আমার মনে হয় ইউক্রেন যুদ্ধ ‘শেষের পথে’: পুতিন
ইউক্রেন যুদ্ধের এবার ইতি ঘটতে চলেছে—শনিবার এমনই ইঙ্গিত দিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। মস্কোর বিজয় দিবস কুচকাওয়াজ থেকে ইউক্রেনের বিপক্ষে জয়ের প্রত্যয় ব্যক্ত করার কয়েক ঘণ্টা পরই এই মন্তব্য করলেন তিনি। গত কয়েক বছরের তুলনায় দেশটির এবারের বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান ছিল অনেকটাই অনাড়ম্বর।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে পুতিন বলেন, 'আমার মনে হয় বিষয়টি শেষের পথে।' একইসঙ্গে নতুন করে ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসার আগ্রহও প্রকাশ করেছেন তিনি। এক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর গেরহার্ড শ্রোডারের ওপরে তার বিশেষ আস্থা রয়েছে বলে জানিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান মস্কোর সঙ্গে পশ্চিমা দুনিয়ার সম্পর্কে নজিরবিহীন টানাপোড়েন তৈরি করেছে।
ক্রেমলিন বলেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের মধ্যস্থতায় যে শান্তি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা এখন স্থগিত আছে। তবে ইউক্রেনে 'বিশেষ সামরিক অভিযানের' যাবতীয় লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার বারবার শোনা গেছে পুতিনের গলায়।
শনিবার ক্রেমলিনে যুদ্ধ শুরুর কারণও ব্যাখ্যা করেন রুশ প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, এ যুদ্ধের জন্য দায়ী 'বিশ্বায়নপন্থি' পশ্চিমা নেতারা।
পুতিন বলেন, ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীরের পতনের পর ন্যাটো আর পূর্ব দিকে অগ্রসর হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে ইউক্রেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বলয়ে টানার চেষ্টা করে সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা হয়েছে।
ইউক্রেনের মাটিতে রুশ সেনারা চার বছরেরও বেশি সময় ধরে লড়ছেন। রাশিয়ায় যা 'গ্রেট প্যাট্রিয়টিক ওয়ার' বা মহান দেশপ্রেমের যুদ্ধ (১৯৪১-৪৫) নামে পরিচিত, সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের লড়াইয়ের মেয়াদকেও ইতিমধ্যে ছাপিয়ে গেছে বর্তমানের এই সংঘাত।
ইউরোপের রণাঙ্গন
১৯৯৯ সালের শেষ দিন থেকে কখনও প্রেসিডেন্ট, কখনও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গত আড়াই দশক ধরে রাশিয়া শাসন করে আসছেন পুতিন। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে এখন মস্কোতেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ইউক্রেনের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন ধ্বংসস্তূপ। যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে কয়েক লাখ মানুষ। টান পড়েছে রাশিয়ার ৩ লাখ কোটি ডলারের বিশালাকার অর্থনীতিতেও। ইউরোপের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক এখন স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের চেয়েও খারাপ।
এদিকে চলতি বছরে রুশ সেনাদের অগ্রগতির গতি কিছুটা শ্লথ হলেও, ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকা এখনও মস্কোর দখলেই।
সম্প্রতি রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে একতরফা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছিল। এই পরিস্থিতিতে শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত নতুন করে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ক্রেমলিন ও কিয়েভ—দুই পক্ষই এই ঘোষণাকে সমর্থন জানিয়েছে। পাশাপাশি এক হাজার যুদ্ধবন্দি বিনিময়েও সম্মতি দিয়েছে দুই দেশ।
ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, 'আমি এই যুদ্ধ বন্ধ দেখতে চাই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রাণহানির নিরিখে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত সবচেয়ে। প্রতি মাসে ২৫ হাজার তরুণ সেনা হতাহত হচ্ছেন। এটা স্রেফ পাগলামি।'
মধ্যস্থতায় কি শ্রোডার?
ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা গত সপ্তাহে বলেছিলেন, রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনার 'সুযোগ' রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে পুতিনের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তিনি ইউরোপের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি কি না। রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, এক্ষেত্রে তার প্রথম পছন্দ জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর গেরহার্ড শ্রোডার।
পুতিন বলেন, 'ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে ফেডারেল রিপাবলিক অভ জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর মি. শ্রোডারই (আলোচনার জন্য) প্রথম পছন্দ।'
যদিও ইউরোপীয় নেতাদের বড় একটি অংশ মনে করে, এই যুদ্ধে রাশিয়ার হার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পুতিনকে তারা 'একনায়ক' ও 'যুদ্ধাপরাধী' হিসেবেই আখ্যা দিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, ইউক্রেনে পুতিন জয়ী হলে ভবিষ্যতে ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর ওপরেও হামলা চালাতে পারে রাশিয়া। মস্কো অবশ্য এই দাবিকে 'ভিত্তিহীন' বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
