনে মার্কিন সামরিক বাহিনী সহায়তা দিচ্ছে।
তবে ওয়াশিংটন এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে তৎপরতা বাড়ালেও, বাস্তবে জাহাজ চলাচলের চিত্রে বড় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। স্বাধীন ট্যাংকার-ট্র্যাকিং সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক জাহাজ চলাচলের সংখ্যা অনেক কম। এমনকি তেল পরিবহনের পরিমাণও যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
চলতি সপ্তাহে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত চরম আকার ধারণ করলেও, পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছে বলে আভাস পাওয়া গেছে। এই চুক্তি সফল হলে হরমুজ প্রণালি যেমন পুরোপুরি উন্মুক্ত হবে, তেমনি ইরানের ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধেরও অবসান ঘটতে পারে।
শুক্রবার (১২ জুন) ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।'
আরাগচি জানান, সব বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা হলেও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তেহরানের হাতেই থাকবে।
এমনকি এই জলপথ ব্যবহারের জন্য জাহাজগুলোর কাছ থেকে ভবিষ্যতে সার্ভিস ফি আদায়ের পরিকল্পনা করছে ইরান—যা ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই বিরোধিতা করে আসছে।
যুদ্ধের শুরু থেকেই ইরান বিভিন্ন হুমকি ও হামলার ভয় দেখিয়ে জাহাজ পরিচালনাকারীদের এই পথে তেল ও গ্যাস পরিবহনে নিরুৎসাহিত করে আসছে। জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ হ্রাস পেয়েছে, যার ফলে গ্যাসোলিন ও ডিজেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যতক্ষণ পর্যন্ত ইরান জাহাজ চলাচল সীমিত রেখে জ্বালানির দাম চড়া রাখতে পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এটিকে দর-কষাকষির শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে।
বিশ্বজুড়ে জ্বালানির মজুদ কমতে থাকায় ইরানের এই অবস্থান আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
মে মাসের শুরুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জাহাজগুলোকে সহায়তার জন্য 'প্রজেক্ট ফ্রিডম' নামে একটি সামরিক অভিযান শুরু করেছিলেন। তবে সৌদি আরবের আপত্তির মুখে তা দ্রুত বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে মার্কিন সেন্টার কমান্ড জাহাজগুলোকে দিকনির্দেশনা দিলেও সরাসরি কোনো নৌ-এসকর্ট দিচ্ছে না।
এর আগে গত বুধবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ২০০-র বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ মার্কিন সহায়তায় নিরাপদে হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে।
তিনি বলেন, 'এই বিপুল সাফল্য অর্জিত হয়েছে কারণ হরমুজ প্রণালি এখন ইরান নয়, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করছে।'
একজন উর্ধ্বতন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা এই সংখ্যার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, গত পাঁচ সপ্তাহে এই জাহাজগুলো চলাচল করেছে। তবে হিসাব করলে দেখা যায়, মার্কিন সহায়তায় দিনে গড়ে মাত্র ছয়টি জাহাজ যাতায়াত করছে। অথচ যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি জাহাজ এই পথ দিয়ে চলাচল করত।
অবশ্য ট্রাম্পের এই দাবি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রায় অসম্ভব, কারণ মার্কিন সহায়তায় চলার সময় জাহাজগুলো তাদের ট্র্যাকিং ডিভাইস বা জিপিএস বন্ধ রাখছে।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, মার্কিন তৎপরতার ফলে ১০ কোটি ব্যারেলের বেশি তেল এই প্রণালি দিয়ে পার হয়েছে। যদিও হোয়াইট হাউস থেকে এর কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি।
যদি সামরিক কর্মকর্তার দেওয়া পাঁচ সপ্তাহের হিসাবকে ভিত্তি ধরা হয়, তবে দৈনিক তেল পরিবহনের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল। অথচ শিপ ট্র্যাকিং কোম্পানি 'কপলার'-এর তথ্যমতে, যুদ্ধের আগে এই পথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হতো।
এদিকে, গত সোমবার হরমুজ প্রণালিতে একটি মার্কিন সামরিক হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, হেলিকপ্টারটি নিয়মিত টহলে ছিল, তবে এই ঘটনা জাহাজ চলাচলে মার্কিন বাহিনীর ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে।
ডিফেন্স প্রায়োরিটিস-এর পরিচালক রোজমেরি কেলানিক এই পরিস্থিতিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, 'যে সামান্য পরিমাণ তেল পরিবাহিত হচ্ছে, তার জন্য মার্কিন বাহিনী এত বড় ঝুঁকি নেবে কি না তা ভাবার বিষয়।'
অন্যদিকে, ইরান এই জলপথের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা শর্ত দিয়েছে যে, এই প্রণালি পার হতে হলে জাহাজগুলোকে তেহরানের অনুমতি নিতে হবে। অনেক জাহাজ মালিক পারস্য উপসাগর থেকে নিরাপদে বের হওয়ার জন্য এই শর্ত মেনে ইরানের উপকূল ঘেঁষে চলাচল করছেন।
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব কমাতে গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি জাহাজের ওপর নৌ-অবরোধ আরোপ করে। এতে ইরানের তেল রপ্তানি কমলেও বিশ্ববাজারে তেলের সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
রোজমেরি কেলানিক বলেন, 'ইরানকে অবরুদ্ধ করে তাদের তেল বাজারে আসতে না দিলে তা পুরো বিশ্ববাজারকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে।'
এই অবরোধ কার্যকর করতে গিয়ে চলতি সপ্তাহে মার্কিন বাহিনী একটি ট্যাঙ্কারে হামলা চালায়। ভারতের নৌপরিবহন মন্ত্রী জানিয়েছেন, ওই হামলায় তিন ভারতীয় নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেন, 'নাবিকরা বারবার নির্দেশ অমান্য করায় সতর্কতামূলক গুলি চালানোর পর ট্যাঙ্কারটি অচল করে দেওয়া হয়।'
