গাজায় গণহত্যায় ইচ্ছাকৃতভাবেই শিশুদের টার্গেট করছে ইসরায়েল: জাতিসংঘ তদন্ত কমিশন
গাজা উপত্যকায় ইচ্ছাকৃতভাবে শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করে ইসরায়েলি বাহিনী ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে বলে বলে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন জানিয়েছে।
মঙ্গলবার (২৪ জুন) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কমিশন বলেছে, ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ফিলিস্তিনি শিশুদের জন্য 'নজিরবিহীন মৃত্যু, জখম এবং মানসিক আঘাতের' কারণ হয়ে চলেছে। এই একই কমিশন গত বছর সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল, ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা ঘটিয়েছে।
কমিশন গাজার শিশুদের ওপর এই সুপরিকল্পিত আক্রমণকে ফিলিস্তিনি জনগণকে ধ্বংস করার জন্য ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের 'গণহত্যার অভিপ্রায়ের' একটি প্রধান সূচক হিসেবে বর্ণনা করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে।
কমিশনের চেয়ারম্যান শ্রীনিবাসন মুরলিধর বলেন, '২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পরেও শিশুরা নিহত এবং গুরুতরভাবে আহত হচ্ছে। ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির শর্ত এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে ফিলিস্তিনি শিশুদের প্রাপ্য সুরক্ষার প্রতি ক্রমাগত অবজ্ঞা প্রদর্শন করছে।'
তবে, ইসরায়েল সরকার বরাবরই গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং দেশটির কর্মকর্তারা মঙ্গলবারের এই প্রতিবেদনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই প্রতিবেদনকে 'পূর্বের মতোই একটি আপত্তিকর অপপ্রচার' বলে অভিহিত করেছে।
জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন একে 'জাতিসংঘের নথির ছদ্মবেশে একটি রাজনৈতিক অপবাদ' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, 'হামাসের অপরাধ, ৭ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ড, জিম্মি সংকট এবং হামাস কর্তৃক শিশুদের ও বেসামরিক নাগরিকদের মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার পরিবর্তে কমিশন আবারও ইসরায়েলকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর পথ বেছে নিয়েছে।'
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি পরবর্তী সময়ে গাজায় ইসরায়েলের আরোপিত কঠোর বিধিনিষেধ, অব্যাহত হামলা এবং মানবিক ও চিকিৎসা সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ার ফলে ফিলিস্তিনি শিশুদের বেঁচে থাকা, স্বাস্থ্য এবং বিকাশের ক্ষেত্রে 'বহুমুখী ক্ষতি' হয়েছে।
প্রতিবেদনে হাসপাতাল, স্বাস্থ্য ক্লিনিক এবং প্রজনন কেন্দ্রগুলোতে ইসরায়েলের সুপরিকল্পিত হামলার তথ্যচিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এসব হামলার ফলে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী বিধ্বংসী প্রভাব পড়ছে।
গত অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি গাজায় দুই বছরের যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছিল। তবে কমিশন তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, এর মাধ্যমে 'শত্রুতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, বরং কেবল কিছুটা কমেছে।'
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত আট মাসে ইসরায়েল গাজায় প্রায় প্রতিদিন বিমান হামলা চালিয়েছে। এতে ১,০০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৫০-এর বেশি শিশু রয়েছে।
অন্যদিকে ইসরায়েল অভিযোগ করেছে, হামাস বারবার যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করছে এবং অস্ত্র সমর্পণ করতে অস্বীকার করছে। হামাসের এই অবস্থানের কারণে ইসরায়েল গাজায় নির্মাণ সামগ্রী এবং ভারী যন্ত্রপাতি প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। ফলে গাজার অধিকাংশ মানুষ এখনও তাঁবুতে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
উল্লেখ্য, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী গাজায় একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করার কথা ছিল এবং ইসরায়েলি বাহিনীর ধীরে ধীরে সেখান থেকে সরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে ইসরায়েল গাজায় তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়িয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, গাজা উপত্যকার ৭০ শতাংশ এলাকা এখন ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দখলে রয়েছে।
যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েল একটি মানচিত্রে অস্থায়ী 'হলুদ রেখা' টেনে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা চিহ্নিত করেছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওই রেখা ধীরে ধীরে পশ্চিম দিকে সরানো হয়েছে। এর ফলে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ আরও বিস্তৃত হয়েছে এবং ফিলিস্তিনিরা ক্রমেই ছোট হয়ে আসা একটি এলাকায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের দাবি, ওই রেখা অতিক্রম করা বাসিন্দাদের জন্য নিষিদ্ধ এবং এর কাছাকাছি যাওয়ায় শত শত মানুষ গুলিতে নিহত হয়েছেন। সম্প্রতি আগের হলুদ রেখার বাইরেও নতুন করে দখল করা এলাকা চিহ্নিত করতে একটি 'কমলা রেখা' নির্ধারণ করা হয়েছে।
রেখাগুলোর অবস্থান বারবার পরিবর্তন হওয়ায় ফিলিস্তিনিদের, বিশেষ করে শিশুদের জন্য কোন এলাকা নিরাপদ আর কোনটি নিষিদ্ধ তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রতিবেদনটিতে অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের পরিস্থিতিও তুলে ধরা হয়েছে। এতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে এবং ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হাতে ফিলিস্তিনি শিশুদের ওপর সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিম তীরে নিয়ন্ত্রণ এবং আতঙ্ক সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী শিশুদের বিরুদ্ধে বারবার 'অযৌক্তিক এবং অতিরিক্ত শক্তি' প্রয়োগ করেছে।
ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা বি'সেলেম-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পশ্চিম তীরে ২৩৬ জন ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। গাজা এবং পশ্চিম তীর উভয় জায়গাতেই শিশুদের 'গণহারে নির্বিচারে গ্রেপ্তার এবং আটকে' রাখার কথা বলা হয়েছে। গাজার অনেক শিশুর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না এবং তারা ঠিক কোথায় আছে তা অজানা।
ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই প্রতিবেদনের ফলাফলকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা বলেছে, এই প্রতিবেদন এটিই প্রমাণ করে যে দখলদার বাহিনীর এই লঙ্ঘনগুলো বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ হয়েছে। ফিলিস্তিনি শিশুদের বিরুদ্ধে এসব অপরাধের জন্য দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
তদন্ত কমিশন ইসরায়েল সরকারকে 'গাজায় অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে' এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে শিশুদের সুরক্ষায় বিশেষ বাধ্যবাধকতাগুলো মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।
একই সঙ্গে কমিশন সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কর্তৃক অভিযুক্ত ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার করতে, ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে এবং ইসরায়েলি কর্মকর্তা ও বসতি স্থাপনকারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের অনুরোধ জানিয়েছে।
