ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কী? কত দ্রুত পারমাণবিক বোমা বানাতে পারবে ইরান?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে যে নতুন পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে, তা ২০১৫ সালের চুক্তির চেয়ে 'অনেক ভালো' হবে। ২০১৮ সালে নিজের প্রথম মেয়াদে ওই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিয়েছিলেন ট্রাম্প।
মঙ্গলবার ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও বাড়িয়েছেন ট্রাম্প। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনা শুরুর আশায় যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার এক দিন আগে এই সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দাবিগুলোর একটি হলো—ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।
অন্যদিকে ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধুই বেসামরিক কাজে ব্যবহৃত হয়, বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য। আর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইউরেনিয়ামকে ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করলেই চলে। কিন্তু পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে হলে ইউরেনিয়ামকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করতে হয়।
ইউরেনিয়াম কী এবং কাদের কাছে আছে?
ইউরেনিয়াম হলো একটি ভারী ধাতু, যা পারমাণবিক চুল্লি ও অস্ত্রের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি প্রাকৃতিকভাবেই তেজস্ক্রিয় এবং পাথর, মাটি, এমনকি সমুদ্রের পানিতেও খুব সামান্য পরিমাণে পাওয়া যায়। বিশ্বের মোট ইউরেনিয়ামের প্রায় ৯০ শতাংশই মাত্র পাঁচটি দেশে উৎপাদিত হয়: কাজাখস্তান, কানাডা, নামিবিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও উজবেকিস্তান। তবে অন্যান্য দেশেও এর মজুত পাওয়া গেছে।
মাটি খুঁড়ে বা রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পাথর থেকে গলিয়ে ইউরেনিয়াম সংগ্রহ করা হয়। পারমাণবিক জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের আগে এটিকে কয়েকটি ধাপে প্রক্রিয়াজাত করা হয়—ক) ইয়েলোকেক: খনি থেকে তোলা আকরিক ভেঙে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় একটি গুঁড়ো পাউডার তৈরি করা হয়, যাকে ইয়েলোকেক বা হলুদ কেক বলা হয়। তবে এটি সাধারণত গাঢ় সবুজ বা কালচে রঙের হয়। খ) সবুজ লবণ: এরপর ইয়েলোকেকের সঙ্গে হাইড্রোজেন ফ্লোরাইড গ্যাস মেশানো হয়, যা এটিকে সবুজ রঙের ক্রিস্টালে পরিণত করে। একে ইউরেনিয়াম টেট্রাফ্লোরাইড বা সবুজ লবণ বলা হয়। গ) ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লোরাইড: এই সবুজ লবণকে আরও প্রক্রিয়াজাত করে সাদা রঙের ক্রিস্টাল (ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লোরাইড) তৈরি করা হয়। সামান্য তাপ দিলেই এটি গ্যাসে পরিণত হয়। এই অবস্থায় এটি সমৃদ্ধকরণের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। ঘ) ইউরেনিয়াম ডাই-অক্সাইড: এই গ্যাসকে সেন্ট্রিফিউজ মেশিনে ঘোরানো হয়, যা রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় এটিকে সূক্ষ্ম ও কালো রঙের পাউডারে পরিণত করে। ঙ) জ্বালানি প্যালেট: ওই পাউডারকে চাপ দিয়ে কালো রঙের সিরামিকের ছোট টুকরো বা 'পেলেট' তৈরি করা হয়। এই পেলেটগুলোই সরাসরি পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
কীভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা হয়?
প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামের তিনটি ধরন বা আইসোটোপ রয়েছে। এগুলোতে প্রোটনের সংখ্যা সমান হলেও নিউট্রনের সংখ্যা ভিন্ন থাকে।
প্রকৃতিতে পাওয়া ইউরেনিয়ামের প্রায় ৯৯ দশমিক ৩ শতাংশই হলো 'ইউ-২৩৮'। এটি সবচেয়ে ভারী এবং কম তেজস্ক্রিয়। অন্যদিকে 'ইউ-২৩৫' রয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ এবং 'ইউ-২৩৪' রয়েছে শূন্য দশমিক ০০৫ শতাংশ।
শক্তি উৎপাদনের জন্য বিজ্ঞানীরা ভারী ইউ-২৩৮ থেকে হালকা ও বেশি তেজস্ক্রিয় ইউ-২৩৫-কে আলাদা করেন। এই আলাদা করার প্রক্রিয়াই হলো 'ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ' বা এনরিচমেন্ট।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে প্রথমে এটিকে ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লোরাইড গ্যাসে পরিণত করা হয়। এরপর এই গ্যাস সেন্ট্রিফিউজ নামের লম্বা সিলিন্ডারে ঢোকানো হয়, যা প্রচণ্ড বেগে ঘোরে (সাধারণত প্রতি সেকেন্ডে এক হাজার বারের বেশি)। এই ঘোরার কারণে ভারী ইউ-২৩৮ সিলিন্ডারের ছিটকে যায় এবং হালকা ইউ-২৩৫ মাঝখানে জমা হয়। এখান থেকে সেটি সংগ্রহ করা হয়।
একটি সেন্ট্রিফিউজে খুব সামান্য পরিমাণ ইউরেনিয়ামই আলাদা করা যায়। তাই কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাতে এই প্রক্রিয়াটি সারিবদ্ধভাবে সাজানো অনেকগুলো সেন্ট্রিফিউজের (যাকে ক্যাসকেড বলা হয়) ভেতর দিয়ে বারবার চালানো হয়।
সমৃদ্ধকরণের বিভিন্ন মাত্রা
ইউ-২৩৫ এর হার যত বেশি হবে, ইউরেনিয়াম তত বেশি সমৃদ্ধ হিসেবে ধরা হয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ৩ থেকে ৫ শতাংশ সমৃদ্ধকরণই যথেষ্ট। কিন্তু পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য এটি প্রায় ৯০ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ২০ শতাংশের নিচে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে 'লো-এনরিচড ইউরেনিয়াম' এবং ২০ শতাংশের বেশি হলে তাকে 'হাইলি-এনরিচড ইউরেনিয়াম' হিসেবে বিবেচনা করে—ক) কমার্শিয়াল গ্রেড (৩-৫%): বিশ্বের বেশির ভাগ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাধারণ জ্বালানি। খ) স্মল মডিউলার রিঅ্যাক্টর (৫-১৯.৯%): অপেক্ষাকৃত আধুনিক পারমাণবিক চুল্লি এবং উন্নত গবেষণার কাজে ব্যবহৃত চুল্লিগুলোতে এটি ব্যবহৃত হয়।গ) রিসার্চ গ্রেড (২০-৮৫%): চিকিৎসায় ব্যবহৃত আইসোটোপ তৈরি বা গবেষণায় ব্যবহৃত হয়। ঘ) ওয়েপনস গ্রেড (৯০% বা তার বেশি): পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য এই মাত্রা প্রয়োজন। ঙ) নেভাল গ্রেড (৯৩-৯৭%): সাবমেরিন ও যুদ্ধজাহাজের পারমাণবিক চুল্লিতে ব্যবহৃত হয়।
সমৃদ্ধ করতে কত সময় লাগে?
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার প্রক্রিয়াটি একদম সোজাসাপটা নয়। প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামকে (০.৭%) ২০ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যতটা কঠিন, ২০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশে নিয়ে যাওয়া তার চেয়ে অনেক সহজ। ইউরেনিয়াম একবার ৬০ শতাংশে পৌঁছালে, সেখান থেকে ৯০ শতাংশে (অস্ত্র তৈরির মাত্রা) নিয়ে যাওয়া খুব দ্রুত সম্ভব।
এই প্রক্রিয়া পরিমাপ করা হয় 'সেপারেটিভ ওয়ার্ক ইউনিট' বা এসডব্লিউইউ দিয়ে।
আইএইএর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ মাত্রার প্রায় ৪৪০ কেজি (৯৭০ পাউন্ড) সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। এটিকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করা হলে তাত্ত্বিকভাবে তা দিয়ে ১০ বা ১১টি সাধারণ পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব।
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ইমেরিটাস অধ্যাপক টেড পস্তল আল জাজিরাকে জানান, ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আগে ইরানের কাছে অন্তত ১৭৪টি আইআর-৬ সেন্ট্রিফিউজের ১০টি ক্যাসকেড চালু ছিল। অর্থাৎ মোট ১ হাজার ৭৪০টি আইআর-৬ সেন্ট্রিফিউজ কাজ করছিল।
আইআর-৬ হলো ইরানের সবচেয়ে অত্যাধুনিক সেন্ট্রিফিউজগুলোর একটি। এর বাইরে তাদের কাছে হাজার হাজার পুরোনো সেন্ট্রিফিউজও রয়েছে। তবে এগুলো এখন কী অবস্থায় আছে বা ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লোরাইডের কী পরিমাণ মজুত রয়েছে, তা জানা নেই।
অধ্যাপক পস্তলের হিসাব অনুযায়ী, ইরানের এই সেন্ট্রিফিউজ ক্যাসকেডগুলো বছরে ৯০০ থেকে ১ হাজার এসডব্লিউইউ উৎপাদন করতে পারে। তিনি বলেন, 'প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম থেকে ৬০ শতাংশে পৌঁছাতে ইরানের ক্যাসকেডগুলো ব্যবহার করে প্রায় ৫ হাজার এসডব্লিউইউ এবং প্রায় পাঁচ বছর সময় লাগে। কিন্তু আমি যদি ৬০ থেকে ৯০ শতাংশে যেতে চাই, তবে আমার মাত্র ৫০০ এসডব্লিউইউ দরকার। অর্থাৎ, পাঁচ বছরের বদলে, আগে থেকে ৬০ শতাংশ প্রস্তুত থাকায় আমার মাত্র চার বা পাঁচ সপ্তাহ সময় লাগবে।'
ইরানের পক্ষে বোমা বানানো কতটা সহজ?
অধ্যাপক পস্তল জানান, ইরানের ইউরেনিয়ামের মজুত মাটির নিচে রয়েছে। তাই শুধু সামরিক হামলা চালিয়েই এই পারমাণবিক হুমকি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, অস্ত্র তৈরির মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার জন্য একটি সেন্ট্রিফিউজ ক্যাসকেড বসাতে 'একটি ছোট স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টের চেয়ে বেশি জায়গার প্রয়োজন হয় না (প্রায় ৬০ বর্গমিটার বা ৬০০ বর্গফুট)। তাই এটি খুব সহজেই একটি ছোট গবেষণাগারে লুকিয়ে রাখা সম্ভব।'
তিনি আরও বলেন, 'একটি ছোট হাইব্রিড গাড়ি দিয়ে যে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়, তা দিয়েই একসঙ্গে চারটির বেশি ক্যাসকেড চালানো সম্ভব। এর মানে হলো, ইরান অত্যন্ত গোপনে তাদের ৬০ শতাংশ ইউরেনিয়ামকে অস্ত্র তৈরির উপযোগী ধাতুতে রূপান্তর করতে পারে।'
অধ্যাপক পস্তল বলেন, 'ইরান এখন এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে যে কেউ যদি তাদের ওপর পারমাণবিক হামলার কথা ভাবে, তবে তাদের মাথায় রাখতে হবে—হামলার পরও ইরানিরা ওই সুড়ঙ্গের ভেতরে বসে পারমাণবিক বোমা তৈরির চূড়ান্ত ধাপ সম্পন্ন করতে পারে এবং সেই বোমা নিক্ষেপের সক্ষমতাও তাদের আছে। এ ছাড়া ইউরেনিয়াম বোমা ব্যবহারের আগে কোনো পরীক্ষারও প্রয়োজন হয় না।'
কাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র আছে?
ফেডারেশন অফ আমেরিকান সায়েন্টিস্টসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে বিশ্বের নয়টি দেশের কাছে প্রায় ১২ হাজার ১৮৭টি পারমাণবিক ওয়ারহেড (ক্ষেপণাস্ত্রের মাথায় বসানো বিস্ফোরক) রয়েছে। এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই রয়েছে রাশিয়া (৪,৪০০) এবং যুক্তরাষ্ট্রের (৩,৭০০) কাছে।
বিশ্বে কেবল দক্ষিণ আফ্রিকাই স্বেচ্ছায় তাদের পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংস করেছে। অন্যদিকে ধারণা করা হয়, ইসরায়েলের কাছে অন্তত ৯০টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। যদিও তারা এটি কখনো স্বীকার বা অস্বীকার করেনি। এজন্য অবশ্য তাদের কখনো তেমন আন্তর্জাতিক চাপের সম্মুখীন হতে হয়নি।
