শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত খুলবে না হরমুজ প্রণালী: স্পষ্ট জানিয়ে দিল ইরান
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জুন মাসে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে ইরান যে ৭টি শর্ত দিয়েছিল, সেগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ। আজ রোববার দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি এ কথা জানান।
সম্প্রতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে ইরান একটি প্রস্তাব পেশ করে—যার অধীনে দেওয়া শর্তগুলো পূরণ হলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত এবং স্বাভাবিক নৌচলাচল পুনর্বহাল করা সম্ভব বলে জানিয়েছিল তেহরান। এরপর গত সপ্তাহে কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এই প্রস্তাবের জবাব দেয় যুক্তরাষ্ট্র। যেখানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রস্তাবটি সরাসরি নাকচ করে দেন।
এমন প্রেক্ষাপটে গালিবাফের এই বক্তব্য এলো। গালিবাফ ইরানের শীর্ষ আলোচক দলেরও নেতা। ইরানি গণমাধ্যমে গালিবাফকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, "ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের অবস্থান সম্পূর্ণ স্পষ্ট ও দৃঢ়। ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) ওপর ভিত্তি করে দেওয়া আমাদের ৭টি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী খোলা হবে না।"
তিনি আরও বলেন, ওয়াশিংটনকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে "(কূটনৈতিক) প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করা এবং একপাক্ষিক দাবি চাপিয়ে দেওয়ার দিন শেষ।"
পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কোনো আলোচনা নয়: ইরান
আজ ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানান, ইরানের প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র যে উত্তর দিয়েছে, তার পাল্টা জবাবে তেহরান মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তাদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে। তবে ওয়াশিংটনকে অবগতির জন্য আরও কিছু বিষয় জানানো বাকি রয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, "আমেরিকানদের দেওয়া প্রস্তাবগুলো কমবেশি তাদের আগের অবস্থানের সাথেই মিলে যায়—বিশেষ করে পরমাণু ইস্যুতে। আমরা তাদের জানিয়েছি, এই মুহূর্তে আমাদের মূল অগ্রাধিকার হরমুজ প্রণালী কেন্দ্রিক এবং এই জলপথে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট পদক্ষেপ প্রয়োজন।"
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে তেহরান জাতিসংঘের আণবিক শক্তি সংস্থাকে তাদের পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে—এমন খবরও তিনি সরাসরি খারিজ করে দেন। বাঘাই জোর দিয়ে বলেন, ওয়াশিংটনের সাথে পরমাণু সংক্রান্ত কোনো আলোচনায় ইরান প্রবেশই করেনি।
আলোচনা সম্পর্কে অবগত এক কর্মকর্তা গত সপ্তাহে জানান, দুই দেশের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া খসড়া নথিতে ৭ দিনের একটি আস্থা-বর্ধন প্রক্রিয়ার (ট্রাস্ট-বিল্ডিং) রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, যার লক্ষ্য হলো দুই পক্ষকে জুনে সম্মত হওয়া সমঝোতা স্মারকের আরও উন্নত সংস্করণে ফিরিয়ে নেওয়া। এর মধ্যে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির বিষয়েও কিছু স্পষ্ট পদক্ষেপের উল্লেখ রয়েছে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, বিরোধ রয়েছে মূলত খসড়া পরিকল্পনার উপাদানের চেয়ে পদক্ষেপগুলোর ধারাবাহিকতা বা বাস্তবায়নের ক্রম নিয়ে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচির কড়া বার্তা
গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই সংঘাত বন্ধ করতে এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করার লক্ষ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে দ্রুত বার্তা আদান-প্রদানে মধ্যস্থতা করে যাচ্ছে কাতার। এর আগে জুন মাসের সেই সমঝোতা স্মারকের ফলে একটি সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতি অর্জিত কার্যকর হয়েছিল। যেখানে হরমুজ প্রণালী সচল করা ও ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সংক্রান্ত বিধানও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এদিকে পৃথক এক অনুষ্ঠানে তেহরানে নিযুক্ত বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকদের উদ্দেশে রোববার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, তেহরান আশা করে ওয়াশিংটন কূটনৈতিক পথ বেছে নেবে; তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি আবারও সামরিক সমাধানের পথ ধরে, তবে তার সমুচিত জবাব দিতে ইরান পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার রয়টার্সকে একাধিক সূত্র জানিয়েছিল, ওয়াশিংটন যদি আবারও বড় আকারের সামরিক হামলা চালায়, তবে ইরান আরও ব্যাপক ও কঠোর পাল্টা হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এনিয়ে আজ আরাঘচি বলেছেন, "তারা যদি আবারও সামরিক সমাধানের দিকে হাঁটে, তবে আমরা আগের চেয়েও বেশি প্রস্তুত এবং আত্মরক্ষায় যা যা করা প্রয়োজন, তা-ই করব।"
অন্যদিকে, একইদিন ইরানের আধা-সরকারি বার্তাসংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া জানান, ইরান তাদের উদ্ভাবিত ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর আঘাত হানার সীমা (রেঞ্জ) আরও বৃদ্ধি করবে।
