কে এই অ্যান্ডি বার্নহ্যাম, যিনি হতে পারেন ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী?
অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির নেতৃত্ব পাওয়ার লড়াইয়ে দুইবার অংশ নিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তবে সম্প্রতি একটি বিশেষ সংসদীয় উপ-নির্বাচনে তার বড় বিজয় তাকে কেবল দলের নেতৃত্ব পাওয়ার লক্ষ্যেই নয়, বরং ডাউনিং স্ট্রিটে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রবেশের দ্বারপ্রান্তেও দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
চমৎকার বাচনভঙ্গি এবং ব্যক্তিগত ক্যারিশমার জন্য সুপরিচিত বার্নহ্যাম গত ৯ বছর ধরে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন।
উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের মেকারফিল্ড আসন থেকে নতুন করে এমপি নির্বাচিত হওয়া বার্নহ্যামের জন্য এখন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানাতে আরও ৮০ জন লেবার আইনপ্রণেতার সমর্থন প্রয়োজন হবে।
করোনা মহামারির সময়ে ম্যানচেস্টারের স্থানীয় স্বার্থ রক্ষায় বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণে সমর্থকদের কাছে তিনি 'কিং অব দ্য নর্থ' (উত্তরাঞ্চলের রাজা) উপাধি পেয়েছিলেন। নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী পপুলিস্ট দল 'রিফর্ম ইউকে'-র বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সমর্থকেরা বার্নহ্যামকে লেবার পার্টির সম্ভাব্য ত্রাতা হিসেবে দেখছেন। তবে সমালোচকেরা তাকে একজন রাজনৈতিক 'ক্যামেলিয়ন' বা বহুরূপী হিসেবে চিত্রিত করেন, যিনি স্টারমারের মতোই অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা এবং অধৈর্য ভোটারদের মুখোমুখি হবেন।
টনি ব্লেয়ার প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা জন ম্যাকটার্নান, যিনি বার্নহ্যামকে তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে চেনেন, বলেন, 'তিনি শুধু আশাবাদী ও হাসিখুশিই নন, একজন রাজনীতিবিদ হওয়াটা তিনি বেশ উপভোগ করেন বলেই মনে হয়।' তিনি আরও যোগ করেন, 'নেতারা হয় আপনাকে অনুপ্রাণিত করবেন, নয়তো কিছুটা বিষণ্ণ করে তুলবেন।'
১৯৭০ সালে লিভারপুলে এক টেলিফোন প্রকৌশলী বাবা ও চিকিৎসকের অভ্যর্থনাকারী (রিসেপশনিস্ট) মায়ের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন বার্নহ্যাম। চেশায়ারের কালচেথ গ্রামে তিনি বড় হন। রোমান ক্যাথলিক স্কুলে পড়াশোনা করা বার্নহ্যাম ২০২৩ সালে ভ্যাটিকানে পোপ ফ্রান্সিসের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। নিজের ধর্মের প্রতি টান নিয়ে তিনি কৌতুক করে এভারটন ফুটবল ক্লাবের প্রতি তাঁর ভালোবাসার তুলনা করে বলেন, চার্চে যাওয়া বন্ধ করলেও যেমন ক্যাথলিক থাকা যায়, ঠিক তেমনি মাঠে না গেলেও এভারটনের সমর্থক থাকা যায়।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা শেষ করে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। প্রথমে দক্ষিণ লন্ডনের আইনপ্রণেতা টেসা জোয়েলের গবেষক এবং পরে তৎকালীন সংস্কৃতিমন্ত্রী ক্রিস স্মিথের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন।
কেমব্রিজে পড়ার সময় ওলন্দাজ বংশোদ্ভূত মারি-ফ্রান্স ভ্যান হিলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ২০০০ সালের অক্টোবরে তারা বিয়ে করেন এবং বর্তমানে তাদের তিনটি সন্তান রয়েছে।
২০০১ সালে উত্তর ইংল্যান্ডের লেই আসন থেকে প্রথমবার এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর বার্নহ্যাম টনি ব্লেয়ারের 'নিউ লেবার' সরকারের কনিষ্ঠ মন্ত্রী হন। পরে গর্ডন ব্রাউনের মন্ত্রিসভায় তিনি ট্রেজারির চিফ সেক্রেটারি, সংস্কৃতিমন্ত্রী এবং সর্বশেষ স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৯ সালে হিলসবোরো স্টেডিয়াম ট্র্যাজেডির ২০তম বার্ষিকীর স্মরণসভায় বার্নহ্যামকে দর্শকদের তোপের মুখে পড়তে হয়েছিল। ওই দুর্ঘটনায় লিভারপুল ফুটবল ক্লাবের ৯৭ জন সমর্থক মারা গিয়েছিলেন। এই ঘটনা তার মনে গভীর দাগ কাটে এবং তিনি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বিচার নিশ্চিতে সোচ্চার হন। তার প্রচেষ্টাতেই এই ঘটনার দ্বিতীয়বারের মতো তদন্ত শুরু হয়েছিল।
২০১০ সালের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টির পরাজয়ের পর বার্নহ্যাম দলের নেতৃত্বের লড়াইয়ে অংশ নিয়ে চতুর্থ হন। ২০১৫ সালে আবারও চেষ্টা করেও বামপন্থী নেতা জেরেমি করবিনের কাছে পরাজিত হন এবং পরে করবিনের টিমেও কাজ করেন। ২০১৭ সালে তিনি পার্লামেন্ট ছেড়ে দেন এবং ম্যানচেস্টারের মেয়র নির্বাচিত হন।
ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির অধ্যাপক রবার্ট ফোর্ড বলেন, বার্নহ্যামের নেতৃত্বে ম্যানচেস্টারের স্থানীয় অর্থনীতি বেশ সমৃদ্ধ হয়েছে। শহরের বাস চলাচলের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মনীতি প্রতিষ্ঠা করে তিনি বড় পরিবহন সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হন।
অধ্যাপক ফোর্ড বলেন, 'তিনি এমন একটি সাধারণ প্রযুক্তিগত নীতিকে ডেভিড বনাম গোলিয়াথের লড়াইয়ে রূপ দিয়েছিলেন—আমাকে বিশ্বাস করুন, কিয়ার স্টারমার সেখানে থাকলে এটি একেবারেই সাদামাটা কিছু হতো।' ফোর্ডের মতে, বার্নহ্যামের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তিনি অত্যন্ত কার্যকর একজন যোগাযোগকারী এবং চমৎকার গল্প বলতে পারেন।
তবে তিন ভিন্ন ধারার লেবার নেতা ব্লেয়ার, ব্রাউন ও করবিনের অধীনে কাজ করায় বার্নহ্যামকে রাজনৈতিকভাবে সুবিধাবাদী বা নমনীয় হিসেবে তীব্র সমালোচনা করা হয়। ২০২২ সালে স্টারমার মজা করে বলেছিলেন, বার্নহ্যাম 'তার শৈশবের প্রিয় দল আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিততে দেখেছেন' কিন্তু 'বিষয়টি বেশ গোলমেলে ছিল কারণ একই সঙ্গে তিনি তার শৈশবের প্রিয় দল ফ্রান্সকে ফাইনালে হারতে এবং মরক্কো ও ক্রোয়েশিয়াকে সেমিফাইনালে হারতে দেখেছেন।'
যুক্তরাজ্য '৪০ বছর ধরে ভুল পথে রয়েছে' বলে বিশ্বাস করেন বার্নহ্যাম। তবে ম্যানচেস্টারের সফল মেয়র হিসেবে কাজ করলেও ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি কতটা সফল হবেন, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অধ্যাপক ফোর্ড। ফোর্ড বলেন, '১০ ডাউনিং স্ট্রিটের ঝড়ের মধ্যে প্রবেশ করাটা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বিষয়, যেখানে প্রতিদিন আপনার টেবিলে ১৫০টি সমস্যা জমা থাকবে... কোন বিষয়গুলো নিয়ে লড়াই করবেন তা বেছে নেওয়ার নিয়ন্ত্রণ আপনার হাতে থাকবে না এবং ভাবার জন্যও কোনো সময় পাবেন না।'
