বাজেট ২০২৬-২৭: অর্থবছর ২০৩০-৩১ নাগাদ করমুক্ত আয়ের সীমা বেড়ে হতে পারে সাড়ে ৪ লাখ টাকা
আসন্ন জাতীয় বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির আয়করের সীমার ক্ষেত্রে একটি পাঁচ বছর মেয়াদি রোডম্যাপ উন্মোচন করতে পারে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সূত্র অনুযায়ী, এই পরিকল্পনার আওতায় আগামী ২০৩০-৩১ অর্থবছর নাগাদ করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়িয়ে সাড়ে ৪ লাখ টাকা করা হতে পারে।
প্রস্তাবিত এই বাজেট পাস হলে করদাতারা তাদের ভবিষ্যৎ কর বাধ্যবাধকতা বা দায় সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা পাবেন, যা দেশের কর ব্যবস্থাকে আরও বেশি অনুমানযোগ্য বা স্থিতিশীল করার দিকে একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত হবে।
অবশ্য কর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির যে প্রভাব, তার প্রতিফলন প্রস্তাবিত এই নতুন করসীমায় হয়তো পর্যাপ্তভাবে ফুটে ওঠেনি।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের বাজেটে ঘোষিত কাঠামোর সাথে মিল রেখে আগামী ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছরের জন্য বর্তমানে বিদ্যমান ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার করমুক্ত আয়ের সীমা অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
এরপর ২০২৮-২৯ এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছরের জন্য এই সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হতে পারে। পরবর্তীতে ২০৩০-৩১ অর্থবছরে তা আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় পৌঁছাতে পারে। এর মাধ্যমে মূলত আগামী পাঁচ বছরের জন্য ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হবে।
পূর্বানুমানযোগ্যতাকে স্বাগত জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা
কর বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগকে ব্যাপকভাবে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, এটি কর ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা দূর করবে এবং করদাতাদের আগে থেকেই পরিকল্পনা করতে সাহায্য করবে। এনবিআরের আয়কর অনুবিভাগের সাবেক সদস্য ডক্টর সৈয়দ মো. আমিনুল করিম বলেন, বেশ কয়েক বছর আগের থেকেই করমুক্ত আয়ের সীমা ঘোষণা করা হবে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।
টিবিএসকে তিনি বলেন, "পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য ট্যাক্স ফ্রি ইনকাম লিমিট ঘোষণা করা হলে তা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হবে। করদাতাদের মধ্যে প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হবে।" তবে তিনি যোগ করেন যে, মূল্যস্ফীতির গতির তুলনায় প্রস্তাবিত এই সীমা হয়তো যথেষ্ট নাও হতে পারে।
"যে হারে ইনফ্লেশন বাড়ছে, সে তুলনায় প্রস্তাবিত করমুক্ত আয় সীমা হয়তো যথেষ্ট নয়। তবে রেভিনিউ (রাজস্ব) যাতে অক্ষুন্ন থাকে, সরকারকে সেটিও ভাবতে হয়," বলেন তিনি।
আয়কর বিশেষজ্ঞ এবং এসএমএসি অ্যাডভাইজরি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়াও এই প্রস্তাবকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য না করে অনেক দূরের ভবিষ্যৎ করসীমা নির্ধারণ করার বিষয়ে তিনি সতর্ক করেছেন।
তিনি বলেন, "ভবিষ্যৎ করের হার পরিকল্পনা করতে সাহায্য করলেও, আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা অনুযায়ী সাধারণত এই সময়সীমা দুই বা তিন বছরের মধ্যে সীমিত রাখা হয়। এর সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মূল্যস্ফীতিকে সমন্বয় করা হয়।"
"২০৩১ সাল পর্যন্ত করের ধাপগুলো লক বা অপরিবর্তিত করে রাখলে— মূল্যবৃদ্ধির কারণে নাগরিকেরা উচ্চতর করের ধাপে চলে যেতে পারেন, যা তাদের প্রকৃত সম্পদ না বাড়িয়েও উল্টো ব্যয়যোগ্য আয় (ডিসপোজেবল ইনকাম) কমিয়ে দেবে। তদুপরি, অন্যান্য স্ল্যাব বা ধাপগুলো অপরিবর্তিত রেখে কেবল করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ালে–- তা মধ্যম আয়ের করদাতাদের ওপর একটি অন্যায় বা বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দিতে পারে।"
তিনি আরও যোগ করেন যে, বৈশ্বিক চর্চার সাথে সংগতি রেখে দীর্ঘমেয়াদি করের নিশ্চয়তা দেওয়ার পাশাপাশি সমস্ত আয়ের ধাপ বা ব্র্যাকেটের সাথে মূল্যস্ফীতি-সংশ্লিষ্ট সমন্বয় থাকা উচিত।
চলছে বাজেট আলোচনা
রাজস্ব কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান গতকাল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে দ্বিতীয় দফায় বাজেট নিয়ে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া নির্দেশনার পর বেশ কয়েকটি প্রস্তাবিত পদক্ষেপে সংশোধন আনা হয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত বাজেটে ঘোষণা করেছিল যে, করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হবে। এই পরিবর্তনটি ২০২৬-২৭ করবর্ষ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা এবং এটি চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আয়ের ওপর প্রযোজ্য হবে।
বিদ্যমান কর কাঠামো অনুযায়ী, ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার করমুক্ত সীমা পরবর্তী তিন লাখ টাকার আয়ের উপর ১০ শতাংশ কর রয়েছে। পরবর্তী ৪ লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ, এর পরের ৫ লাখ টাকার ওপর ২০ শতাংশ এবং পরবর্তী ২০ লাখ টাকার ওপর ২৫ শতাংশ কর ধার্য করা হয়। অবশিষ্ট যেকোনো আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে।
এছাড়া জ্যেষ্ঠ নাগরিক, নারী, ও মুক্তিযোদ্ধা করদাতাদের জন্য কিছুটা ছাড় রয়েছে।
