ট্রাম্পের ঘোষিত চুক্তিতে ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ত্যাগ করতে রাজি হয়েছে, মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রস্তাবিত শান্তি চুক্তির একটি অন্যতম অনুষঙ্গ হলো—তেহরান তাদের উচ্চ মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ছেড়ে দিতে রাজি হয়েছে। দুজন মার্কিন কর্মকর্তা এই তথ্য জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চাওয়া হলেও তারা কোনো উত্তর দেননি। শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ব্যাপারে ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছেন তিনি। তবে এ বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে আর কী কী বাধা রয়ে গেছে, তা-ও এখনো স্পষ্ট নয়।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঠিক কীভাবে ইরান এই ইউরেনিয়ামের মজুত ছেড়ে দেবে, তার কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা এই প্রস্তাবে নেই। বরং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আগামী দফার আলোচনার জন্যই এই বিস্তারিত রূপরেখাটি তুলে রাখা হয়েছে।
তবে ইরান যে তাদের মজুত ছেড়ে দিতে রাজি হয়েছে—এমন একটি প্রতিশ্রুতি বা ঘোষণাই এই চুক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য। অবশ্য ট্রাম্প যে চুক্তির কথা ঘোষণা করেছেন, সে বিষয়ে ইরান প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি।
ইরান প্রথমে চুক্তির প্রাথমিক ধাপে উচ্চ মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে রাজি হয়নি। তারা দাবি করেছিল, এটি আলোচনার দ্বিতীয় ধাপে রাখা হোক।
কিন্তু মার্কিন আলোচকেরা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে চুক্তির প্রাথমিক পর্যায়ে এই মজুতের বিষয়ে কোনো সমঝোতা না হলে তারা আলোচনা ছেড়ে দেবেন এবং পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু করবেন।
মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাকারীরা সম্প্রতি ট্রাম্পের সামনে ইরানের ইউরেনিয়াম মজুতে বোমা হামলার বেশ কয়েকটি সম্ভাব্য পরিকল্পনা পেশ করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, এই ইউরেনিয়ামের বেশির ভাগই ইসফাহান পারমাণবিক স্থাপনায় রয়েছে। গত জুনে এই স্থাপনায় মার্কিন টোমাহক মিসাইল আঘাত হেনেছিল, যার ফলে উচ্চ মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামগুলো আপাতত মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে।
আলোচিত বিকল্পগুলোর মধ্যে ইসফাহানে 'বাঙ্কার-বাস্টিং' (মাটির গভীরের স্থাপনা ধ্বংসকারী) বোমা দিয়ে হামলা চালিয়ে মাটির নিচের এই মজুত ধ্বংস করার পরিকল্পনাও ছিল।
গত গ্রীষ্মে হামলার পর ইরান যখন ইউরেনিয়ামের এই মজুতে পৌঁছানোর সুযোগ পায়, তখন ট্রাম্প এই মজুত উদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ কমান্ডো অভিযান চালানোর কথা বিবেচনা করেছিলেন। তবে অত্যন্ত বিপজ্জনক এই অভিযানে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর ব্যাপক প্রাণহানির ঝুঁকি থাকায় শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প এর অনুমোদন দেননি।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মতে, ইরানের কাছে বর্তমানে ৬০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ প্রায় ৯৭০ পাউন্ড ইউরেনিয়ামের মজুত রয়েছে।
ওবামা প্রশাসনের আমলে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানিরা তাদের ইউরেনিয়ামের মজুত রাশিয়ার হাতে তুলে দিয়েছিল। এবারও তারা একই কাজ করতে পারেন। এ ছাড়া তারা তাদের এই মজুতের সমৃদ্ধকরণের মাত্রা কমিয়ে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেন, যা দিয়ে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব নয়।
আগামী কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যে শুরু হতে যাওয়া পারমাণবিক আলোচনায় মূলত এই ইউরেনিয়ামের মজুত এবং ইরানের সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হবে।
যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল ইরান ২০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখুক। অন্যদিকে ইরান এর চেয়ে অনেক কম সময়ের জন্য স্থগিতাদেশের প্রস্তাব দিয়েছিল।
যেকোনো চুক্তির মূল শর্তই হবে বিদেশে আটকে থাকা ইরানের শত কোটি ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করা। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, চূড়ান্ত পরমাণু চুক্তিতে সম্মত হওয়ার পরেই কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের গড়া একটি পুনর্গঠন তহবিল থেকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যবহারের সুযোগ পাবে ইরান। মূলত ইরানকে আলোচনা চালিয়ে যেতে এবং একটি চুক্তিতে আসতে বাধ্য করতেই এই কৌশল নেওয়া হয়েছে।
