‘অস্থির ও বিপজ্জনক’ সাগর: যেভাবে জাহাজ চলাচলের পথ নতুন বৈশ্বিক যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠল
ইন্দোনেশিয়ার অর্থমন্ত্রীর এক মন্তব্যে গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মহলে রীতিমতো হৈচৈ পড়ে যায়। অর্থমন্ত্রী পুরবায়া ইউধি সাদেওয়া বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নেওয়া পদক্ষেপের আদলে তাদের মালাক্কা প্রণালিতেও জাহাজগুলোর ওপর টোল আরোপ করা উচিত।
যদিও ইন্দোনেশিয়া খুব দ্রুতই প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নিয়েছে, তবে এটি বর্তমান বিশ্বের এক কঠিন বাস্তবতাকে সবার সামনে তুলে ধরেছে। সাগরে জাহাজ চলাচলের যে সুষ্ঠু নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা ছিল, তা আজ অনেক বেশি বিপজ্জনক, ব্যয়বহুল এবং পুরোপুরি রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো এলিজাবেথ ব্র বলেন, কয়েক দশক আগে সামুদ্রিক আইন তৈরি হওয়ার পর 'আমরা কখনোই সাগরকে এতটা অস্থির ও বিপজ্জনক অবস্থায় দেখিনি।'
জাহাজে পণ্য পরিবহন সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাণিজ্যের বিস্তৃতি ঘটলে দেশগুলো একত্রিত হয়ে সমুদ্রকে নিরাপদ ও উন্মুক্ত করতে নানা চুক্তি সই করে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মতে, বিশ্বের ৮০ শতাংশেরও বেশি বাণিজ্য এই চুক্তির ওপর নির্ভরশীল, যা ১৯৫০-এর দশকে ৬০ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে গত বছর ২৫ ট্রিলিয়ন (বা ২৫ হাজার বিলিয়ন) ডলারে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, চীন বা রাশিয়ার মতো বড় দেশগুলোর নেয়া পদক্ষেপ এই চুক্তিগুলোর স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
হরমুজ প্রণালিতে ক্ষমতার লড়াই
গত মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলে ইরান প্রথম ধাপে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত করে দেয়। এর জবাবে ১৩ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দর ও জাহাজের ওপর অবরোধ দেয়। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রণালির কাছে এমনকি বহুদূরের এশিয়া-প্যাসিফিক এলাকাতেও ইরানি তেলের জাহাজ আটকে তল্লাশি চালাচ্ছে।
অন্যদিকে, ইরানও পিছিয়ে নেই। অনুমতি ছাড়া তাদের সীমানা দিয়ে যাওয়ার চেষ্টার কারণে কয়েকটি জাহাজ আটকেছে তারা এবং কয়েকটির দিকে গুলিও ছুড়েছে। এসব পাল্টা হামলায় জ্বালানির বাজার রীতিমতো পুড়ছে। কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে তেল ও গ্যাস।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্স-এর জ্যাক কেনেডি বলেন, 'জাহাজগুলোকে সরাসরি আটকে না দিলেও এই "অনুমতি নেওয়ার" প্রক্রিয়াই বিশাল খরচ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।' উদাহরণস্বরূপ তিনি জানান, ওমানের কাছে ইরানের একটি স্পিডবোট একটি কন্টেইনার জাহাজের ওপর গুলি চালায়। কেনেডির মতে, এটি সব চলাচল বন্ধের জন্য নয়, বরং 'সতর্কতা হিসেবে সীমিত শক্তির প্রদর্শন এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণের বার্তা দেওয়ার জন্য' করা হয়েছিল।
পানামা খাল নিয়ে উত্তেজনা
মঙ্গলবার, যুক্তরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের কিছু দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে চীনকে দুষলো। তাদের দাবি, চীন ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের বন্দরে পানামার পতাকাবাহী জাহাজগুলো আটকে রাখছে। তারা চীনের এই কাজকে 'সামুদ্রিক বাণিজ্য রাজনীতিকরণের এবং তাদের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন আঘাত' বলে আখ্যা দেয়।
জবাবে চীন এসব অভিযোগ তো উড়িয়েই দেয়, উল্টো যুক্তরাষ্ট্রকে ভণ্ড বলে আক্রমণ করে। বুধবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, 'কে বছরের পর বছর ধরে পানামা খাল দখল করে রেখেছিল? কে সামরিক বাহিনী দিয়ে পানামার স্বাধীনতা নষ্ট করেছিল? এর উত্তর সবারই জানা।'
এই ঝামেলার মূল কারণ ছিল পানামার সুপ্রিম কোর্টের তিন মাস আগের একটি সিদ্ধান্ত, যেখানে তারা হংকং-এর একটি কোম্পানির সাথে দুটি বন্দর পরিচালনার চুক্তি বাতিল করে দেয়। গুঞ্জন রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র পানামার ওপর খাল অঞ্চলে চীনের প্রভাব কমাতে চাপ দিয়ে আসছে।
সমস্যা আগের, বদলেছে আকার
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশিরভাগ নিয়মিত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে পুরনো আইন মেনেই কাজ চলছে। তবে সমস্যা হলো, নিয়ম ভাঙার বড় বড় ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
যেমন, কৃষ্ণসাগরে ইউক্রেনের রপ্তানিতে রাশিয়ার বাধা দেওয়ার কারণে বিশ্বে খাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছিল। এটি বুঝিয়ে দেয় কীভাবে নৌ-নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে যুদ্ধের বাইরের অঞ্চলগুলোতে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করা যায়। একইভাবে দক্ষিণ চীন সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে হয়রানির জন্য চীনের বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ উঠছে।
টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জ্যাঁ-পল রড্রিগ বলেন, 'সাগরে শত্রুর অর্থনীতিতে আঘাত হানার এই কৌশল নতুন কিছু নয়। তবে যেটা বদলেছে, তা হলো এর মাত্রা, কন্টেইনারের সংখ্যা এবং বৈশ্বিক বহরের বিস্তৃতি।'
অন্যদিকে, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লোহিত সাগরে হুথিদের হামলার কারণে শিপিং কোম্পানিগুলো এখন আফ্রিকান পথ ঘুরে দীর্ঘ যাত্রা বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
মূল ভয় 'খারাপ দৃষ্টান্তের'
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ঘটনাগুলোর মানে হলো বিশ্বের সব জায়গাতেই আগের সেই নির্ভরযোগ্য সামুদ্রিক নিয়ম হারিয়ে যাচ্ছে। এর বদলে কার কতটা রাজনৈতিক বা সামরিক জোর আছে, তার ওপর ভিত্তি করে নিরাপত্তা ও প্রবেশাধিকার ঠিক হচ্ছে।
ঝুঁকির আরেকটি দিক হলো দস্যুতা। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম ব্যুরোর মতে, ২০২৫ সালে গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সামুদ্রিক দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে।
ভৌগলিক রাজনৈতিক প্রভাব শিপিং খাতের বাস্তবতায় চরম প্রভাব ফেলেছে। বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহারের কারণে জাহাজগুলোর শুধু জ্বালানি খরচই বাড়ছে না, এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিমা এবং ঝুঁকি ভাতার আকাশছোঁয়া খরচ। জাহাজ অপারেটররা এখন পথে যেকোনো জটিলতা বা দেরি এড়ানোর জন্য তাদের জাহাজের রুট বা বন্দর নির্বাচনের ক্ষেত্রে অনেক হিসাব-নিকাশ করে চলছেন।
কেনেডি মনে করেন, 'আসল ভয় হলো কোনো দেশ একবার এই নিয়ম ভাঙলে বা আইন নিজেদের সুবিধামতো কাজে লাগালে তা একটি খারাপ দৃষ্টান্ত তৈরি করবে। তখন আর আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা থাকবে না, শক্তি আর দরকষাকষির জোরই হবে শেষ কথা।'
