কিংবদন্তির রবিনহুডকে ‘আশ্রয়’ দেওয়া ১,২০০ বছর বয়সি ওক গাছটি মরে গেছে
রবিন হুডের কিংবদন্তির সঙ্গে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জড়িয়ে আছে ইংল্যান্ডের শেরউড ফরেস্টের নাম। প্রচলিত আছে, রবিন হুড যে গাছটিতে আশ্রয় নিতেন বা লুকিয়ে থাকতেন, সেটি ছিল 'মেজর ওক'। প্রায় ১,২০০ বছর পুরোনো সেই ঐতিহাসিক ওক গাছটি মারা গেছে বলে এখন বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন।
ব্রিটিশ সংরক্ষণ সংস্থা রয়্যাল সোসাইটি ফর দ্য প্রোটেকশন অব বার্ডস (আরএসপিবি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, এবারের বসন্তে গাছটিতে নতুন কোনো পাতা না গজানোয় তারা মনে করছে গাছটি মারা গেছে।
ব্রিটেনের অন্যতম বড় এই গাছের ডালপালার বিস্তার ছিল প্রায় ২৮ মিটার এবং এর কাণ্ড ছিল ১১ মিটার চওড়া। গাছটিকে রক্ষার জন্য বিশ শতকের শুরুর দিকে এর ডালগুলোতে বিশেষ অবলম্বনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল এবং সত্তরের দশকে এর চারপাশ বেড়া দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়।
আরএসপিবি জানিয়েছে, গাছের চারপাশের মাটি অতিরিক্ত চেপে যাওয়া এবং প্রচণ্ড গরম ও শুষ্ক গ্রীষ্মের কারণে গাছটি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
গাছটির দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা বিশেষজ্ঞ দলের সদস্য সাইমন পারফে বলেন, 'এই আইকনিক গাছটির চারপাশের পরিবেশ পুনরুজ্জীবিত করতে আমাদের দল অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে এবং কিছু জায়গায় ইতিবাচক লক্ষণও দেখা গিয়েছিল। তবে এখন মনে হচ্ছে ক্ষতিটি এতটাই বেশি ছিল যে তা আর পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।'
রবিন হুডের গল্পের টানে মেজর ওক পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। আরএসপিবি তাদের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেছে, বছরের পর বছর লাখ লাখ পর্যটকের যাতায়াতের কারণে এই গাছের চারপাশের মাটি কংক্রিটের মতো শক্ত হয়ে গিয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত গাছটির মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শেরউড ফরেস্টে আরএসপিবি'র এস্টেট অপারেশনস ম্যানেজার ক্লোয়ি রাইডার সিএনএন-কে বলেন, 'এখানে মানুষের প্রচুর আনাগোনা ছিল।'
গাছটির ওপর নজর রাখা বিশেষজ্ঞ রেগ হ্যারিস জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টানা পাঁচটি প্রচণ্ড গরম ও খরাপ্রবণ গ্রীষ্ম পার করতে হয়েছে গাছটিকে। বিশেষ করে ২০২২ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাজ্যে রেকর্ড ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা দেখা দিয়েছিল। এতে গাছটির অবস্থার চরম অবনতি ঘটে।
গাছটি দাঁড়িয়েই থাকবে
মধ্য ইংল্যান্ডের নটিংহামের কাছে অবস্থিত শেরউড ফরেস্ট কিংবদন্তি দস্যু রবিন হুডের গোপন আস্তানা হিসেবে পরিচিত। লোককথা অনুযায়ী, নটিংহামের শেরিফের হাত থেকে বাঁচতে রবিন হুড এই বনে থাকতেন এবং ধনীদের সম্পদ লুট করে গরিবদের দিতেন।
চতুর্দশ শতাব্দী থেকে রবিন হুডের গল্পের চল শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে অসংখ্য বই, চলচ্চিত্র এবং টেলিভিশন নাটকে তাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তবে মেজর ওকের সাথে এই কিংবদন্তি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকলেও ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক অ্যালেক্স ব্রাউন জানান, 'রবিন হুডের টিকে থাকা একদম শুরুর দিকের মধ্যযুগীয় গল্পগুলোতে নির্দিষ্টভাবে এই ওক গাছের কোনো উল্লেখ নেই।'
ব্রাউন আরও বলেন, শুরুর দিকের কাহিনীগুলোতে রবিন হুড এবং তার দলের সদস্যদের 'ট্রিস্টল ট্রি' নামে বিশেষ মিলনস্থলে সমবেত হওয়ার কথা বলা হয়েছে, যেখানে তার সন্ধান পাওয়া যেত। তার মতে, 'এটা হওয়া খুবই স্বাভাবিক যে গল্পের একদম শুরুর দিক থেকেই বনের কোনো একটি বিশেষ গাছকে এই মিলনস্থল হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছিল।'
যদিও এটি আর বেঁচে নেই, তবুও বিশাল এই গাছটি যেখানে এক সহস্রাব্দেরও বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানেই থাকবে।
আরএসপিবি শেরউড ফরেস্টের সিনিয়র সাইট ম্যানেজার হোলি ড্রেক এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেছেন, 'মেজর ওক শেরউডের হৃদয়ে একটি প্রাকৃতিক স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকবে যাতে দর্শনার্থীরা এসে এটি দেখতে পারেন। রবিন হুডের কিংবদন্তির মাঝে বেঁচে থাকার পাশাপাশি গাছটি জীবিত অবস্থায় বনের বাস্তুসংস্থানকে যেভাবে সহায়তা করত, মৃত অবস্থাতেও তা অব্যাহত রাখবে।'
এই গাছের ফল (অ্যাকর্ন) এবং কলম থেকে এর আগে চারা তৈরি করা হয়েছে, যা সারা বিশ্বে রোপণ করা হয়েছে। এর মধ্যে লন্ডনে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বাসভবন উইনফিল্ড হাউসও রয়েছে।
রাইডার বলেন, সঠিক যত্নের মাধ্যমে মেজর ওক আরও কয়েক দশক এমনকি কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।
