ইরান যুদ্ধের ‘মিসাইল হিসাব’: যে সংখ্যাগুলো বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সমরে তেহরানের হাতে থাকা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ একটি কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ইসরায়লের একটি নিরাপত্তা গবেষণা সংস্থা–আলমা রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন সেন্টার-এর হিসাব অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর সময় ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল সংখ্যা ছিল ২,৫০০, যা এখন কমে প্রায় ১,০০০-এ নেমে এসেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, ইরানের মিসাইল শিল্প ও মজুদ প্রায় "সম্পূর্ণ ধ্বংস" হয়ে গেছে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শেষ নাগাদ ইরানের মোট ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ধ্বংস হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এদিকে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা একদিকে মজুদ কমার হিসাব তুলে ধরছেন, অন্যদিকে সতর্ক করছেন যে ২০২৭ সালের মধ্যে ইরান ৮,০০০ ব্যালিস্টিক মিসাইল তৈরি করতে পারে। একই সময়ে রাশিয়া ও চীন মিসাইল আমদানি করতে পারে ইরান, যা তেহরানের প্রকৃত সক্ষমতা নির্ধারণকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইরানি কর্মকর্তারা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করেন না, তবে তারা দাবি করেন, তাদের অস্ত্রভাণ্ডার অক্ষত এবং নিরাপদে ভূগর্ভে সংরক্ষিত রয়েছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারাও নিজেদের গোলাবারুদ বা মিউনিশনের অস্ত্রভাণ্ডার সম্পর্কে সংযত অবস্থান বজায় রেখেছেন।
এদিকে যুদ্ধ পরিচালনায় চাপ বাড়তে থাকায় বাইরের বিভিন্ন বিশ্লেষণ সামনে আসছে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা–পেইন ইনস্টিটিউট-এর মতে, মার্চের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্র তাদের থাড ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধক মিসাইলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ব্যবহার করে ফেলেছে, আর মজুদের এই ঘাটতি ফের পূরণ করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
সরকারি সূত্রগুলোর মতে, ২০২৫ সালের জুনে ইরানে চালানো হামলার সময়েই প্রায় ২৫ শতাংশ ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের মজুদ ব্যবহৃত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। তবে ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘাটতি স্বীকার করলে তেহরান আরও সাহসী হয়ে উঠবে। একইসঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হবে—যা মূলত স্বল্পমেয়াদি, উচ্চমাত্রার সংঘাতের জন্যই তৈরি করা হয়েছে।
আংশিক ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে, ইরানের মিসাইলের প্রকৃত হিসাব নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। আর এই প্রবণতা শুধু মিসাইলের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ নিয়েও বহু বছর ধরে মতবিরোধ রয়েছে, বিশেষ করে তেহরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের সময়সীমা নিয়ে বিভিন্ন পরিসংখ্যান একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক চিত্রই তুলে ধরেছে।
অন্যদিকে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে "পারমাণবিক অস্পষ্টতা" নীতি অনুসরণ করছে। অর্থাৎ, তেল আবিব তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার আছে কি না, তা যেমন স্বীকার করে না, তেমনি তা অস্বীকারও করে না। এর ফলে আন্তর্জাতিক তদারকি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হলেও—সম্ভাব্য হামলা প্রতিরোধে একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বজায় থাকে। এ ক্ষেত্রে ব্রিটিশ পার্লামেন্টসহ বিভিন্ন দেশের অনুমানভিত্তিক তথ্য কিছু ধারণা দিলেও পুরো চিত্রটি স্পষ্ট নয়।
সরকার, বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা বা উন্মুক্ত উৎসের বিশ্লেষকদের দেওয়া অস্ত্রভাণ্ডারের পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর আগে নানা স্তরে ছাঁকা হয়, অনেকসময় তাতে প্রকৃত তথ্যও বিকৃত হয়। এসব তথ্য তখন শত্রুকে ভয় দেখানো, অভ্যন্তরীণ জনমতকে আশ্বস্ত করা, মিত্রদের সমর্থন নিশ্চিত করা কিংবা সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা তুলে ধরতে ব্যবহৃত হয়।
অতএব, এসব সংখ্যা নিরপেক্ষ তথ্য নয়; বরং রাষ্ট্রীয় কৌশলের অংশ, যেখানে অতিরঞ্জন বা নির্বাচিত তথ্য ব্যবহার করে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করা হয়।
অস্ত্র বা গোলাবারুদের পরিসংখ্যানের বিকৃতি: নতুন নয়
সামরিক শক্তি অতিরঞ্জনের ইতিহাস বহু পুরোনো। প্রাচীন রাষ্ট্রগুলোও তাদের সেনাবাহিনী ও অস্ত্রশক্তি বাড়িয়ে দেখাত, যদিও তখনকার তুলনামূলক সরল অস্ত্রব্যবস্থায় বাস্তবতা আড়াল করার সুযোগ ছিল সীমিত।
এই চিত্র বদলাতে শুরু করে ফরাসী রাষ্ট্রনায়ক ও সমরনায়ক নেপোলিয়ান বোনাপার্টের সময় থেকে, যখন কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রক্ষমতা শক্তিশালী হয়। যুদ্ধকালীন বুলেটিনের মাধ্যমে তিনি নিজের শক্তিকে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করতেন, এতে প্রতিপক্ষের পক্ষে ফ্রান্সের সেনাবাহিনীর সরবরাহ বা মজুদের প্রকৃত অবস্থা জানা কঠিন হয়ে পড়ে। এই ধরনের প্রচার একদিকে দেশের অভ্যন্তরে মনোবল বাড়ত, অন্যদিকে শত্রু-ও বিভ্রান্ত হতো।
১৯ শতকের মাঝামাঝি আধুনিক ও নতুন সমরাস্ত্র তৈরিতে শিল্পায়নের অবদান যুক্ত হয়। তখনই অস্ত্র উৎপাদন রূপ নিতে শুরু করে মহাকায় শিল্পের। যুদ্ধের ময়দানে আধুনিক ইউরোপীয় শক্তিগুলোর হত্যালীলা আর যুদ্ধকৌশলও হয়ে উঠতে থাকে ব্যাপক পরিধির। এই সময়ে যুদ্ধের চাহিদা পূরণে তাদের ব্যাপক সৈন্যসংগ্রহ ও শিল্পভিত্তিক অস্ত্র উৎপাদন বিশাল কিন্তু দুর্বোধ্য অস্ত্রভাণ্ডার তৈরি করে, যা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করাও কঠিন হয়ে পড়ে—এমনকি তাদের নিজস্ব পরিকল্পনাকারীদের জন্যও।
নৌ-শক্তিধর দেশগুলো জাহাজ নির্মাণ কর্মসূচি নিয়ে ইচ্ছাকৃত অস্পষ্টতা বজায় রাখত, যা অস্ত্র প্রতিযোগিতা উসকে দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে গোয়েন্দা ব্যর্থতার কারণে বড় শক্তিগুলো প্রায়ই একে অপরের সামরিক সক্ষমতা ভুলভাবে মূল্যায়ন করত।
কোনটি অস্ত্র হিসেবে গণ্য হবে, সেটিও নির্ধারণও জটিল হয়ে ওঠে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ জাহাজ আরএমএস লুসিতানিয়ায় অস্ত্র বহন করা হচ্ছিল এবং এতে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু, জার্মানির হামলায় ডুবে যাওয়ার পর এটিকে সম্পূর্ণ বেসামরিক জাহাজ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় জনমত প্রভাবিত করতে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্ত্র উৎপাদন ও মজুদ কম করে ধরেছিল, যা বার্লিনের পতন নিশ্চিত করে। এই ঘটনা পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি ধরে নিয়েই সমর পরিকল্পনা করতে উৎসাহিত করে। ১৯৫৫ সালের মস্কো এভিয়েশন ডে-র পর মস্কোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের তথাকথিত "বোমারু ব্যবধান" (বম্বার গ্যাপ) নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়, পরে "মিসাইল ব্যবধান" নিয়েও একই ধরনের আশঙ্কা দেখা দেয়। পরবর্তীতে গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমেও কমিয়ে দেখানো হয়। এমনকি সোভিয়েতদের সঙ্গে মার্কিনীদের "ট্যাংক ব্যবধান" ভ্রান্ত প্রমাণিত হতে কয়েক দশক লেগে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি নিরস্ত্রীকরণের স্বপক্ষে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা–আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশন-এর সাবেক সদস্য গ্রেগ থিলমান যেমন বলেছেন, "যখন কোনো বিশ্লেষণে সম্ভাব্যতার একটি পরিসর দেওয়া হয়, তখন রাজনৈতিক কারণে সেই পরিসরের সর্বোচ্চ বা সর্বনিম্ন সংখ্যাটিই বেশি গুরুত্ব পায়।"
সাবেক সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চভ আরও স্পষ্টভাবে বলেন, "আমাদের কাছে কত মিসাইল ছিল, তা এত গুরুত্বপূর্ণ নয়… গুরুত্বপূর্ণ হলো আমেরিকানরা আমাদের শক্তিতে বিশ্বাস করত।" অর্থাৎ প্রকৃত উৎপাদনের বদলে ধারণা তৈরি করাই ছিল মূল লক্ষ্য।
রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে অস্ত্রের দাবি
অস্ত্রভিত্তিক দাবি দেখিয়ে যুদ্ধের পথ তৈরি করার ঘটনা এখনও বিদ্যমান। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাক আক্রমণের আগে মার্কিন ও মিত্র দেশগুলো ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের কাছে ব্যাপক গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে বলে তথাকথিত "দৃঢ় প্রমাণ" উপস্থাপন করেছিল।
এভাবে ভুল গোয়েন্দা তথ্য ও তার মনমতো রাজনৈতিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে যুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরি করা হয়। পরে যখন স্পষ্ট হয় যে ইরাকের কাছে এমন অস্ত্রভাণ্ডার ছিল না, ততদিনে এই আক্রমণ দীর্ঘস্থায়ী দখলদারিতে রূপ নেয়।
এখানে শুধু ভূরাজনীতি নয়, অর্থনৈতিক স্বার্থও ভূমিকা রেখেছে। স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সামরিক ব্যয় কমে যাওয়ায় পেন্টাগন ও প্রতিরক্ষা শিল্পের মধ্যে সমন্বয়ের আহ্বান জানানো হয়, ফলে বড় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে গিয়ে কয়েকটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে সীমিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠান ৯/১১-পরবর্তী সামরিক ব্যয় বৃদ্ধিতে বড় সুবিধা পায়।
এই বৃহৎ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো জনমত গঠনে আরও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। ইরাক আক্রমণের পক্ষে জনসমর্থন তৈরির জন্য গঠিত কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন বৃহৎ সমরাস্ত্র উৎপাদক–লকহিড মার্টিনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ব্রুস জ্যাকসন।
অস্ত্রের পরিসংখ্যানকে সরলভাবে গ্রহণ না করার আরেকটি কারণ হলো, আধুনিক সামরিক ব্যবস্থার জটিলতা। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল, রক্ষণাবেক্ষণ চক্র ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর কারণে এখানে সঠিক হিসাব করাই কঠিন। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর এক নিরীক্ষায় দেখা যায়, তাদের নিজেদের খুচরা যন্ত্রাংশের হিসাবও প্রায়ই ভুল ছিল।
অস্ত্রসংক্রান্ত বিভ্রান্তিকর তথ্য কখনো কখনো উল্টো ফলও বয়ে আনে। ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র না পাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী দাবিগুলোর প্রতি সন্দেহ তৈরি হয়, যেমন সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অবশ্য পরে সেটি সঠিক প্রমাণিত হয়।
সাম্প্রতিক ইউক্রেন যুদ্ধেও অস্ত্রসংক্রান্ত নানা দাবি সামনে এসেছে, যেগুলো যাচাই করা কঠিন। ইউক্রেনের গোলাবারুদ, বিমান প্রতিরক্ষা ও মিসাইল ঘাটতির বিষয়টি সত্য হলেও, এসব ঘাটতি তুলে ধরার ধরন অনেক সময় পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
পশ্চিমা দেশগুলোও নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার নতুন করে মূল্যায়ন করতে বাধ্য হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে জার্মানি দেখেছে, তাদের মজুদ প্রত্যাশার তুলনায় কম বা যা আছে তারও একটা অংশ এরমধ্যেই অকার্যকর। ফলে সামরিক উৎপাদনে নতুন করে বিনিয়োগ বাড়ানো হয়েছে।
রাইনমেটাল-এর মতো বৃহৎ জার্মান প্রতিরক্ষা উৎপাদক প্রতিষ্ঠান ২০২৭ সালে ১১ লাখ আর্টিলারি শেল উৎপাদনের লক্ষ্যে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে—যা শুধু চাহিদা পূরণ নয়, বরং জার্মানির দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রস্তুতির বার্তাও দিচ্ছে। সে তুলনায়, ২০২২ সালে রাইনমেটাল মাত্র ৭০ হাজার আর্টিলারি শেল উৎপাদন করতো। অর্থাৎ, বিপুল পরিসরে উৎপাদনের তোড়জোড় চলছে।
ইউক্রেনে পাঠানো অনেক পশ্চিমা অস্ত্র আগে থেকেই অবসরে পাঠানোর পরিকল্পনায় ছিল। এগুলো সরবরাহের মাধ্যমে সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমানো যায়, আবার একই সঙ্গে মজুদের ধারণাও বাড়িয়ে দেখানো সম্ভব হয়।
রাশিয়ার ক্ষেত্রেও একই ধরনের অস্পষ্টতা রয়েছে। তারা সোভিয়েত আমলের বিপুল মজুদের কথা বললেও, দীর্ঘদিনের অবহেলায় অনেক অস্ত্র বা গোলাবারুদ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তবে উত্তর কোরিয়ার গোলাবারুদ সরবরাহ ও নিজস্ব উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে এই ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে পেরেছে মস্কো। সেইসঙ্গে, প্রত্যাশার তুলনায় বহুগুণ গতিতে নতুন যুদ্ধবিমান, ট্যাংক ও মিসাইল তৈরি করেও মজুদের ঘাটতি কাটিয়ে ওঠে রাশিয়া।
ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় জৈব অস্ত্র তৈরি করছে— রাশিয়ার পক্ষ থেকে এমন দাবি এবং এর বিরুদ্ধে আবার পশ্চিমাদের পাল্টা অভিযোগ—এসবই আন্তর্জাতিক জৈবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন করেছে এবং এর দুর্বলতাকেই তুলে ধরেছে।
থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) জানাচ্ছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়িয়ে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর আস্থা নষ্ট করার চেষ্টা বাড়িয়েছে।
মোদ্দা কথা, অস্ত্রসংখ্যা বা গোলাবারুদের পরিসংখ্যান হচ্ছে একটি পরিবর্তনশীল বাস্তবতা। এগুলো প্রায়ই সংশোধিত হয়, বিরোধিতা তৈরি করে এবং অনেক ক্ষেত্রে যাচাই করাই সম্ভব হয় না। ফলে যুদ্ধ বা শান্তিকালীন সময়ে কোনো দেশের অস্ত্রভাণ্ডার সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য পাওয়া যাবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
রাষ্ট্রগুলো নিজেদের শক্তি বাড়িয়ে দেখানো, দুর্বলতা গোপন রাখা এবং সামরিক ব্যয়ের যৌক্তিকতা তুলে ধরার প্রণোদনা সবসময়ই রাখে। ফলে অস্ত্রসংক্রান্ত জনপরিসরের আলোচনা অনেক সময় বিভ্রান্তিকর হয়ে ওঠে।
একই সঙ্গে, ব্যাপক উৎপাদিত ড্রোন ও থ্রিডি-প্রিন্টেড অস্ত্রের মতো নতুন প্রযুক্তি ঐতিহ্যগত অস্ত্রভাণ্ডারের গুরুত্ব কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে অস্ত্রসংক্রান্ত দাবি সংখ্যাগত সত্য নয়, বরং একটি বার্তা—যার উদ্দেশ্য বাস্তবতা তুলে ধরা নয়, বরং ধারণা নিয়ন্ত্রণ করা।
লেখক: জন পি. রুয়েল একজন অস্ট্রেলীয়-আমেরিকান সাংবাদিক, যিনি ওয়াশিংটন ডিসিতে বসবাস করেন এবং ইনডিপেনডেন্ট মিডিয়া ইনস্টিটিউট-এর বিশ্ববিষয়ক প্রতিবেদক। তিনি আন্তর্জাতিক বিষয়ের বিভিন্ন প্রকাশনায় নিয়মিত লেখেন। তাঁর বই " বাজেট সুপারপাওয়ার: হাউ রাশিয়া চ্যালেঞ্জেস দ্য ওয়েস্ট উইথ অ্যান ইকোনমি স্মলার দেন টেক্সাস" প্রকাশিত হয় ২০২২ সালের ডিসেম্বরে।
