উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞার পরও চট্টগ্রামে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের কার্যক্রম অব্যাহত
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গর থেকে পণ্য পরিবহনে লাইটার জাহাজ পরিচালনায় ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের (ডব্লিউটিসি) কার্যক্রম পরিচালনা বেআইনি ঘোষণা করে রায় দিয়েছিলেন উচ্চ আদালত। হাইকোর্টের রায়ে ডব্লিউটিসির কার্যক্রম ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত বন্ধ থাকার কথা উল্লেখ থাকলেও এই রায় অমান্য করে গত ৫ মাস ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে ডব্লিউটিসি।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ডব্লিউটিসি সরকার কিংবা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত কোন প্রতিষ্ঠান নয়। সুতরাং কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যারা ডব্লিউটিসি'র সদস্য নয়, তাকে কোনভাবেই ডব্লিউটিসি তাদের কোন বিধি দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার রাখে না। ফলে জাহাজ মালিকরা ডব্লিউটিসির ক্রম বা সিরিয়ালের ভিত্তিতে পণ্য পরিবহন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
২০১৩ সালে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের নিবন্ধিত লাইটার জাহাজ যোগে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর সমূহে পণ্য পরিবহন সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করে ডব্লিউটিসি। এতে বলা হয়েছে, ডব্লিউটিসিতে সিরিয়াল এর লাইটার জাহাজ ব্যতীত অভ্যন্তরীণ রুটে অন্য কোন লাইটার জাহাজ পণ্য পরিবহন করতে পারবে না।
পরবর্তীতে ২০২১ সালের ২৩ আগস্ট নৌপরিবহন অধিদপ্তর, উক্ত ২০১৩ এর নীতিমালার আলোকে একটি সার্কুলার প্রকাশ করে যেখানে সকল লাইটার জাহাজ মালিকদের উপর একটি পূর্বশর্ত দেওয়া হয় যে, তাদের লাইটার ভেসেল ডব্লিউটিসি ক্রম অনুযায়ী পরিচালিত হতে হবে। কোন লাইটার ভেসেল মালিক যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ অবস্থায় নিরুপায় হয়ে বিভিন্ন শিল্প গ্রুপ এবং লাইটার জাহাজের মালিক, উক্ত নীতিমালা এবং সার্কুলারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০২২ সালে হাইকোর্টে রিট পিটিশান দায়ের করেন। ২০২২ সালের ২০ জুন হাইকোটের বিচারপতি জে বি এইচ হাসান এবং ফাতেমা নাজিব একটি সিমিলার রিট পিটিশনে, দুই পক্ষের বক্তব্য শোনার পরে, উল্লিখিত ২০১৩ নীতিমালা ও সার্কুলার অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। ওই রায়ে ডব্লিউটিসির সকল কর্মকাণ্ডের উপর হাইকোর্টের একটি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এই নিষেধাজ্ঞা ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত বহাল থাকবে।
রায়ে বলা হয়, ২০১৩ সালের নীতিমালাটি কোন ডেলিগেটেড লেজিসলেশন বা সংবিধানের ৬৫ বা ৫৫(৪) অনুচ্ছেদ অনুসারে প্রণীত হয়নি আর তাই এটির কোনো কার্যকরী আইনি কর্তৃত্ব নেই।
যেহেতু উল্লিখিত নীতিমালায় আইনের কর্তৃত্ব নেই, তাই ২০২১ সালের ২৩ আগস্টের সার্কুলারটিও ভিত্তিহীন, বলেন আদালত।
হাইকোর্টের রায়ে ডব্লিউটিসির কার্যক্রম ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত বন্ধ থাকার কথা উল্লেখ থাকলেও এখনো সিরিয়াল প্রথা এবং প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চালু আছে। বহির্নোঙ্গরে পণ্য খালাসের জন্য প্রতিদিনই সংগঠনটির সিরিয়াল নিতে হচ্ছে লাইটার জাহাজমালিকদের।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল (ডব্লিওটিসি) সমন্বয় ছাড়া নিজেদের ইচ্ছামত ভাড়া নির্ধারণ করে, এ ব্যাপারে স্টেকহোল্ডারের সাথে কোন পরামর্শও করে না, যা ব্যবসা পরিচালনার খরচ বাড়িয়েছে। এ সব বিষয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর 'লাইটার জাহাজ নিয়ন্ত্রণকারী চক্রের হাতে জিম্মি আমদানিকারকরা' শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক টিবিএসকে বলেন, 'ডব্লিউটিসি নৌ রুটে পণ্য পরিবহন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। তারা বিভিন্ন শিল্প গ্রুপের মালিকানাধীন লাইটার জাহাজ চলাচল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চেয়েছিলো। যেহেতু উচ্চ আদালতের রায় আছে তাই পণ্য পরিবহন সেক্টর যাতে কিছু ব্যবসায়ীদের হাতে জিম্মি না হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে।'
নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর মোঃ নিজামুল হক টিবিএসকে বলেন, 'ডব্লিউটিসির বিষয়ে যেহেতু হাইকোর্টের রায় আছে, আমরা ডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষকে বলেছি রায় অনুসরণ করার জন্য। আমরা হাইকোর্টের রায়ের সাথে একমত। তবে শৃঙ্খলার জন্য লাইটার জাহাজ মালিকরা একটি এসোসিয়েশন করতে পারে।'
ডব্লিউটিসির যুগ্ম সচিব (অপারেশন) আতাউল কবির বলেন, ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রায় ২ হাজার লাইটার জাহাজ ডব্লিউটিসির সিরিয়াল অনুযায়ী চলাচল করছে। তবে শিল্প গ্রুপের মালিকানাধীন লাইটার জাহাজ ডব্লিউটিসির সিরিয়ালভুক্ত নয়। সেগুলো তাদের ব্যবস্থাপনায় চলাচল করে।
নিষেধাজ্ঞা থাকা স্বত্ত্বেও ডব্লিউটিসির কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে ডব্লিউটিসির কনভেনর এবং বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক নুরুল হক টিবিএসকে বলেন, নিষেধাজ্ঞা ডব্লিউটিসির কার্যক্রমের উপর নয়; ২০১৩ এর নীতিমালা এবং কিছু সার্কুলারের উপর ছিল।
বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের তথ্যমতে, আকারভেদে ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন থেকে ৫ হাজার মেট্রিক টন পণ্য বহন করে লাইটার জাহাজ। এর মধ্যে ৫০ শতাংশ জাহাজের ধারণক্ষমতা ২ হাজার মেট্রিক টন, ২০ শতাংশ জাহাজের ৫ হাজার মেট্রিক টন এবং বাকি ৩০ শতাংশ জাহাজের ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্যানুযায়ী, বন্দরে আমদানি হওয়া পণ্যের ৭০ ভাগ পণ্য খালাস হয় বহির্নোঙ্গরে। বাকি ৩০ ভাগ খালাস হয় বন্দরের জেটিতে। বহির্নোঙ্গরে খালাস হওয়া পণ্যগুলো লাইটার জাহাজে করে দেশের বিভিন্ন নৌ রুটে এবং শিল্পকারখানায় পৌঁছে দেওয়া হয়, এসব জাহাজের অধিকাংশই ডব্লিউটিসি নিয়ন্ত্রণ করে। লাইটার জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গর থেকে দেশের ৩৪টি রুটে পণ্য পরিবহন করে।
২০১৩ সালে লাইটার জাহাজের সংকট দেখা দিলে, তখন থেকেই অনেক শিল্পগোষ্ঠী নিজস্ব জাহাজে পণ্য পরিবহন শুরু করে। বর্তমানে বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন এমন ৪০০টি জাহাজ বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনে যুক্ত।
