এলডিসি উত্তরণ: ‘সম পর্যায়ের’ বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ার তাগিদ ইইউ রাষ্ট্রদূতের
বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের মাইলফলকের দিকে এগোচ্ছে বলে নিজেদের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অংশীদার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে বাংলাদেশের আরও 'সম পর্যায়ের' বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়া উচিত বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার।
তিনি বলেন, 'এই কারণেই বাংলাদেশের সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) প্রস্তাবটি আমরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করছি।' তিনি আরও বলেন, উত্তরণের সময়সীমা যা-ই হোক না কেন, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং পরিবেশবান্ধব ও চক্রাকার অর্থনীতি বা সার্কুলার ইকোনমি গড়ে তুলতে বাংলাদেশের এখন থেকেই পরিকল্পনা করা উচিত।
বুধবার (২৯ মে) ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বিজিএমইএ-র যৌথ আয়োজনে একটি সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারের বিষয় ছিল বাংলাদেশের টেক্সটাইল বা বস্ত্রশিল্পে চক্রাকার অর্থনীতির গতি বাড়ানো।
মিলার বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের আগে হাতে থাকা সময়টুকু কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বাণিজ্যের বাধা ও বৈষম্যগুলো দূর করতে হবে, যাতে ইইউ বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার সুনিশ্চিত হয়।
তিনি সার্কুলার ইকোনমিকে ইইউর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি বলে উল্লেখ করেন। ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নামানোর লক্ষ্যের কথা জানিয়ে মিলার বলেন, 'ইউরোপ এখন ব্যবহার করে ফেলে দেওয়ার পুরোনো মডেল থেকে বেরিয়ে এসে পুনর্ব্যবহার এবং টেকসই ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে।' তাঁর মতে, জিনিসপত্র রিসাইকেল বা পুনর্ব্যবহার এবং সম্পদের সঠিক ব্যবহার পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি উৎপাদন খরচও অনেক কমিয়ে দেয়।
টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের উদাহরণ টেনে মিলার বলেন, আকার এবং বিপুল বর্জ্য সৃষ্টির কারণে এই খাতটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর ইউরোপে প্রায় ৫০ লাখ টন এবং বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ টন বস্ত্র বর্জ্য তৈরি হয়। পরিবেশের ওপর এই বিরূপ প্রভাব এবং শ্রমিকদের জীবনমান নিয়ে উদ্বেগের কারণেই ইইউ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে।
তিনি জানান, ২০২২ সালের ইইউ-এর নীতিমালায় পরিবেশবান্ধব পণ্যের ডিজাইন, উৎপাদকের জবাবদিহিতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল প্রডাক্ট পাসপোর্ট বাধ্যতামূলক করা এবং 'গ্রিনওয়াশিং' বা মিথ্যা পরিবেশবান্ধব দাবির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, 'ইউরোপ যেহেতু বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সবচেয়ে বড় বাজার, তাই এই নীতিগুলো বাংলাদেশের জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।' তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের জিডিপিতে প্রায় ১১ শতাংশ অবদান রাখে এবং ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে বলেও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন।
মিলার জানান, বাংলাদেশ যেন এই পরিবর্তনে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, সেজন্য ইইউ এবং ফিনল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে 'সুইচ টু সার্কুলার ইকোনমি (SWITCH2CE)' প্রকল্পের আওতায় সাহায্য করছে।
এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে বিখ্যাত ব্র্যান্ড এইচঅ্যান্ডএম (H&M) এবং বেস্টসেলার বস্ত্র বর্জ্য রিসাইকেল করার পাইলট প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছে। পাশাপাশি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বিজিএমইএ-কে নীতি প্রণয়নে সাহায্য করছে ইউনিডো (UNIDO) ও চ্যাথাম হাউস।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে চক্রাকার অর্থনীতির বিকাশে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি) ব্র্যাক ব্যাংকের সঙ্গে এরই মধ্যে ৬০ মিলিয়ন ইউরোর একটি ঋণ চুক্তিও করেছে। এর বাইরে 'সুইচ-এশিয়া'র মতো কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকেও টেকসই উৎপাদনের নীতি তৈরিতে সাহায্য করা হচ্ছে।
মিলার বলেন, 'চক্রাকার অর্থনীতির জন্য পরিবেশবান্ধব জ্বালানি অত্যন্ত জরুরি, তাই আমরা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতকে সবুজায়নে বিনিয়োগ করছি।' সাশ্রয়ী ঋণ দিয়ে কারখানাগুলোকে টেকসই করতে এবং শ্রমিকদের দক্ষ করে তুলতে ইইউ পাশে থাকবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।
তিনি আবারও জোর দিয়ে বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় যা-ই হোক, ইউরোপীয় ইউনিয়নে নিরবচ্ছিন্ন বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখতে বাংলাদেশের উচিত এখন থেকেই প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি সেরে রাখা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রুটিন দায়িত্ব পালনকারী সচিব মো. আবদুর রহিম খানের সভাপতিত্বে সেমিনারে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির এবং বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানও বক্তব্য রাখেন।
