শুল্ক যৌক্তিকীকরণে ২৫০ পণ্যের ওপর ট্যারিফ কমাতে পারে সরকার
শুল্ক (ট্যারিফ) যৌক্তিকীকরণের অংশ হিসেবে প্রায় ২৫০টি ট্যারিফ লাইনের আওতাভুক্ত বিভিন্ন পণ্য, যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশের ওপর বিদ্যমান কাস্টমস শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (রেগুলেটরি ডিউটি) কমানো হতে পারে।
এ তালিকায় সোলার ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের যন্ত্রাংশ, ফেব্রিক, জীবিত মাছ ও প্রাণিসহ বিভিন্ন পণ্য থাকতে পারে। তবে উদীয়মান তামাকজাত পণ্যসহ প্রায় ৫০টি এইচএস কোডের ক্ষেত্রে শুল্কহার বাড়ানো হতে পারে।
অন্যদিকে আমদানিপণ্যের ওপর আরোপিত ন্যূনতম শুল্কমূল্য (মিনিমাম ট্যারিফ ভ্যালু), যা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তা বাতিলের দাবি থাকলেও এবারও তা বহাল রাখা হচ্ছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেটসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা জানান, চলতি বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের সময়সূচি রয়েছে। এলডিসি উত্তরণের পর অনেক দেশ ও অঞ্চলে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধা আর থাকবে না। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশকে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (এপিটিএ) কিংবা এ ধরনের অন্যান্য চুক্তিতে যেতে হবে।
অর্থাৎ, কোনো দেশ বা অঞ্চলে বাংলাদেশের রপ্তানি শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে হলে ওই দেশ বা অঞ্চল থেকে আমদানির ক্ষেত্রেও সমপর্যায়ের সুবিধা দিতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের আমদানি শুল্কহার এখনো তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।
বিশ্বব্যাংকের ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ শুল্কহারের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। সে সময় দেশের গড় শুল্কহার ছিল প্রায় ২৮ শতাংশ। একই সময়ে শ্রীলঙ্কায় এ হার ছিল ২২ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ভারতে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ।
অন্যদিকে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে গড় শুল্কহার ছিল ১০ শতাংশের নিচে। মালয়েশিয়ায় ৫ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ায় ৮ শতাংশ।
নিম্ন আয়ের দেশগুলোর গড় শুল্কহার যেখানে ৯ দশমিক ৭৯ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশের হার প্রায় তিন গুণ বেশি।
ধাপে ধাপে কমানো হচ্ছে শুল্কহার
গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই ট্যারিফ যৌক্তিকীকরণের দাবি জোরালো হতে থাকে। এ লক্ষ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটিও গঠন করা হয়। সেই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী গত তিন বছর ধরে ধাপে ধাপে শুল্কহার কমানো হচ্ছে।
তবে এনবিআরের কর্মকর্তারা মনে করছেন, যেসব খাতে শুল্ক ছাড় দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর অধিকাংশের আমদানি তুলনামূলক কম হওয়ায় এতে রাজস্বে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও শুল্ক বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সদস্য ড. মোস্তফা আবিদ খান টিবিএসকে বলেন, "বিশ্ববাণিজ্যে প্রতিযোগিতামূলক হতে হলে বাংলাদেশকে অবশ্যই উচ্চ শুল্কহার কমাতে হবে। তবে যে গতিতে তা কমানো হচ্ছে, তা যথেষ্ট নয়।"
তিনি বলেন, "শুল্ক কখনোই রাজস্ব আদায়ের হাতিয়ার হওয়া উচিত নয়; এটি হওয়া উচিত একটি নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো শুল্ককে মূলত রাজস্ব আহরণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।"
ট্যারিফ লাইনের বিশাল পরিসর
বর্তমানে বাংলাদেশে আমদানিযোগ্য পণ্যের ট্যারিফ লাইনের সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার ৬০০। গত তিন বছরে পাঁচ শতাধিক ট্যারিফ লাইনে শুল্কহার কমানো হয়েছে।
ট্যারিফ লাইন হলো শুল্ক, বাণিজ্য পরিসংখ্যান এবং নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার উদ্দেশ্যে আমদানি বা রপ্তানি পণ্যকে সুনির্দিষ্টভাবে শ্রেণিবিন্যাস করার একটি কোডভিত্তিক পদ্ধতি। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হারমোনাইজড সিস্টেম (এইচএস) কোডের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় এবং এর মাধ্যমে একই পণ্যের বিভিন্ন ধরন ও উপাদানকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায়।
উদাহরণ হিসেবে, 'ইলেকট্রনিক পণ্য' একটি বিস্তৃত শ্রেণি। এর মধ্যে 'মোবাইল ফোন' একটি উপশ্রেণি এবং 'স্মার্টফোন' আরও নির্দিষ্ট একটি পণ্য। প্রতিটির জন্য পৃথক এইচএস কোড বা ট্যারিফ লাইন রয়েছে। এমনকি একটি মোবাইল ফোনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশেরও আলাদা আলাদা এইচএস কোড নির্ধারিত থাকে।
