ইইউ থেকে গাড়ি আমদানির শুল্ক বাড়িয়ে ২৫% করার ঘোষণা ট্রাম্পের
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ঢোকা গাড়ি ও ট্রাকের ওপর আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে একটি চুক্তির অধীনে এই শুল্কের হার ১৫ শতাংশ ঠিক করা হয়েছিল।
ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন যে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ওয়াশিংটনের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্য চুক্তির শর্ত ভেঙেছে। আর এই কারণে আগামী সপ্তাহ থেকেই বর্ধিত এই শুল্ক কার্যকর হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (১ মে) ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরপরই ইউরোপীয় রাজনীতিক এবং বাণিজ্যিক গোষ্ঠীগুলো এর তীব্র সমালোচনা করেছে। এক ইউরোপীয় অর্থনীতিবিদ ব্রাসেলস এবং জার্মান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন 'অবশেষে মেরুদণ্ড শক্ত করে দাঁড়ায়' এবং আমেরিকার পণ্যের ওপরও পাল্টা শুল্ক আরোপ করে।
ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্টে লেখেন, 'আমাদের মধ্যে হওয়া বাণিজ্য চুক্তিটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন পুরোপুরি মেনে চলছে না। এই বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে আমি আগামী সপ্তাহে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা গাড়ি ও ট্রাকের ওপর শুল্ক বাড়াচ্ছি।'
তিনি আরও লেখেন, 'তবে এই বিষয়টিও পুরোপুরি সম্মত হয়েছে যে, তারা যদি তাদের গাড়ি ও ট্রাক যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কারখানায় তৈরি করে, তবে তাদের কোনো শুল্কই দিতে হবে না (নো ট্যারিফ)।'
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প দাবি করেন, এই বর্ধিত শুল্ক ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতাদের বাধ্য করবে যেন তারা দ্রুত তাদের কারখানাগুলো যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে আনে।
তিনি বলেন, 'ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আমাদের একটি বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে। তারা সেটি মেনে চলছিল না। তাই আমি গাড়ি এবং ট্রাকের ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশে বাড়িয়ে দিয়েছি। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে শত শত কোটি ডলার আসবে, এবং এটি তাদের বাধ্য করবে আরও দ্রুত তাদের কারখানা সরিয়ে আনতে।'
ব্রাসেলস ও ট্রাম্পের মধ্যে চরম উত্তেজনা
ইউরোপীয় কমিশন খুব দ্রুত ট্রাম্পের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। ব্রাসেলসের দাবি, গত গ্রীষ্মের চুক্তির শর্ত তারা ভাঙেনি। তারা সতর্ক করে বলেছে যে, ওয়াশিংটন চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সব ধরনের ব্যবস্থাই নিতে প্রস্তুত থাকবে।
ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি খোলার জন্য ন্যাটোর দেশগুলো নৌবাহিনী পাঠাতে অস্বীকৃতি জানানোয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ-এর মধ্যে এখন উত্তেজনা চরম পর্যায়ে রয়েছে। ঠিক এমন সময়েই ট্রাম্প এই শুল্ক বৃদ্ধির ঘোষণা দিলেন।
এই সপ্তাহে ট্রাম্প জার্মানি, ইতালি এবং স্পেন থেকে মার্কিন সেনা কমিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। এর আগে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মেরজ মন্তব্য করেছিলেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত অবসানের আলোচনায় ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্র 'অপমানিত' হয়েছে।
শুক্রবার পুরো ইউরোপে ১ মে'র ছুটির মধ্যেই এই খবরটি ছড়িয়ে পড়ে। মজার ব্যাপার হলো, ঠিক একই দিন ইউরোপ দক্ষিণ আমেরিকার সাথে নতুন 'ইইউ-মারকোজুর বাণিজ্য চুক্তি' চালু করেছে। ট্রাম্পের বারবার শুল্ক আরোপ ও অস্থির নীতির পাল্টা জবাব হিসেবে গত এক বছরে ব্রাসেলস এ ধরনের বেশ কয়েকটি বাণিজ্য চুক্তি ত্বরান্বিত করেছে।
বাস্তবায়নে ধীরগতি
ট্রাম্প প্রশাসন গত বছর জাতীয় নিরাপত্তা আইনের অধীনে বিশ্বব্যাপী অটোমোবাইল বা গাড়ি আমদানির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল। তবে গত আগস্টে ইইউ-এর সঙ্গে তাদের আলাদা একটি চুক্তি হয়, যার অধীনে পূর্বের শুল্কসহ এই কর কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়।
বিনিময়ে ইইউ রাজি হয়েছিল যে, তারা গাড়ি-সহ যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদিত শিল্পপণ্যের ওপর থেকে শুল্ক তুলে নেবে এবং মার্কিন গাড়ির নিরাপত্তা ও নিঃসরণ মান গ্রহণ করবে। চুক্তিতে খুশি না হলেও ইইউ নেতারা তখন বলেছিলেন, এই চুক্তির ফলে ইউরোপের কোম্পানিগুলো ভবিষ্যতে আর কোনো নতুন শুল্ক বাড়ার ঝুঁকি থেকে বেঁচে যাবে।
তবে চুক্তির বাস্তবায়নে ইইউ বেশ ধীরগতি দেখিয়েছে। ইউরোপীয় সংসদ গত মার্চে শুল্ক কমানোর বিল কিছুটা এগিয়ে নিলেও, সরকার এবং সংসদকে চূড়ান্ত খসড়া তৈরি করতে হওয়ায় আগামী জুনের আগে এটি পুরোপুরি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা খুবই কম।
ইউরোপীয় সংসদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিষয়ক কমিটির চেয়ারপারসন বার্ন্ড ল্যাঞ্জ রয়টার্সকে বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই সিদ্ধান্তই প্রমাণ করে যে আমেরিকান পক্ষ কতটা অবিশ্বস্ত। আমাদের এখন শুধু সর্বোচ্চ শক্তি আর দৃঢ়তা নিয়েই এর কড়া জবাব দিতে হবে।'
জার্মানির গাড়ি শিল্পের সংগঠন ভিডিএ-এর প্রধান সতর্ক করে বলেছেন, শুল্ক বাড়লে ইউরোপের গাড়ির খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে।
জার্মান ইকোনমিক ইনস্টিটিউট ডিআইডব্লিউ-এর প্রধান মার্সেল ফ্রাৎজারও এর সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন। তিনি বলেন, 'জার্মান সরকার এবং ইউরোপীয় কমিশনকে এবার শক্ত অবস্থান নিতে হবে এবং ট্রাম্পকে রুখে দিতে হবে।' পাল্টা জবাব হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর শুল্ক এবং তাদের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর ট্যাক্স বসানোর প্রস্তাব দেন তিনি।
ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তার কাছে এই শুল্ক বৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন: 'গত আট মাসেও ইইউ এই গাড়ির চুক্তিটি মেনে চলেনি।'
গাড়িনির্মাতাদের শেয়ারের পতন
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তার শীর্ষ বাণিজ্য উপদেষ্টা কেলি অ্যান শ' বলেন, গত গ্রীষ্মে হওয়া চুক্তির বাস্তবায়নে ইইউ যেভাবে ধীরগতি দেখিয়েছে, তাতে এই পরিণতি তো হওয়ারই ছিল।
তিনি বলেন, 'আগস্ট মাস থেকেই আমেরিকা চুক্তির সবকিছু অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। অথচ প্রায় এক বছর হয়ে চলল, কিন্তু ইইউ এখনো আমেরিকার পণ্যের ওপর থেকে একটা কানাকড়ি শুল্কও কমায়নি।'
তবে তিনি এটাও বলেন যে, ইইউ এখনো চুক্তির শর্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করে আমেরিকার বর্ধিত এই শুল্ক এড়াতে পারে।
ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরপরই নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে ফোর্ড মোটর এবং স্টেলান্টিসের মতো গাড়ি নির্মাতাদের শেয়ারের দাম বড় অংকে কমে গেছে। জেনারেল মোটরস (জিএম)-এর শেয়ারও ১.৫ শতাংশ কমেছে।
ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতারা এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্রে বড় আকারে ব্যবসা করছে। গত মার্চেই মার্সিডিজ-বেঞ্জ ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা ২০৩০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালাবামা অঙ্গরাজ্যের একটি কারখানায় প্রায় ৪০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে।
ফেব্রুয়ারিতে তারা জানিয়েছিল, শুল্ক বাড়ার কারণে তাদের কোম্পানির পরিচালন মুনাফা বা মূল ব্যবসায়ের লাভ অর্ধেকের বেশি কমে গেছে, যা অর্থের অঙ্কে প্রায় ৫.৮ বিলিয়ন ইউরো।
মার্কিন বাণিজ্য দপ্তরের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা রায়ান মেজেরাস বলেন, 'ইউরোপীয় ইউনিয়নে এটি একেবারেই ভালো চোখে দেখা হবে না। কিন্তু আমার মনে হয় না ট্রাম্প প্রশাসনের এতে কোনো মাথাব্যথা আছে, কারণ তারা এমনিতে ইইউ-এর প্রতি যথেষ্ট বৈরী মনোভাব নিয়ে চলে।'
