'আমি কোথায়? আপনারা কে?': দুবার ইনজেকশন দিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ‘ক্ষুব্ধ ও বিভ্রান্ত’ ক্রিস্টা পাইক
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত খুনি ক্রিস্টা পাইকের একজন আইনজীবী জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থ প্রচেষ্টা থেকে বেঁচে যাওয়ার পর হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার সময় পাইক ছিলেন 'রাগান্বিত ও বিভ্রান্ত'।
তার আইনজীবী র্যান্ডি স্পাইভি এক সংবাদ সম্মেলনে স্মরণ করে বলেন, জ্ঞান ফেরার পর তার প্রথম কথাগুলো ছিল, 'আমি কোথায়?' এবং 'আপনি কে?'
১৯৯৫ সালে তৎকালীন প্রেমিকের সঙ্গে কলিন স্লেমারকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া পাইক গত ৩০ সেপ্টেম্বর টেনেসিতে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দুটি প্রচেষ্টা থেকে বেঁচে যান।
বিশেষজ্ঞ ও তার আইনজীবী দল বলছে, এভাবে তার সুস্থ হয়ে ওঠার ঘটনা নজিরবিহীন এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারীদের দেওয়া প্রাণঘাতী ইনজেকশন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আর কোনো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি বেঁচে গেছেন বলে জানা যায়নি।
বুধবার একটি আদালত ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সঙ্গে সম্পর্কিত সব প্রমাণ সংরক্ষণের জন্য টেনেসি অঙ্গরাজ্যকে নির্দেশ দিয়েছেন।
পাইক, যার বয়স ৫০ বছর, এখনো হাসপাতালে গুরুতর চিকিৎসা নিচ্ছেন। বুধবার শুনানির পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তার আইনজীবীরা জানান, হাসপাতালের বিছানায় তার হাত ও পা বেঁধে রাখা হয়েছে।
স্পাইভি বলেন, কয়েক দিন ধরে পাইকের আইনজীবী দল বিশ্বাস করেছিল যে তিনি মস্তিষ্কের দিক থেকে মৃত এবং যেকোনো সময় তাকে কৃত্রিম জীবনধারণ ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে নেওয়া হতে পারে।
তবে 'সবার জন্যই বিস্ময়কর' এক ঘটনায় মঙ্গলবার তিনি কথা বলতে শুরু করেন, যদিও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সেই প্রচেষ্টার বিষয়ে তার মনে কেবল সীমিত কিছু স্মৃতিই রয়েছে।
স্পাইভি বলেন, পাইক তার হাতে শিরা খুঁজে বের করতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী দলকে সহায়তা করেছিলেন এবং তাকে ইনজেকশন দেওয়ার সময়ও তিনি শান্ত ও ভদ্র ছিলেন।
এরপর তিনি জ্ঞান ফিরে দেখেন, তার গলায় একটি নল ঢোকানো এবং আশপাশে এমন মানুষ রয়েছেন, যাদের তিনি চেনেন না। আইনজীবী বলেন, তার দুই হাতই এখন 'অত্যন্ত বেশি ফুলে গেছে'।
স্পাইভি বলেন, 'এসব ঘটনার কারণে তার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে, আমরা জানি না।' তিনি বলেন, পুরো ঘটনাটি পাইককে 'রাগান্বিত ও বিভ্রান্ত' করে ফেলেছে।
তিনি আরও বলেন, পাইকের একটি হাতে রক্ত জমাট বেঁধেছে, তার নিউমোনিয়া হয়ে গেছে এবং তিনি খাবার গিলতে পারছেন না।
ধারণা করা হচ্ছে, প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রচেষ্টা থেকে বেঁচে যাওয়া একমাত্র ব্যক্তি পাইক।
দুই দফা পেন্টোবারবিটাল নামের ওষুধ প্রয়োগের পরও যখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে পাইক মরবেন না, তখন তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তার শরীর থেকে প্রয়োগ করা রাসায়নিক পদার্থটি বের করে দেওয়ার চিকিৎসা চালানোর সময় তিনি কয়েক দিন অচেতন অবস্থায় ছিলেন।
বুধবারের শুরুতে আইনজীবীরা একটি জরুরি শুনানিতে বিচারকের সামনে হাজির হন। সেখানে তাদের দল ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সঙ্গে সম্পর্কিত সব প্রমাণ সংরক্ষণের আবেদন জানায়।
এসব প্রমাণ ভবিষ্যতে অঙ্গরাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে করা মামলার ভিত্তি তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
পাইকের আইনজীবীদের একজন লুক ইহেন তার মক্কেলের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে যে 'বাধাগুলো' তৈরি হয়েছে, তা তুলে ধরে কথা শুরু করেন।
তিনি বিচারক চ্যান্সেলর আইশিয়া মাইলসকে বলেন, 'গতকাল পর্যন্ত আমাদের মক্কেল অচেতন ছিলেন এবং তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব ছিল না।' তিনি জানান, পাইক এখন 'সীমিতভাবে কথা বলতে পারছেন'।
টেনেসির সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল উইল আয়্যারস এ সময় বিষয়টির 'অস্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়াগত অবস্থার' প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বিচারকও এতে একমত হন।
তিনি যুক্তি দেন, জরুরি আবেদন করার প্রয়োজন নেই, কারণ অঙ্গরাজ্য এমনিতেই সব প্রমাণ সংরক্ষণ করতে বাধ্য।
তারপরও বিচারক মাইলস নির্দেশ দেন, 'যা কিছু ওই কক্ষে ছিল, সবই সংরক্ষণ ও যথাযথভাবে রাখতে হবে।' এর মধ্যে শিরায় ওষুধ দেওয়ার নল, সিরিঞ্জ এবং প্যাকেট, নির্দেশনাপত্র ও লেবেলের মতো ব্যবহৃত ও ফেলে দেওয়া সামগ্রীও রয়েছে।
বিচারক পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রচেষ্টার আগে, চলাকালীন এবং পরে তার মানসিক অবস্থার বিষয়ে নথিপত্রও চেয়েছেন।
তিনি অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে বলেন, মামলার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক হতে পারে এমন কোনো তথ্য যেন হারিয়ে না যায় বা ভুলবশত মুছে না ফেলা হয়, সে বিষয়ে 'বিশেষ সতর্কতা' অবলম্বন করতে হবে।
বিচারক জানতে চান, পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা আবার নির্ধারণ করার কোনো পরিকল্পনা অঙ্গরাজ্য সরকারের রয়েছে কি না। জবাবে আয়্যারস বলেন, তিনি এর উত্তর জানেন না।
টেনেসির গভর্নর বিল লি অঙ্গরাজ্যে চলতি বছরের বাকি সময়ের জন্য সব মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং কী কারণে এই ব্যর্থতা ঘটেছে, সে বিষয়ে তিনি উত্তর চান। ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর অঙ্গরাজ্যের কারা বিভাগের প্রধানও পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন।
ইহেন বিচারকের কাছে পাইককে একটি ফোন ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার আবেদন করেন, যাতে তিনি তার আইনজীবীদের ফোন করতে পারেন এবং আইনজীবীরা তার সঙ্গে 'নিরবচ্ছিন্ন ও অবাধ যোগাযোগ' রাখতে পারেন।
তিনি বলেন, সম্প্রতি হাসপাতালে পাইকের সঙ্গে দেখা করার একটি প্রচেষ্টার সময় তাদের দুই ঘণ্টারও বেশি অপেক্ষা করিয়ে রাখা হয়েছিল।
ইহেন আরও বলেন, টেনেসির কারা কর্মকর্তারা পাইকের হাতকড়া খুলে দেওয়ার জন্য চিকিৎসকদের অনুরোধ সত্ত্বেও তাকে হাসপাতালের বিছানার সঙ্গে 'শিকলবন্দি' করে রেখেছেন।
পাইকের আইনজীবী আরও আবেদন করেন, তাকে হাসপাতাল থেকে কোনো অঙ্গরাজ্য পরিচালিত হাসপাতাল বা সরকারের পরিচালিত অন্য কোনো স্থাপনায় স্থানান্তর করার অন্তত ৪৮ ঘণ্টা আগে টেনেসি কারা বিভাগকে যেন তার আইনজীবী দলকে জানাতে বাধ্য করা হয়।
১৯৯৫ সালে পাইকের বয়স ছিল ১৮ বছর। সে সময় তিনি তার তৎকালীন প্রেমিক টাডারিল শিপের সঙ্গে ১৯ বছর বয়সী স্লেমারকে মারধর, নির্যাতন ও হত্যা করেন। তারা দুজন একটি সমস্যাগ্রস্ত কিশোর-কিশোরীদের জন্য আয়োজিত কর্মপ্রশিক্ষণ শিবিরে স্লেমারের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন।
হামলার সময় শিপের বয়স ছিল ১৭ বছর। সে কারণে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি, কারণ তখন আইনের দৃষ্টিতে তিনি প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন না।
শিপ এখনো কারাগারে রয়েছেন।
