যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে সম্মত ইসরায়েল ও লেবানন, ইরান চুক্তির আশায় নতুন গতি
ইসরায়েল ও লেবানন যুদ্ধ বন্ধ করতে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে সম্মত হয়েছে বলে বুধবার ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে। এ যুদ্ধবিরতি ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের অবসান ঘটানোর জন্য বৃহত্তর কোনো চুক্তির আশা জোরদার করেছে।
তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো চুক্তির ক্ষেত্রে আংশিকভাবে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যকার লড়াই বন্ধ হওয়াকে শর্ত হিসেবে রেখেছিল। কিন্তু লেবানন ও ইসরায়েলের যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে ইরান কুয়েতে হামলা চালায়। এতে দেশটির বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কয়েক ডজন মানুষ আহত হন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালির কাছে হামলা পরিচালনা করছিল।
ওয়াশিংটনে আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার শর্ত হলো ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ মিলিশিয়ার পক্ষ থেকে সম্পূর্ণভাবে গোলাবর্ষণ বন্ধ করা এবং দক্ষিণ লিতানি অঞ্চল থেকে তাদের সব সদস্যকে সরিয়ে নেওয়া।
গত মাসেও দুই পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল, কিন্তু সংঘর্ষ অব্যাহত ছিল। মার্চ মাসে ইসরায়েল লেবাননে অভিযান চালায় হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে, যারা তেহরানের সমর্থনে সীমান্ত পেরিয়ে হামলা চালিয়েছিল।
কুয়েত এবং হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক হামলাগুলো যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার নড়বড়ে যুদ্ধবিরতির জন্য নতুন পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর ফলে তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ বেড়েছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার তিন মাসেরও বেশি সময় পরও প্রণালিটি মূলত বন্ধ রয়েছে।
কুয়েতি কর্তৃপক্ষ ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিমানবন্দর অবকাঠামো এবং কূটনৈতিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল স্থগিত করা হয়। হামলায় একজন নিহত এবং ৬০ জনের বেশি মানুষ আহত হন।
পরে কুয়েত এয়ারওয়েজ ও জাজিরা এয়ারওয়েজ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পর পুনরায় ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে বলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানায়।
ইরানের অভিজাত বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দাবি করে, তারা কুয়েতের বিমানবন্দরে হামলা চালায়নি। তাদের মতে, লক্ষ্যভ্রষ্ট মার্কিন প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের কারণেই ওই ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এ তথ্য প্রকাশ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে এবং বলে, ইরানি ড্রোনগুলো ইচ্ছাকৃতভাবেই বিমানবন্দরকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল।
এর আগে ইরানের গণমাধ্যম জানায়, বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর, একটি মার্কিন বিমানঘাঁটি এবং 'পানায়া' নামে চিহ্নিত একটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। তবে মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড এই দাবি অস্বীকার করে জানায়, তাদের কোনো ঘাঁটিতে আঘাত হানতে পারেনি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।
মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড জানায়, তারা দক্ষিণ ইরানে নতুন করে 'প্রতিরক্ষামূলক হামলা' চালিয়েছে। এসব অভিযানে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, মাইন পেতে চাওয়া ইরানি নৌযান এবং হরমুজ প্রণালির কাছে কেশম দ্বীপে হামলা চালানো হয়েছে। এর আগে ইরানের পক্ষ থেকে হামলার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে তারা দাবি করে।
বারবার চাপে যুদ্ধবিরতি
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকে তেহরান বারবার উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এ অঞ্চলেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো অবস্থিত।
এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতি হলেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বারবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য চাপ দিয়ে আসছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বব্যাপী মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যেত।
গত সপ্তাহে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধ করা এবং প্রণালি পুনরায় চালুর লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতার দিকে অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়। তবে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। জটিল বিষয়গুলো পরবর্তী আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বুধবার লেবাননের সম্প্রচারমাধ্যম আল মায়াদিনকে বলেন, আলোচনা বন্ধ হয়ে যায়নি, তবে কোনো অগ্রগতিও হয়নি।
লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ হওয়াকে শর্ত হিসেবে রাখার পাশাপাশি ইরান আরও কয়েকটি দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তেল বিক্রির আয় থেকে শত শত কোটি ডলারে প্রবেশাধিকার, অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, দেশটির বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালিতে প্রভাব বজায় রাখার সুযোগ।
জ্বালানির দাম কমানোর চাপের মুখে থাকা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তার প্রধান অগ্রাধিকার হলো ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা। ইরান দাবি করে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
বুধবার প্রকাশিত একটি পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র না রাখার বিষয়ে সম্মত হয়েছে এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি আলোচনার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন।
পরে বুধবার ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন যে, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় এ সপ্তাহের শেষ নাগাদ অগ্রগতি দেখা যেতে পারে।
হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, 'যদি কিছু ঘটে, তাহলে সেটি এই সপ্তাহান্তেই ঘটতে পারে।' তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।
ট্রাম্প বলেন, পক্ষগুলো হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়টিকে লেবাননের সংঘাত থেকে আলাদা করার চেষ্টা করছে।
লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল
এই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই ইরান ও লেবাননের নাগরিক। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ ও নৌপরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ সংঘাত ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার নতুন দফার যুদ্ধও উসকে দিয়েছে।
বুধবার দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় অন্তত ছয়জন নিহত হন এবং বৈরুতের দক্ষিণে একটি গাড়িকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয় বলে লেবাননের নিরাপত্তা সূত্র জানায়। অন্যদিকে ইসরায়েল জানায়, তারা হিজবুল্লাহর ছোড়া বলে ধারণা করা একটি শত্রু বিমান ভূপাতিত করেছে।
আরাগচি বলেন, ইসরায়েল যদি বৈরুতে হামলা চালায়, তাহলে ইরান কঠোর জবাব দেবে।
পডকাস্টে দেওয়া মন্তব্যে ট্রাম্প স্বীকার করেন যে, লেবাননের যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করার সময় তিনি এক টেলিফোন আলাপে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে 'পাগল' বলে উল্লেখ করেছিলেন।
ট্রাম্প বলেন, 'এক পর্যায়ে আমি বলেছিলাম, বিবি, আমাদের এটা থামাতে হবে। আমাদের এটা বন্ধ করতেই হবে।' এখানে তিনি নেতানিয়াহুর ডাকনাম 'বিবি' ব্যবহার করেন।
নেতানিয়াহু এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তার এবং ট্রাম্পের মধ্যে কখনও কখনও 'কৌশলগত মতপার্থক্য' থাকলেও ইরান-সংক্রান্ত প্রধান বিষয়গুলোতে তারা একমত।
