লেবাননে বাস্তুচ্যুতদের সহায়তায় হিজবুল্লাহকে ২০০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে ইরান: রয়টার্স
ইসরায়েলের সঙ্গে চলতি বছরের যুদ্ধে বাস্তুচ্যুত লেবানিজদের সহায়তার জন্য ইরান হিজবুল্লাহকে ২০ কোটি ডলার দিয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ স্থানান্তর সম্পর্কে সরাসরি অবগত দুই ব্যক্তি। এটি সত্য হলে, সংঘাতের সবচেয়ে বড় ধাক্কা বহন করা হিজবুল্লাহর সমর্থকদের জন্য সংগঠনটির পক্ষ থেকে এটিই হবে প্রথম বড় ধরনের সহায়তা।
যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট এক বিবৃতিতে বলেন, "এমন কোনো অর্থ নেই"। তিনি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে "ইরান থেকে বিপুল অর্থ আসছে—এমন মিথ্যা গল্প ছড়িয়ে নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষার চেষ্টা" করার অভিযোগ করেন।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, ইরানের হাতে "অর্থ এবং অর্থ স্থানান্তরের উপায়—দুটিই ফুরিয়ে আসছে" এবং তেহরানের কাছে "সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রচারণায় অর্থায়ন করার মতো টাকা নেই"।
তথ্য সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ আরও কঠোর হওয়া এবং তেহরানের লেবানিজ মিত্রের কাছে অর্থ পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান সমস্যার মধ্যেও হিজবুল্লাহ গত মাসে এই অর্থ পেয়েছে।
তারা জানান, যারা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অর্থ স্থানান্তর করেছে, তারা এর জন্য ২০ শতাংশ কমিশন নিয়েছে। হিজবুল্লাহর সঙ্গে লেনদেনের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় এই কমিশন নেওয়া হয়েছে। তাদের একজন বলেন, এই হার স্বাভাবিক কমিশনের তুলনায় চার গুণ বেশি।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে হিজবুল্লাহর এক কর্মকর্তা বলেন, একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তা বিতরণের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হবে। তবে তিনি অর্থের উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলেননি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জেনেভায় ইরানের স্থায়ী মিশন এবং লেবানন সরকার তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।
ইরানের সমর্থনে আঞ্চলিক যুদ্ধে হিজবুল্লাহ ২ মার্চ যোগ দেওয়ার পর ইসরায়েলের লেবাননে বোমাবর্ষণ ও স্থল অভিযান সংগঠনটির শিয়া মুসলিম সমর্থকগোষ্ঠীর কয়েক লাখ মানুষকে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য করেছে।
তবে বাস্তুচ্যুত এসব মানুষ এখন পর্যন্ত হিজবুল্লাহর কাছ থেকে খুব কম অথবা কোনো সহায়তাই পাননি। ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী ১৯৮২ সালে যে সশস্ত্র সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেই হিজবুল্লাহ ২০২৪ সালের পর দুটি যুদ্ধে ইসরায়েলের হামলায় ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সংগঠনটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র পিগট বলেন, হিজবুল্লাহ লেবাননের মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়েছে এবং সংগঠনটি নিজেও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে সংগঠনটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের তেল রপ্তানি অবরোধের কারণে চাপের মধ্যে রয়েছে।
পিগট বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে হিজবুল্লাহর অর্থায়ন ব্যবস্থা আরও কঠোরভাবে চেপে ধরবে এবং একই সঙ্গে লেবাননের বৈধ সরকার যাতে দেশের দক্ষিণাঞ্চল পুনর্গঠন করতে পারে, সে সক্ষমতাকে সমর্থন করবে।"
৫০ হাজার পরিবারকে সহায়তা
তথ্য সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, হিজবুল্লাহ এই অর্থ ব্যবহার করে প্রাথমিকভাবে প্রতি পরিবারকে তিন হাজার ডলার করে দেবে। যেসব পরিবারের গ্রাম ধ্বংস হয়েছে অথবা ইসরায়েলি দখলের কারণে যেসব এলাকায় যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
তাদের একজনের হিসাবে, এমন পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার।
যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান বহু বছর ধরে হিজবুল্লাহকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ১০ মাসে ইরান হিজবুল্লাহকে ১০০ কোটি ডলার দিয়েছে।
তেহরান কখনো হিজবুল্লাহকে অর্থায়নের বিষয়টি স্বীকার করেনি। আঞ্চলিক সহযোগী সংগঠনগুলোকে অর্থ দেওয়ার ইরানি নীতি অতীতে দেশটির ধর্মীয় শাসকদের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভ উসকে দিয়েছে। বর্তমানে ইরানের অর্থনৈতিক দুরবস্থা আরও খারাপ হওয়ায় বিষয়টি এবার আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠতে পারে।
জুনে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি হওয়ার পর ইরানকে তেল বিক্রির সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় রয়টার্স জানিয়েছিল, চুক্তির পর হিজবুল্লাহকে আরও অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ইরান। তবে জুলাই মাসে সেই চুক্তি ভেঙে যায়।
এরপর ওয়াশিংটন ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে। ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করতে নিষেধাজ্ঞা কঠোর করার পাশাপাশি একটি নৌ অবরোধও আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
হিজবুল্লাহর নেতা নাঈম কাসেম গত মাসে এক বক্তব্যে বলেন, যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত হাজার হাজার মানুষকে আবাসন দেওয়ার লক্ষ্যে একটি প্রকল্পে সংগঠনটি শিগগিরই অবদান রাখবে। তিনি বলেন, এ কাজে "উপলব্ধ সম্পদ ও অনুদান" ব্যবহার করা হবে। তবে অর্থের উৎস সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।
স্থানীয় সেবা দেওয়া এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করার সক্ষমতা অতীতে হিজবুল্লাহর প্রতি স্থানীয় মানুষের সমর্থন ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
২০০৬ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের পর হিজবুল্লাহ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের তাৎক্ষণিকভাবে বড় অঙ্কের নগদ অর্থ দিয়েছিল। একই সঙ্গে সংগঠনটি দ্রুত বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরতলি পুনর্গঠনে সহায়তা করেছিল। ওই এলাকা হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
কিন্তু এবার পুনর্গঠনের তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম গত মাসে বলেছেন, ২০২৪ সালের পর সংঘটিত দুটি যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি পুনর্গঠনে মোট ব্যয় ২ হাজার ৭০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ব্যয়বহুল যুদ্ধ
অর্থটি কীভাবে লেবাননে পৌঁছেছে, সে বিষয়ে দুই সূত্র কোনো বিস্তারিত তথ্য দেয়নি।
তাদের একজন বলেন, আগে যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হিজবুল্লাহ অর্থ স্থানান্তর করত, সেগুলোর মাধ্যমে এখন অর্থ সরানো ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। ওই সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরাক ও দুবাইভিত্তিক এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান এখন আর ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তুরস্কেও এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ বাড়ছে।
ওই সূত্র আরও বলেন, হিজবুল্লাহর বিরোধীরা মনে করে, অর্থই বর্তমানে সংগঠনটির "অক্সিজেন"।
অর্থ সংগ্রহে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হলেও হিজবুল্লাহ তার যোদ্ধাদের এবং যুদ্ধে নিহত সদস্যদের পরিবারের সদস্যদের অর্থ দেওয়া বন্ধ করেনি বলে ওই সূত্র জানান।
লেবাননে এই যুদ্ধ শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর বড় ধরনের মূল্য চাপিয়েছে। এই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্য থেকেই হিজবুল্লাহ সবচেয়ে বেশি সমর্থন পায়।
ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননের দখল করা বিস্তীর্ণ এলাকার বিভিন্ন গ্রাম ধ্বংস করে দিয়েছে। ইসরায়েলের দাবি, হিজবুল্লাহর হামলা থেকে দেশটির উত্তরাঞ্চলকে সুরক্ষিত রাখাই এর উদ্দেশ্য।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২ মার্চ থেকে ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে ৪ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে কতজন যোদ্ধা ছিলেন, তা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে উল্লেখ করা হয়নি।
হিজবুল্লাহও যুদ্ধে তাদের কতজন সদস্য নিহত হয়েছেন, সে সংখ্যা প্রকাশ করেনি।
রয়টার্স ৪ মে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, এই যুদ্ধে হিজবুল্লাহর কয়েক হাজার যোদ্ধা নিহত হয়েছেন।
