ট্রাম্পের যুদ্ধ: যে ধরনের বেপরোয়া সামরিক অভিযান সাম্রাজ্যের পতন ডেকে আনে
দুই হাজার বছরেরও বেশি আগে গ্রিক ইতিহাসবিদ প্লুটার্ক একটি বিষয়ের চমৎকার বর্ণনা দিয়েছিলেন, যাকে আধুনিক ইতিহাসবিদরা এখন 'মাইক্রো-মিলিটারিজম' বা 'ক্ষুদ্র-সামরিকবাদ' বলে অভিহিত করেন।
তা সে অতীতের অ্যাথেন্সই হোক বা বর্তমানের আমেরিকা- কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যখন তার পতনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছায়, তখন সেখানকার শাসকরা প্রায়শই আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। হাতের মুঠো থেকে ফস্কে যাওয়া সাম্রাজ্যের সেই হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের আশায় তারা দৃশ্যত সাহসী কিছু সামরিক হামলা চালিয়ে বসেন।
তবে সাম্রাজ্যের ক্ষমতার চরম শিখরে থাকা অবস্থায় অর্জিত সেই মহান বিজয়গুলোর পুনরাবৃত্তি করার পরিবর্তে, এই ধরনের সামরিক দুঃসাহসিকতা বরং চলমান পতনকেই আরও ত্বরান্বিত করে। এটি সাম্রাজ্যের অবশিষ্ট আভিজাত্যটুকু মুছে ফেলে এবং তার পরিবর্তে শাসকগোষ্ঠীর ভেতরের নৈতিক পচনকেই বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত করে।
ঐতিহাসিক প্রমাণ ক্রমশ জোরালো হচ্ছে যে, আমেরিকা প্রকৃতপক্ষে একটি দ্রুত পতনের দিকে ধাবিত হওয়া সাম্রাজ্য। অন্যদিকে, ইরানের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেছে নেওয়া এই যুদ্ধটি ঠিক সেই ধরনের 'মাইক্রো-মিলিটারি' বিপর্যয়ে পরিণত হচ্ছে, যা গত আড়াই হাজার বছর ধরে একের পর এক সাম্রাজ্য ধ্বংস করতে সাহায্য করেছে—প্রাচীন অ্যাথেন্স থেকে মধ্যযুগীয় পর্তুগাল, কিংবা আধুনিক স্পেন, গ্রেট ব্রিটেন এবং এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
আর প্রতিটি ভাগ্যাহত যুদ্ধকালীন সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে ছিলেন এমন একজন সমস্যাগ্রস্ত নেতা, যিনি প্রায়ই জন্মসূত্রে সম্পদ ও প্রতিপত্তির অধিকারী ছিলেন। তাদের ব্যক্তিগত অপূর্ণতাগুলো সাম্রাজ্যের পতনের সেই যন্ত্রণাদায়ক প্রক্রিয়ার অযৌক্তিকতাগুলোকে প্রতিফলিত ও প্রসারিত করেছিল।
সেই মনোবল ভেঙে দেওয়া নিম্নগামী সর্পিল গতির সময়ে সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনীগুলো—যারা সাম্রাজ্যের উত্থানের সময় ছিল অত্যন্ত মারাত্মক—নিজ দেশকে নিংড়ে নেওয়া, এমনকি বিপর্যয়কর 'মাইক্রো-মিলিটারি' দুঃসাহসিকতায় নিমজ্জিত করে ভুল করতে পারে। এগুলো মূলত হারানো সাম্রাজ্যিক ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের এক মনস্তাত্ত্বিক প্রচেষ্টাই মাত্র, যেখানে নতুন ভূখণ্ড দখল বা বিস্ময়কর সামরিক শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করা হয়।
যদিও এই ধরনের 'মাইক্রো-মিলিটারিজম' প্রায়ই এমন লক্ষ্যবস্তু বেছে নেয় যা কৌশলগতভাবে টিকিয়ে রাখা অসম্ভব ছিল, তবুও ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্যগুলোর ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ এতই প্রবল থাকে যে, তারা প্রায়ই তাদের মর্যাদা বা সম্মান এই ধরনের দুঃসাহসিক অভিযানের ওপর বাজি ধরে।
এই ধরনের বিপর্যয়গুলো শুধু যে একটি ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্যের আর্থিক সংকট বাড়িয়ে তোলে তা-ই নয়; বরং অত্যন্ত অপমানজনকভাবে এগুলো সাম্রাজ্যের ক্ষয়িষ্ণু ক্ষমতাকে প্রকাশ করে দেয়। একই সঙ্গে সাম্রাজ্যের রাজধানীতে (তা সে অ্যাথেন্স, লিসবন, মাদ্রিদ, লন্ডন বা ওয়াশিংটন ডিসি যা-ই হোক না কেন) সাম্রাজ্যিক পতনের অস্থিতিশীল প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
আমাদের এই বর্তমান সময়ে, তেহরান বা বৈরুতের রাস্তা থেকে যখন বোমা পড়া বন্ধ হবে এবং অবশেষে ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করা হবে, তখন এই ধরনের কার্যত পরাজয়ের ফলে মার্কিন বৈশ্বিক ক্ষমতার ওপর যে প্রভাব পড়বে তা অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠবে—যেখানে ন্যাটোর মতো জোটগুলো নিস্তেজ হয়ে পড়বে, আমেরিকার আধিপত্য উবে যাবে, বৈধতা হারিয়ে যাবে, বিশ্বজুড়ে বিশৃঙ্খলা বাড়বে এবং বিশ্ব অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আসুন এবার বর্তমান সাম্রাজ্যিক মুহূর্তের বিপর্যয় থেকে ইতিহাসের পাঠের দিকে দৃষ্টি ফেরাই। মধ্যপ্রাচ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই 'মাইক্রো-মিলিটারি' দুঃসাহসিকতা এই দেশের ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্যের ওপর যে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করতে পারে, তা অন্বেষণ করা যাক।
সিসিলিতে অ্যাথেন্সের পরাজয়
সময়টি ছিল খ্রিস্টপূর্ব ৪১৩ অব্দ। স্থান প্রাচীন অ্যাথেন্স, যা তখন একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যের কেন্দ্র। এজিয়ান সাগরের উপকূলে দীর্ঘকাল আধিপত্য বজায় রাখলেও স্পার্টার ক্রমাগত সামরিক চ্যালেঞ্জের মুখে তারা তখন প্রভাব হারাচ্ছিল।
ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক প্লুটার্কের বর্ণনা অনুযায়ী, পিরেয়াস বন্দরে একজন 'আগন্তুক' এক নাপিতের দোকানে বসে এমনভাবে আলোচনা শুরু করেন যেন অ্যাথেন্সের মানুষ সিসিলির সামরিক বিপর্যয়ের কথা আগে থেকেই জানে। সুদূর সিসিলিতে এই সামরিক বিপর্যয়ের খবর শুনে স্তম্ভিত নাপিত অ্যাথেন্সের 'উচ্চ নগরের' দিকে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে থাকেন, যেখানে এই সংবাদ 'আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা' ছড়িয়ে দেয়।
সেই আগন্তুক অ্যাথেন্সের সাম্রাজ্যিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক বিপর্যয়ের বর্ণনা দিয়েছিলেন। এর দুই বছর আগে, দীর্ঘস্থায়ী পেলোপোনেসীয় যুদ্ধের মাঝে আভিজাত্যপূর্ণ নিসিয়াস—একজন নির্বিকার ও সিদ্ধান্তহীন নেতা যিনি তার উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ ব্যবহার করে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জনমন জয় করতেন—অ্যাথেন্সের নাগরিকদের প্ররোচিত করেছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বী সাম্রাজ্য স্পার্টার ওপর একটি সাহসী আঘাত হানতে। লক্ষ্য ছিল সিসিলির সিরাকিউসে স্পার্টার মিত্রদের আক্রমণ করে শত্রুকে পঙ্গু করা, সম্পদ দখল করা এবং অ্যাথেন্সের হারানো আধিপত্য পুনরুদ্ধার করা।
তবে বিজয়ের পরিবর্তে অ্যাথেন্সের ২০০টি জাহাজ এবং প্রায় ১২,০০০ সৈন্যের বিশাল বহর এক বিধ্বংসী পরাজয়ের সম্মুখীন হয়। শুধু যে নৌবহরটি ধ্বংস হয়েছিল তা-ই নয় (যার প্রধান কারণ ছিল নিসিয়াস একজন 'অযোগ্য সামরিক কমান্ডার' প্রমাণিত হয়েছিলেন), বরং তার জীবিত সৈন্যদের বন্দী করা হয়, পাথর কোয়ারিতে অনাহারে রাখা হয় এবং দাস হিসেবে বিক্রি করা হয়। অ্যাথেন্স সেই ধাক্কা আর কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
এক দশকের মধ্যেই ডারডানেলেস প্রণালির একটি নৌ-চোকপয়েন্ট বা কৌশলগত পথে স্পার্টার দুর্ভেদ্য অবরোধের ফলে শহরটি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। অ্যাথেন্স তার সাম্রাজ্য হারায় এবং স্পার্টাপন্থী অভিজাততন্ত্রের স্বৈরাচারী শাসনের অধীনে চলে যায়।
মরক্কোতে পর্তুগালের বিপর্যয়
আমাদের পরবর্তী সময়টি ১৫৭৮ সাল। স্থান পর্তুগাল, একটি লাভজনক সাম্রাজ্যের কেন্দ্র যা কয়েক দশক ধরে ভারত মহাসাগরজুড়ে বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু এখন তাদের আধিপত্য ওসমানীয় সাম্রাজ্যের মিত্র মুসলিম বণিক শাহজাদাদের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
এর রাজধানী লিসবনে জেদি তরুণ রাজা সেবাস্তিয়ান যৌন অক্ষমতা এবং উগ্র মেজাজের কারণে একজন কট্টরপন্থী 'খ্রিস্টের সেনাপতি'তে পরিণত হয়েছিলেন। ইসলামের বিরুদ্ধে তার দেশের বিশ্বব্যাপী যুদ্ধে এক প্রাণঘাতী আঘাত হানার ধারণা নিয়ে এই তরুণ রাজা তার দেশের অভিজাতদের ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে মরক্কোর এক ক্রুসেডে তাকে অনুসরণ করতে রাজি করান।
সেখানে আলকাসার কুইবিরের সেই ভাগ্যনির্ধারিত যুদ্ধে পর্তুগালের সেনাবাহিনী স্থানীয় মুসলিম বাহিনীর কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। প্রায় ৮,০০০ পর্তুগিজ সৈন্য নিহত হয়, ১৫,০০০ বন্দী হয় এবং মাত্র ১০০ জন পালিয়ে বাঁচতে সক্ষম হয়।
এই পরাজয় এতটাই বিধ্বংসী ছিল যে এটি শুধু রাজা এবং তার দরবারকেই ধ্বংস করেনি, বরং পরবর্তী ৬০ বছরের জন্য পর্তুগালকে স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পথ প্রশস্ত করে দেয়। এই বিপর্যয়ের পর গোয়ার 'পর্তুগিজ এস্তাদো দা ইন্ডিয়া' (পর্তুগিজ ভারত রাষ্ট্র) যে কোনো জাহাজের ক্যাপ্টেনের কাছে পারমিট বিক্রি করতে বাধ্য হয়—সে হিন্দু, মুসলিম বা খ্রিস্টান যাই হোক না কেন। ভারত মহাসাগর থেকে পর্তুগিজ বাণিজ্যিক আধিপত্য অপসারিত হওয়ায় মুসলিম বণিক ও তীর্থযাত্রীরা আবারও বাধাহীনভাবে চলাচল করতে শুরু করে।
যদিও পর্তুগিজ সাম্রাজ্য আরও তিন শতাব্দী টিকে ছিল, কিন্তু তারা সেই বাণিজ্যিক আধিপত্য আর কখনোই পুনরুদ্ধার করতে পারেনি—যা একসময় তাদের ইন্দোনেশিয়ার মশলার দ্বীপগুলো থেকে ভারত মহাসাগর এবং দক্ষিণ আটলান্টিক হয়ে ব্রাজিলের উপকূল পর্যন্ত বিশ্বের সমুদ্রপথগুলোতে আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছিল।
অ্যাটলাস পর্বতমালায় স্পেনের বিপর্যয়
এখন কয়েক শতাব্দী পরে আসা যাক সাম্রাজ্যিক বিপর্যয়ের আরেক গুরুত্বপূর্ণ বছর ১৯২০-এ। স্থান মাদ্রিদ, যেখানে স্পেনের নেতারা তাদের দেশের দীর্ঘ সাম্রাজ্যিক পতনের মনস্তাত্ত্বিক চাপে আগে থেকেই বিপর্যস্ত ছিলেন। ১৮৯৮ সালের স্পেন-আমেরিকান যুদ্ধে ক্রমবর্ধমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কিউবা, পুয়ের্তো রিকো এবং ফিলিপাইনের মতো শেষ উপনিবেশগুলো হারানোর ফলে সেই পতনের চূড়ান্ত রূপ দেখা গিয়েছিল।
আরও ঔপনিবেশিক বিজয়ের মাধ্যমে পুনরুত্থান চেয়ে স্পেনের রক্ষণশীল নেতারা আমেরিকার কাছে সেই মনোবল ভাঙা পরাজয়ের প্রতিক্রিয়ায় উত্তর মরক্কোর তাদের ছোট উপকূলীয় এলাকাগুলোকে প্রসারিত করে পুরো অঞ্চল এবং সেখানকার শুষ্ক অ্যাটলাস পর্বতমালায় একটি আশ্রিত রাজ্য বা 'প্রটেক্টরেট' স্থাপনের চেষ্টা করেন।
স্পেনের অযোগ্য সম্রাট ত্রয়োদশ আলফনসো, যিনি সৈন্য-সৈন্য খেলা পছন্দ করতেন, তিনি সামরিক অনুগতদের একটি গোষ্ঠী তৈরি করেছিলেন যারা হারানো সাম্রাজ্যিক গৌরব পুনরুদ্ধারের নেশায় আচ্ছন্ন ছিলেন। ১৯২০ সালের রক্তক্ষয়ী 'রিফ যুদ্ধে' স্প্যানিশ শাসনের বিরুদ্ধে বারবার মুসলিমদের প্রতিরোধ তীব্রতর হলে, রাজার প্রিয় এক জেনারেল তার সৈন্যদের এক চূরান্ত লড়াইয়ে নিয়ে যান, যেখানে বারবার যোদ্ধারা তাদের প্রায় ১২,০০০ সৈন্যকে হত্যা করে।
তা সত্ত্বেও রাজা ও তার সামরিক ঘনিষ্ঠদের প্রভাবে স্পেন মরিয়া হয়ে সেই অলাভজনক মরক্কোর পর্বতগুলো আঁকড়ে ধরে রাখে। স্পেন সেখানে আরও ১,২৫,০০০ সৈন্য পাঠিয়েছিল, যার মধ্যে ছিল তাদের ফরেন লিজিয়ন। এর নেতৃত্বে ছিলেন সেই ব্যক্তি যিনি ১৯৩০-এর দশকে ফ্যাসিবাদী স্পেনের নেতা হয়েছিলেন—ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কো। দীর্ঘস্থায়ী সেই দমন অভিযানে গণহারে হত্যা এবং সামরিক উদ্ভাবন—উভয়ই দেখা গিয়েছিল।
অর্থনৈতিক ও কৌশলগত যুক্তিকে উপেক্ষা করে বিজয়ের এক মরিয়া সন্ধানে স্পেন প্রায় ৪০০ মেট্রিক টন প্রাণঘাতী মাস্টার্ড গ্যাস তৈরি করে ইতিহাসের প্রথম বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার করে বিমান হামলা চালায় এবং বারবার গ্রামগুলোর ওপর গণমৃত্যু নামিয়ে আনে।
সামরিক ইতিহাসের প্রথম সফল উভচর অভিযানে স্প্যানিশ নৌবাহিনী ১৯২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আল হোসিমা উপসাগরে ১৮,০০০ সৈন্য এবং এক স্কোয়াড্রন হালকা ট্যাংক অবতরণ করায় বারবার গেরিলাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে এবং শীঘ্রই তাদের পরাজিত করে।
তবে এই ধরনের 'ক্ষুদ্র-সামরিকবাদ' স্পেনকে শুধু যে ক্রমবর্ধমান ব্যয়, ভারী হতাহত এবং গণ-নৃশংসতায় ভরা দীর্ঘস্থায়ী অভিযানে নিমজ্জিত করেছিল তা নয়, বরং এমন রাজনৈতিক শক্তির জন্ম দিয়েছিল যা তাদের ধুঁকতে থাকা গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে দেয়।
জনসাধারণ যখন সেই ভ্রান্ত যুদ্ধের প্রতিবাদ করছিল, তখন রাজা আলফনসো তার এক সামরিক প্রিয়ভাজন জেনারেল প্রিমো দে রিভেরাকে সমর্থন দেন এক দশকের একনায়কতন্ত্র চাপিয়ে দিতে, যা শেষ পর্যন্ত স্বল্পস্থায়ী দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের পথ করে দেয়।
যাইহোক, ১৯৩৬ সালে রিফ যুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র এক দশক পরে জেনারেল ফ্রাঙ্কো মরক্কো থেকে ভূমধ্যসাগরের পাড়ি দিয়ে তার 'আর্মি অব আফ্রিকা' নিয়ে ফিরে এসে স্পেনে গৃহযুদ্ধ শুরু করেন, যা প্রজাতন্ত্রকে পরাজিত করে এবং একটি ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। এই একনায়কতন্ত্র দীর্ঘ ৪০টি দীর্ঘ বছর ধরে দেশটিকে শাসন করে এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতায় নিমজ্জিত করে।
সুয়েজে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্যাস্ত
সাম্রাজ্যিক পতনের কথা বলতে গেলে সম্ভবত সবচেয়ে অর্থবহ বছরটি হলো ১৯৫৬।
স্থান লন্ডন, একসময়ের গর্বিত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কেন্দ্র। একটি বেদনাদায়ক ও দীর্ঘায়িত বৈশ্বিক সাম্রাজ্যিক পিছুটানের দমবন্ধ করা চাপ ব্রিটিশ রক্ষণশীলদের মিশরের সুয়েজ খালে একটি বিপর্যয়কর ক্ষুদ্র-সামরিক হস্তক্ষেপে প্ররোচিত করেছিল। একজন ব্রিটিশ কূটনীতিকের ভাষায় যা ছিল "ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মৃত্যু-খিঁচুনি"।
১৯৫৬ সালের জুলাই মাসে মিশরের দূরদর্শী নেতা প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করেন। এর মাধ্যমে সেখানে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে, যা আরব বিশ্বকে উদ্বেলিত করে এবং নাসেরকে বিশ্বের প্রথম সারির নেতাদের কাতারে নিয়ে যায়।
যদিও ব্রিটিশ জাহাজগুলো তখনও খালের মধ্য দিয়ে অবাধে চলাচল করতে পারত, কিন্তু দেশটির রক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি ইডেন—যিনি একজন অহংকারী অভিজাত এবং সাম্রাজ্যের একনিষ্ঠ রক্ষক ছিলেন—নাসেরের এই দৃঢ় জাতীয়তাবাদে গভীরভাবে বিচলিত, এমনকি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে সংকটের সময় তার নেতৃত্ব এতটাই ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছিল যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন যে "ইডেন উন্মাদ হয়ে গেছেন।"
খাল জাতীয়করণের খবর শুনে উত্তেজিত ইডেন তৎক্ষণাৎ ভোর ৪টায় যুদ্ধ পরিষদের সভা ডাকেন। নাসেরকে ইতালির প্রাক্তন ফ্যাসিবাদী শাসক মুসোলিনির সঙ্গে তুলনা করে তিনি তাকে "অপসারণের" নির্দেশ দেন এবং বলেন যে "মিশরে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলেও আমার কিছু যায় আসে না।"
নিজের মনোভাব পরিষ্কার করে ইডেন তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করেন: "নাসেরকে আলাদা করা বা 'নিরপেক্ষ' করার এই সব আজেবাজে কথা কী?" এরপর তিনি তীক্ষ্ণভাবে যোগ করেন: "আমি তাকে ধ্বংস করতে চাই, আপনি কি বুঝতে পারছেন না? আমি তাকে খুন করতে চাই।"
ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-৬ নাসেরকে হত্যার একাধিক চেষ্টায় ব্যর্থ হওয়ায়—ইডেনের সরকার ফরাসি ও ইসরায়েলিদের সঙ্গে মিলে সুয়েজ খাল অঞ্চলে একটি গোপন, দুই ধাপের আগ্রাসনের পরিকল্পনা শুরু করে।
২৯ অক্টোবর চৌকস জেনারেল মোশে দয়ানের নেতৃত্বে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সিনাই উপদ্বীপজুড়ে অভিযান চালায়, মিশরের ট্যাংক ধ্বংস করে এবং তার সৈন্যদের খালের ১০ মাইলের মধ্যে নিয়ে আসে। সেই যুদ্ধকে হস্তক্ষেপের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে (তথাকথিত শান্তি পুনরুদ্ধারের জন্য), মাত্র তিন দিনে ছয়টি ব্রিটিশ-ফরাসি বিমানবাহী রণতরীর বহর মিশরীয় বিমান বাহিনীকে চুরমার করে দেয় এবং তাদের ১০৪টি নতুন সোভিয়েত মিগ ফাইটার জেট এবং আরও ১৩০টি বিমান ধ্বংস করে।
মিশরের কৌশলগত শক্তি ধ্বংস হওয়ায় এবং সেই সাম্রাজ্যিক দানবীয় শক্তির সামনে তাদের সামরিক বাহিনী কার্যত অসহায় হয়ে পড়ে। নাসের তখন অত্যন্ত সহজ কিন্তু চমৎকার একটি ভূ-রাজনৈতিক কৌশল প্রয়োগ করেন। তিনি পাথরে ভরা কয়েক ডজন পুরনো কার্গো জাহাজ সুয়েজ খালের উত্তর প্রবেশপথে ডুবিয়ে দেন। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম প্রধান সামুদ্রিক চোকপয়েন্টটি দ্রুত বন্ধ হয়ে যায় এবং পারস্য উপসাগর থেকে ইউরোপের তেলের জীবনরেখা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
৬ নভেম্বর যখন ২২,০০০ ব্রিটিশ ও ফরাসি সৈন্য খালের উত্তর প্রান্তে অবতরণ শুরু করে, তখন জাহাজ চলাচল অবাধ করার তাদের মূল লক্ষ্যটি ততক্ষণে তাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
সেই ক্ষুদ্র-সামরিক বিপর্যয় শেষে ব্রিটেন জাতিসংঘ কর্তৃক তিরস্কৃত হয়; চরম ধস থেকে বাঁচতে দেশটির মুদ্রাকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বেইলআউটের প্রয়োজন পড়ে; তাদের সাম্রাজ্যিক আভিজাত্যের আভা উবে যায় এবং একসময়ের শক্তিশালী ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিলুপ্তির পথে যাত্রা করে।
ফিরে তাকালে দেখা যায়, সুয়েজ সংকট কেবল ব্রিটিশ ক্ষমতার পূর্ণাঙ্গ পতনকেই উন্মোচিত করেনি, বরং বিশ্বকে দেখিয়েছিল যে দেশটির ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল এস্টাবলিশমেন্ট তাদের সাম্রাজ্যিক ও বর্ণগত শ্রেষ্ঠত্বের বিভ্রম নিয়ে আর বৈশ্বিক নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য নয়।
হরমুজ প্রণালিতে আমেরিকার পরাজয়
সাম্রাজ্যিক পতনের ইতিহাসে আরেকটি তারিখ সম্ভবত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রমাণিত হতে যাচ্ছে—২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। ইতিহাসে হয়তো তা লেখা হবে এভাবেই- স্থান ওয়াশিংটন ডিসি, যা একসময় মানব ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যিক রাষ্ট্রের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। যারা সামরিক জোট, নিপুণ কূটনীতি এবং অর্থনৈতিক নেতৃত্বের সংমিশ্রণে প্রায় ৮০ বছর ধরে বিশ্বের বেশিরভাগ অংশ শাসন করেছিল।
তবে ততদিনে তার ক্ষমতার কাঠামোতে স্পষ্ট ফাটল দেখা দিতে শুরু করেছিল। মার্কিন বৈশ্বিক আধিপত্য চীনের কাছ থেকে ক্রমেই শক্তিশালী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছিল, তার বিশাল সামরিক বাহিনী আফগানিস্তান ও ইরাকে দুটি ভয়াবহ পরাজয় বরণ করেছিল এবং তার অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন দেশের অভ্যন্তরে এক ক্ষুব্ধ পপুলিজম বা জনতোষণবাদের জন্ম দিয়েছিল।
শ্রমজীবী শ্রেণির সমৃদ্ধি এবং আমেরিকার বৈশ্বিক ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে, এক পপুলিস্ট প্রচারণার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি "আমেরিকার স্বর্ণযুগ" এবং "জাতীয় সাফল্যের এক রোমাঞ্চকর নতুন যুগের" প্রতিশ্রুতি দেন, যেখানে দেশটি "পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ, সবচেয়ে শক্তিশালী, সবচেয়ে সম্মানিত জাতি হিসেবে তার প্রাপ্য স্থান পুনরুদ্ধার করবে এবং সমগ্র বিশ্বের বিস্ময় ও প্রশংসা অর্জন করবে।"
নিজে সম্পদ ও প্রতিপত্তির মধ্যে জন্ম নেওয়া ট্রাম্প তার নেতৃত্বের অনন্য 'প্রতিভা' এবং এই বিশ্বাস নিয়ে ক্ষমতায় ফেরেন যে "আমেরিকাকে আবারও মহান করার জন্য ঈশ্বর আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।"
বন্ধু ও শত্রু নির্বাহে সবার কাছ থেকে আনুগত্য আদায়ে নগ্ন অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি ব্যবহার করে এবং ঐশ্বরিক মিশনের এক বিভ্রম থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রেসিডেন্ট বিশ্বকে তার ইচ্ছানুসারে বাঁকানোর চেষ্টা শুরু করেন।
কিন্তু তার মেয়াদের প্রথম বছরে কোনো কিছুই পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করেনি। প্রকৃতপক্ষে তার বেশিরভাগ উদ্যোগ এমন নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছিল যা কেবল এটিই প্রমাণ করেছিল যে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমেরিকা যে একমাত্র পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল, সেই অবস্থান থেকে দেশটি কত নিচে নেমে গেছে।
২ এপ্রিল, ২০২৫ তারিখে যেটিকে তিনি "মুক্তি দিবস" বলেছিলেন, ট্রাম্প দেশীয় উৎপাদন রক্ষার জন্য প্রধানত চীন থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক ঘোষণা করেন। প্রাথমিকভাবে এটি ছিল ৩৪ শতাংশ—যা পরে বাড়িয়ে ১০০ শতাংশ করা হয়। কিন্তু ২০২৫ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় এক বৈঠকে চীনের নেতা শি জিনপিং ট্রাম্পকে পিছু হটতে বাধ্য করেন। শি জিনপিং আমেরিকার জন্য চীনের কৌশলগত বিরল খনিজ উপাদানের ভাণ্ডারে প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেন।
জানুয়ারিতে শুল্ক উদ্যোগের জৌলুস কমতে থাকায় ট্রাম্প ন্যাটো জোটকে সংকটে ফেলেন। তিনি ডেনমার্কের কাছে গ্রিনল্যান্ড দ্বীপটি দাবি করেন এবং হুমকি দেন যে তারা রাজি না হলে ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করা হবে। তবে এক সপ্তাহের মধ্যে ইউরোপীয়দের তীব্র প্রতিরোধের মুখে দাভোস অর্থনৈতিক সম্মেলনে তিনি সেই হুমকি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন এবং দাবি করেন যে ন্যাটোর দেওয়া একটি "ভবিষ্যৎ চুক্তির রূপরেখায়" তিনি সন্তুষ্ট।
২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে তার শুল্ক উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়া এবং গ্রিনল্যান্ড কৌশল নস্যাৎ হওয়ার পর ট্রাম্প ইরানের ওপর একটি সাহসী বলে মনে হওয়া হামলায় ইসরায়েলের সঙ্গে যোগ দেন। এটি শীঘ্রই সেই ধরনের মারাত্মক 'ক্ষুদ্র-সামরিক' কৌশলের রূপ নেয় যা পতনোন্মুখ সাম্রাজ্যগুলোর ক্ষেত্রে ঘটে থাকে।
যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিনে মার্কিন ও ইসরায়েলি বোমা হামলায় ইরানের নেতৃত্ব নিহত হয়, তাদের নৌবাহিনী ধ্বংস হয় এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নির্মূল হয়ে যায়। মনে হচ্ছিল দেশটি আমেরিকার বিমান শক্তির দানবীয় শক্তির সামনে কার্যত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে।
এক সপ্তাহের বিধ্বংসী বোমা হামলার পর যা তার প্রাণঘাতী ও নির্ভুল লক্ষ্যভেদী ক্ষমতার মাধ্যমে বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল, ৬ মার্চ ট্রাম্প দাবি করেন যে ইরানকে "বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ" করতে হবে এবং "একজন মহান ও গ্রহণযোগ্য নেতা" নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের পরাজয় মেনে নিতে হবে। বিনিময়ে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে যুক্তরাষ্ট্র "ইরানকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরিয়ে আনতে অক্লান্ত পরিশ্রম করবে।"
কিন্তু ১৯৫৬ সালে নাসের সুয়েজে যা করেছিলেন, ইরানের নেতৃত্ব অনেকটা তেমনই কাজ করে যুদ্ধের ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য পাল্টে দেন। তারা হরমুজ প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সরু পথটি বন্ধ করে দেন। যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহে ড্রোনের মাধ্যমে পাঁচটি মালবাহী জাহাজে হামলা চালিয়ে ইরানের নেতারা নাসেরের ভূ-রাজনৈতিক রণকৌশল অনুসরণ করেন। তারা কার্যকরভাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচল বন্ধ করে দেন, যার ফলে গ্যাস, সার এবং তেলের সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব জ্বালানি সংকট তৈরি হয়। মার্চের শেষ নাগাদ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ এতটাই জোরালো ছিল যে তারা জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিতে 'টোল' আদায় শুরু করে।
হরমুজের এই অপ্রত্যাশিত অথচ পুরোপুরি অনুমানযোগ্য বন্ধে বিভ্রান্ত হয়ে ৫ এপ্রিল ইস্টার রবিবারে বিচলিত ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি বার্তা পোস্ট করেন: "মঙ্গলবার হবে ইরানে পাওয়ার প্ল্যান্ট ডে এবং ব্রিজ ডে—সব এক সঙ্গে। এমন কিছু আর কখনও দেখা যাবে না!!!"
তিনি আরও যোগ করেন: "প্রণালিটি খুলে দাও উন্মাদ শয়তানের দল, তা না হলে তোমরা নরকে বাস করবে—শুধু দেখ। আলহামদুলিল্লাহ।" দুই দিন পর ট্রাম্প হুমকি দেন যে ইরান যদি হরমুজ প্রণালি খুলে না দেয়, তবে তিনি তাদের বেসামরিক অবকাঠামোতে এমন ভয়াবহ হামলা চালাবেন যে "আজ রাতে একটি আস্ত সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে, যা আর কখনও ফিরে আসবে না।"
পরবর্তীতে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ১২ এপ্রিল ট্রাম্প ইরানের চোরাবালিতে আরও গভীরভাবে নিমজ্জিত হন। তিনি মার্কিন নৌবাহিনীকে আদেশ দেন "হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের বা বের হওয়ার চেষ্টা করা যে কোনো এবং সব জাহাজ অবরোধ করার প্রক্রিয়া শুরু করতে" এবং "আন্তর্জাতিক জলসীমায় যে জাহাজই ইরানকে টোল দিয়েছে সেটিকে বাধা প্রদান করতে।" তার স্বভাবসুলভ আস্ফালনের সঙ্গে তিনি যোগ করেন: "আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত এবং আমাদের সামরিক বাহিনী ইরানের যা অবশিষ্ট আছে তা শেষ করে দেবে!"
ট্রাম্প ইরানের অবকাঠামো ধ্বংস করলেও বা শেষ পর্যন্ত কোনো মানরক্ষাকারী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারলেও প্রকৃতপক্ষে ওয়াশিংটন ইতোমধ্যেই ইরানের কাছে এই যুদ্ধে হেরে গেছে। অসম যুদ্ধের অন্য সব দুর্বল শক্তির মতো তেহরানও ক্রমাগত আঘাত সইতে রাজি ছিল এবং তার বিনিময়ে আক্রমণকারী শক্তি সহ্য করতে পারে না এমন ক্ষতি তারা করতে পেরেছে।
শিগগিরই ওয়াশিংটন তেহরানে আঘাত করার মতো লক্ষ্যবস্তু হারিয়ে ফেলবে, কিন্তু পারস্য উপসাগরের দক্ষিণ তীরে গড়ে ওঠা বিস্তৃত এবং অরক্ষিত পেট্রোলিয়াম অবকাঠামোতে ধ্বংসলীলা চালানোর মতো অগণিত সস্তা ড্রোন ইরানের হাতে রয়েছে।
১৯৫৬ সালে সুয়েজে ব্রিটেনের মতো ওয়াশিংটনকেও সম্ভবত হরমুজ প্রণালিতে তার 'ক্ষুদ্র-সামরিকবাদের' জন্য ভারী মূল্য দিতে হবে। ঘনিষ্ঠ মিত্ররা—যারা ৮০ বছর ধরে মার্কিন বৈশ্বিক ক্ষমতার ভিত্তি ছিল—তারা ওয়াশিংটনের এই নিজে থেকে বেছে নেওয়া যুদ্ধে কোনো সামরিক সহায়তা দিতে অস্বীকার করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প তাদের "কাপুরুষ" বলে গালি দিয়েছেন।
বেসামরিক মানুষ ও সভ্যতা ধ্বংসের হুমকির (যা যুদ্ধাপরাধের শামিল) প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বনেতারা ট্রাম্পের নিন্দা জানিয়েছেন। বিশ্ব পুঁজিবাদের কেন্দ্রস্থলে থাকা একটি অঞ্চলে যুদ্ধের ঝুঁকি সম্পর্কে উদাসীন ওয়াশিংটন এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য আরও বিপজ্জনকভাবে বিঘ্নকারী হিসেবে প্রমাণিত হচ্ছে। এর ফলে বিশ্ব নেতৃত্বের জন্য চীনকে অনেক বেশি স্থিতিশীল পছন্দ হিসেবে মনে হচ্ছে। তা ছাড়া মার্কিন সামরিক বাহিনী লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসে তাদের কৌশলগত ক্ষিপ্রতা প্রমাণ করলেও তারা স্পষ্টতই আর কোনো অর্থবহ কৌশলগত উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারছে না।
জোটগুলো ছিন্নভিন্ন হওয়া, বিশ্ব নেতৃত্ব হাতছাড়া হওয়া এবং সামরিক শক্তির আভা উবে যাওয়ার ফলে মার্কিন বৈশ্বিক আধিপত্যের একমাত্র পথ এখন মনে হচ্ছে কেবলই নিম্নগামী (অতীতের অনেক বড় শক্তির মতো)।
হরমুজ প্রণালিতে ট্রাম্পের এই ক্ষুদ্র-সামরিক দুঃসাহসিকতা যখন শেষ হবে, ততদিনে মার্কিন বৈশ্বিক ক্ষমতার পতন মারাত্মকভাবে ত্বরান্বিত হবে। এবং বিশ্ব তখন পুরনো 'প্যাক্স আমেরিকানা' ছাড়িয়ে এক নতুন এবং অনিশ্চিত বৈশ্বিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে।
লেখক: আলফ্রেড ডব্লিউ. ম্যাককয়— উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক এবং "ইন দ্য শ্যাডোস অব দ্য আমেরিকান সেঞ্চুরি: দ্য রাইজ অ্যান্ড ডিক্লাইন অব ইউ.এস. গ্লোবাল পাওয়ার" গ্রন্থের লেখক। তার আগের বইগুলোর মধ্যে রয়েছে: "টর্চার অ্যান্ড ইমপিউনিটি: দ্য ইউ.এস. ডকট্রিন অব কোয়ারসিভ ইন্টারোগেশন", "এ কোশ্চেন অব টর্চার: সিআইএ ইন্টারোগেশন, ফ্রম দ্য কোল্ড ওয়ার টু দ্য ওয়ার অন টেরর", এবং "দ্য পলিটিক্স অব হেরোইন: সিআইএ কমপ্লিসিটি ইন দ্য গ্লোবাল ড্রাগ ট্রেড"।
