আর জি কর থেকে ‘সিন্ডিকেট’: পশ্চিমবঙ্গে মমতার ভরাডুবির নেপথ্যে ৫ কারণ
পশ্চিমবঙ্গে টানা ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন এক বিশাল পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে। তিন দশকের বেশি সময় ধরে চলা বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০১১ সালে যেভাবে তিনি 'পরিবর্তন' এনেছিলেন, ২০২৬ সালে এসে ঠিক একইভাবে তার শাসনেরও পতন ঘটছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
২০১১ সালের সেই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। সে সময় বামপন্থীরা যেভাবে জনমানসের অসন্তোষ বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল, এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ঠিক একই পথে হেঁটেছেন। বিরোধীদের জনসমর্থন বৃদ্ধির বিষয়টি খাটো করে দেখার ফল হিসেবে রাজ্যজুড়ে তৃণমূলের এক বিশাল ভরাডুবি পরিলক্ষিত হচ্ছে।
মজার বিষয় হলো, এই পরিবর্তন রাতারাতি হয়নি। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও মমতার দল ৪২টি আসনের মধ্যে ২৯টি জিতে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছিল, যেখানে বিজেপি ১৮ থেকে ১২-তে নেমে গিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী ২৩ মাসে কিছু সুনির্দিষ্ট ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের মন ঘুরিয়ে দিয়েছে, যা মমতা সরকারের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বিপর্যয়ের পেছনে পাঁচটি প্রধান কারণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. আর জি কর হাসপাতালের ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড
২০২৪ সালের আগস্টে কলকাতার সরকারি আর জি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে এক নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা তৃণমূলের জনপ্রিয়তায় প্রথম বড় ধাক্কা দেয়। এই ঘটনা কেবল পশ্চিমবঙ্গে নয়, পুরো ভারতে প্রতিবাদের ঝড় তোলে। হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসে। মমতা সরকার শুরুতে এই ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে এবং এটিকে বিরোধী দলের 'রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র' হিসেবে আখ্যা দেয়। পরে মুখ্যমন্ত্রী নিজে বিচারের দাবিতে র্যালি করলেও ততোক্ষণে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে গেছে। হাসপাতালের প্রশাসনের সঙ্গে সরকারের যোগসাজশ এবং তথ্য-প্রমাণ লোপাটের অভিযোগ ভোটারদের মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দেয়।
২. শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারিতে সুপ্রিম কোর্টের রায়
আর জি কর কাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই ২০২৫ সালের এপ্রিলে সুপ্রিম কোর্ট বড় এক ধাক্কা দেয়। স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিযুক্ত ২৫ হাজারেরও বেশি শিক্ষকের নিয়োগ বাতিল করে কলকাতা হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রাখে শীর্ষ আদালত। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল—পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াটি ছিল 'দুষিত ও কলুষিত'। এই রায়ের ফলে মমতার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া কোটি কোটি টাকার সেই দৃশ্য আবারও মানুষের সামনে চলে আসে। মমতা বরখাস্ত শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও দুর্নীতির কলঙ্ক আর মোচন হয়নি।
৩. সুশাসনের অভাব ও 'সিন্ডিকেট' সংস্কৃতি
রাজ্যে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থতা তৃণমূলের বিরুদ্ধে জনরোষের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিরোধীরা সাফল্যের সঙ্গেই ভোটারদের সামনে তুলে ধরেছে যে, কীভাবে অবকাঠামো চুক্তি থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র শিল্প পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে তৃণমূল নেতাদের 'সিন্ডিকেট' রাজত্ব চলছে। বিজেপি নেতাদের অভিযোগ করা 'কাট মানি' বা প্রতিটি কাজে নেতাদের কমিশন নেওয়ার বিষয়টি সাধারণ মানুষের প্রধান আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়।
৪. সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকে ফাটল
মমতার একচ্ছত্র আধিপত্যের অন্যতম স্তম্ভ ছিল সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক। তবে এবারের নির্বাচনে সেখানে বড় ধরনের ফাটল দেখা গেছে। তৃণমূলের সাবেক বিধায়ক হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বাধীন 'আম জনতা উন্নয়ন পার্টি' এবং নওশাদ সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন 'ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ)' বেশ কিছু আসনে জয়ী হয়েছে। এর ফলে তৃণমূলের 'নিশ্চিত ভোটব্যাংক' ভাগ হয়ে যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একসময়ের ঘনিষ্ঠ ও বর্তমান প্রতিদ্বন্দ্বী শুভেন্দু অধিকারীর মতে, হিন্দু ভোটের মেরুকরণ বিজেপির পক্ষে যাওয়ার পাশাপাশি তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক ভেঙে পড়াই মমতার পতনের বড় কারণ।
৫. ২০১১ থেকে শিক্ষা না নেওয়া
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু আজ তিনি সেই বামপন্থীদের করা ভুলগুলোরই পুনরাবৃত্তি করেছেন। বাম আমলে যেমন দল সরকারের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল, মমতার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। রাজ্য শাসনের চেয়ে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ইন্ডিয়া জোটের নেতৃত্ব দেওয়ার প্রচেষ্টায় রাজ্যে সুশাসন অবহেলিত হয়েছে। বিশেষ করে শহর অঞ্চলের ভোটাররা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তৃণমূলের একচেটিয়া আধিপত্য ও 'দমবন্ধ করা' নিয়ন্ত্রণে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
