পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী কে এই শুভেন্দু অধিকারী?
শুক্রবার (৮ মে) ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শুভেন্দু অধিকারীকে পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করেছে। গত বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু হতে চলেছেন রাজ্যের ইতিহাসের নবম মুখ্যমন্ত্রী। তিনি তার প্রাক্তন নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন।
২০২০ সালের ডিসেম্বরে তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) ত্যাগ করে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার আগে মমতার সঙ্গে তার সম্পর্কের চরম তিক্ততা তৈরি হয়েছিল।
তিনবারের সংসদ সদস্য এবং ইউপিএ-২ সরকারের প্রাক্তন কেন্দ্রীয় পল্লী উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী শিশির অধিকারীর পুত্র শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়েছিল ছাত্র পরিষদের হাত ধরে। বামপন্থীদের দাপট যখন তুঙ্গে, তখন কংগ্রেসের এই ছাত্র সংগঠন থেকেই উঠে এসেছিলেন তিনি।
শুরু থেকেই তার সাংগঠনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের গুণাবলী ছিল নজরকাড়া। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করার দুই বছর পর শুভেন্দু তার বাবা ও ভাইদের সঙ্গে এই দলে যোগ দেন। অধিকারীরা কয়েক দশক ধরে রাজনীতিতে যুক্ত থাকায় মেদিনীপুর জেলায় সিপিআই(এম)-এর শক্তিশালী দলীয় অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ জানাতে তৃণমূলের জন্য এই অন্তর্ভুক্তি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শুভেন্দুর অসামান্য সাংগঠনিক দক্ষতায় মেদিনীপুর অঞ্চলে দলটি ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করে এবং তৎকালীন সিপিআই(এম) নেতা ও তমলুকের প্রাক্তন সংসদ সদস্য লক্ষণ শেঠের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানায়। সিঙ্গুর আন্দোলনের এক বছর পর ২০০৭ সালের মার্চ মাসে যখন নন্দীগ্রাম আন্দোলন শুরু হয়, শুভেন্দুর নেতৃত্বেই তৃণমূল সেখানে ভূমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হয়েছিল। এলাকায় দলের ক্যাডার বাহিনীকে সামনে থেকে পরিচালনা করেছিলেন তিনি।
সেই সময় মাওবাদীরাও ওই এলাকায় সাংগঠনিক বিস্তার ঘটাতে আন্দোলনে সক্রিয় ছিল এবং তৃণমূল নেতা ও 'ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি'র (বিইউপিএসি) সদস্যদের সঙ্গে তাদের যোগসূত্র ছিল। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের (এসইজেড) জন্য জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে গড়ে ওঠা এই স্থানীয় ও রাজনৈতিক জোটের নেপথ্য কারিগর ছিলেন শুভেন্দু, যিনি তখন ছিলেন প্রথম বারের একজন তরুণ বিধায়ক।
সাংগঠনিক দক্ষতার পাশাপাশি তার সহজ-সরল বাচনভঙ্গি, গ্রামীণ বাংলা টান এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আদলে গড়া লড়াকু ভাবমূর্তি তাকে জনপ্রিয় করে তোলে। তৃণমূলের অনেক নেতাই পরবর্তীকালে তার এই গুণ স্বীকার করেছেন।
একজন চতুর কৌশলী হিসেবে শুভেন্দু নন্দীগ্রাম আন্দোলনকে নিজের এবং দলের সাফল্যের সোপান হিসেবে ব্যবহার করেন। পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া এবং পুরুলিয়া থেকে শুরু করে মালদহ ও মুর্শিদাবাদ পর্যন্ত নিজের ভিত্তি মজবুত করেন। শুরুতে তাকে একজন আঞ্চলিক শক্তিশালী নেতা হিসেবে দেখা হলেও ধীরে ধীরে তিনি মেদিনীপুরের বাইরেও বড় জনভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হন।
রাজনৈতিক উত্থানের ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তিনি তার পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বী লক্ষণ শেঠকে হারিয়ে দিল্লির রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।
২০১৪ সালে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলেও তিনি তার আসনটি ধরে রাখেন। ২০১৭ সালে মুকুল রায় তৃণমূল ত্যাগ করার পর শুভেন্দু দলের অন্যতম প্রধান কৌশলী হয়ে ওঠেন, যেখানে তিনি নিজের রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তা ও পেশীশক্তি—উভয়কেই কাজে লাগান। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন তার ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের দ্বিতীয় প্রধান হিসেবে গড়ে তুলতে শুরু করেন, তখন থেকেই মমতার সঙ্গে শুভেন্দুর দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। অথচ ওই অবস্থানটি এর আগে স্বাভাবিকভাবেই শুভেন্দুর দখলে ছিল।
মমতা সরকারের পরিবহন মন্ত্রী থাকা অবস্থায় ২০২০ সালে এক নাটকীয় পদক্ষেপে দল ছাড়েন শুভেন্দু। পরবর্তীকালে তিনি স্লোগান তোলেন, 'তোলাবাজ ভাইপো হটাও'।
পশ্চিম মেদিনীপুরের একটি জনসভায় দেওয়া এই স্লোগান মমতাকে ক্ষুব্ধ করে এবং তিনি অধিকারী পরিবারকে 'মীরজাফর' (বিশ্বাসঘাতক) বলে আখ্যা দেন। এমনকি নিজেকেও তিরস্কার করে মমতা বলেছিলেন, তাদের আসল রূপ আগে চিনতে না পারার জন্য তিনি নিজেই 'বড় গাধা'।
যাই হোক, শুভেন্দুর দলত্যাগের ক্ষতি তৃণমূল হাড়ে হাড়ে টের পায়। ২০২১ সালের নির্বাচনে শুভেন্দুর কাছে নন্দীগ্রামে পরাজিত হন মমতা এবং পূর্ব মেদিনীপুরে তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি দুর্বল হয়ে পড়ে।
২০২১-এর ভোটে নন্দীগ্রামে এবং পরবর্তীতে এবার ভবানীপুরে মমতাকে পরাজিত করা শুভেন্দুকে বিজেপি কর্মীদের কাছে এক 'তারকা'য় পরিণত করেছে। ২০২১ সালের পর বিরোধী দলনেতা হিসেবে তৃণমূলের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাঝেও তার কঠোর অবস্থান দলের ভেতরে তার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
তার আগামীর কর্মসূচি কী
ক্ষমতা গ্রহণের পর শুভেন্দু অধিকারী সরকারকে একাধিক বড় চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল নাগরিক পরিকাঠামো ঠিক করা এবং রাজ্যের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা সংস্কার। কেন্দ্র ও মমতা সরকারের দ্বন্দ্বের কারণে রাজ্যের আর্থিক অবস্থা আগে থেকেই সংকটে ছিল। নতুন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হবে রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা পুনপ্রতিষ্ঠা করা এবং গত কয়েক দিনের রাজনৈতিক সহিংসতার অবসান ঘটানো।
বুধবার রাতে কলকাতার কাছে শুভেন্দুর ব্যক্তিগত সহকারী চন্দ্রনাথ রথকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। খুনিদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করার মাধ্যমে তদন্ত নিশ্চিত করা নতুন সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২১ সালের নির্বাচনের পর বিজেপি কর্মীরা যে সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন, তেমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি রোধ করাও তার লক্ষ্য।
বিজেপির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, নারীদের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা চালু করতে হবে, যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার'-এর পাল্টা পদক্ষেপ (যেখানে মহিলারা ১,৫০০ টাকা এবং এসসি/এসটি মহিলারা ১,৭০০ টাকা পেতেন)।
এছাড়া বিজেপি বেকার যুবকদের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা (তৃণমূলের প্রতিশ্রুতির দ্বিগুণ) এবং আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান ও স্বনির্ভরতার সুযোগ তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যাতে বড় ধরনের অভিবাসন ঠেকানো যায়।
নতুন বিজেপি সরকার অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) কার্যকর করা এবং বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ মোকাবিলার দিকেও নজর দেবে।
বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, সরকার গঠনের ৪৫ দিনের মধ্যে তারা সপ্তম বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করবে এবং ডিএ (মহার্ঘ ভাতা) বকেয়া মিটিয়ে দেবে। আদালতের হলফনামা অনুযায়ী, এটি কার্যকর করতে রাজ্য সরকারের বাড়তি ৪২ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে।
