ভোটার তালিকা নিয়ে চরম বিতর্কের মাঝে পশ্চিমবঙ্গে ভোট শুরু
ভারতে আজ (বৃহস্পতিবার) গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন শুরু হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে তুমুল লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে। সেখানে প্রথম দফায় ২৯৪টি আসনের মধ্যে ১৫২টিতে ভোট গ্রহণ হবে। এ দফায় ১ হাজার ৪৭৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতাচ্যুত করতে জোর প্রচার চালিয়েছে। একদিকে মমতার তৃণমূল কংগ্রেস চাইছে টানা চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় আসতে, অন্যদিকে বিজেপি কখনো এই রাজ্যে সরকার গড়তে পারেনি। আগামী সপ্তাহে দ্বিতীয় দফার ভোট অনুষ্ঠিত হবে।
ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক
পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের ঠিক আগে ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়া নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে। 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন' বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজ্যের প্রায় ৯০ লাখ ভোটারের (মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ) নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তাদের দাবি, এদের অনেকেই হয় এলাকায় নেই, না হয় মারা গেছেন। এ ছাড়া আরও ২৭ লাখ ভোটারের নাম পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দাবি, ভোটার তালিকা 'পরিষ্কার' করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত বছর বিহারে প্রথম এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই এটি আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের মুখে পড়ে। এখন পর্যন্ত ১৩টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই প্রক্রিয়া চালানো হলেও, শুধু পশ্চিমবঙ্গেই এর সঙ্গে বাড়তি একটি বিশেষ যাচাই-বাছাইয়ের স্তর যুক্ত করা হয়েছে।
তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ায় অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অনেকের দাবি, বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও তাদের নাম কাটা পড়েছে।
প্রধানমন্ত্রী মোদিসহ বিজেপি নেতাদের মন্তব্যে এই উত্তেজনা আরও বেড়েছে। তারা দাবি করেছেন, ভোটার তালিকা 'পরিষ্কারের' মাধ্যমে মূলত 'অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের' বাদ দেওয়া হচ্ছে। তবে তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, এর মাধ্যমে মূলত মুসলমানদের নিশানা করা হচ্ছে। যদিও কর্মকর্তাদের দাবি, অনেক হিন্দু ভোটারের নামও তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।
নজিরবিহীন নিরাপত্তা
পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী সহিংসতার লম্বা ইতিহাস রয়েছে। তাই এবারের নির্বাচনে নিরাপত্তার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। রাজ্যজুড়ে রেকর্ডসংখ্যক প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাচনী জেলাগুলোতে টহল দিচ্ছে বুলেটপ্রুফ গাড়ি।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রথম দফার ভোটের আগে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইসি। মঙ্গলবার থেকে ১৫২টি নির্বাচনী এলাকায় মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা, দিনে বাইকে দুজন আরোহণ এবং রাতে অপ্রয়োজনে বাইক চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া স্বাভাবিক ৪৮ ঘণ্টার বদলে এবার ৯৬ ঘণ্টার জন্য মদ বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী কর্মকর্তা মনোজ কুমার আগরওয়াল জানিয়েছেন, মদ বিক্রির এই বাড়তি নিষেধাজ্ঞার নির্দেশ ইসি দেয়নি।
উল্লেখ্য, নির্বাচনের আগে রাজ্যের ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০টি দোকানে মদ কেনার হার হঠাৎ ৩০ থেকে ২৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে বলে জানান আগরওয়াল।
আগরওয়াল বলেন, 'এত মদ কোথায় গেল, তা কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখছে। ভোটারদের প্রলুব্ধ করতে এই মদ ব্যবহার করা যাবে না। যদি কোনো সরকারি কর্মকর্তার এতে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
ভোটার তালিকা সংশোধন, সরকারি কর্মকর্তাদের বড় ধরনের রদবদল এবং কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দল তৃণমূলের তিক্ততা চরমে পৌঁছেছে।
সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় নজর
আজ মূলত পশ্চিমবঙ্গের উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ-পশ্চিমের আসনগুলোতে ভোট হচ্ছে, যেগুলো তুলনামূলক কম উন্নত। এসব এলাকায় মুসলিম, আদিবাসী এবং নিম্নবর্ণের হিন্দু জনসংখ্যার হার বেশি। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ভারতের ১৭ কোটি ২০ লাখ মুসলমানের প্রায় ১৪ শতাংশই পশ্চিমবঙ্গে বাস করে, যা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যা। রাজ্যের মুসলিম অধ্যুষিত তিন জেলা—মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর ও মালদহে এই দফায় ভোট হচ্ছে।
'যৌক্তিক অসংগতির' কারণে ভোটার তালিকা থেকে যে ২৭ লাখ নাম পর্যালোচনার জন্য রাখা হয়েছে, তার বড় অংশই এসব নির্বাচনী এলাকার।
আগামী ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় ১৪২টি আসনে ভোট হবে। এর বেশির ভাগই রাজধানী কলকাতা এবং দক্ষিণবঙ্গের গাঙ্গেয় সমভূমিতে অবস্থিত। গত তিনটি নির্বাচনে এই অঞ্চল মমতার তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
তামিলনাড়ুতে ত্রিপক্ষীয় লড়াইয়ের আভাস
পশ্চিমবঙ্গের বাইরে তামিলনাড়ুতেও আজ বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। রাজ্যটির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে দুটি আঞ্চলিক দলের আধিপত্য রয়েছে—দ্রাবিড় মুনেত্র কড়গম (ডিএমকে) এবং অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুনেত্র কড়গম (এআইএডিএমকে)। দুটি দলই সামাজিক ন্যায়বিচার আন্দোলনের ফসল।
বর্তমানে রাজ্যটি শাসন করছে এম কে স্টালিনের নেতৃত্বাধীন ডিএমকে। অন্যদিকে এআইএডিএমকে লড়ছে বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধে। তবে এবার তামিল অভিনেতা থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া বিজয়ের নতুন দল 'তামিলাগা ভেট্টি কড়গম' (টিভিকে) নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় ত্রিপক্ষীয় লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
তামিলনাড়ুতে ২৩৪টি আসনে একই সঙ্গে ভোট গ্রহণ হবে। সেখানে মোট ভোটারের সংখ্যা ৫ কোটি ৭০ লাখের বেশি।
আঞ্চলিক পরিচয়, ভাষার প্রতি গর্ব এবং জনকল্যাণমূলক (ওয়েলফেয়ার) রাজনীতির কারণে তামিলনাড়ুতে বিজেপি ঐতিহাসিকভাবে কখনো সুবিধা করতে পারেনি। বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ ভারতে বিস্তার লাভের চেষ্টায় থাকা বিজেপির জন্য সামান্য সাফল্যও অনেক বড় অর্জন হবে।
চলতি মাসে কেরালা, আসাম ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পন্ডিচেরিতেও ভোট গ্রহণ হয়েছে। এসব নির্বাচনকে প্রধানমন্ত্রী মোদির দলের প্রতি জনসমর্থন যাচাইয়ের একটি প্রাথমিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
