হারিয়ে যাওয়া কুকুর দলের ঘরে ফেরার ভাইরাল হওয়া গল্পটি ফেইক
ইন্টারনেট এখন পথ হারানো একদল কুকুরের বাড়ি ফেরার গল্পে মজেছে। ভিডিওটি ইতোমধ্যে কয়েক কোটি বার দেখা হয়েছে।
ভিডিওটিতে চীনের একদল কুকুরকে দেখা যায়৷ দাবি করা হচ্ছে, কুকুরগুলোকে খাওয়ার জন্য ধরা হয়েছিল, কিন্তু তারা সেখান থেকে পালিয়ে দলবদ্ধ হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাড়ির পথে রওনা হয়েছে।
এই দলে রয়েছে একটি গোল্ডেন রিট্রিভার, একটি আহত জার্মান শেফার্ড এবং সামনের সারিতে নেতৃত্ব দেওয়া একটি সাহসী কর্গি।
তবে সমস্যা হলো, গল্পটি সত্যি নয়। যদিও মূল ভিডিওটি আসল এবং এতে উত্তর-পূর্ব জিলিন প্রদেশের একটি হাইওয়ের ধারে সাতটি কুকুরকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যাচ্ছে, কিন্তু তাদের পালিয়ে আসা এবং বাড়ি ফেরার গল্পটি চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম পরে মিথ্যে বলে প্রমাণ করেছে।
তা সত্ত্বেও, এই কাল্পনিক গল্পটি নিজের মতো করে ডালপালা মেলেছে। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরা একে ১৯৯৩ সালের ডিজনির বিখ্যাত সিনেমা 'হোমওয়ার্ড বাউন্ড'-এর সাথে তুলনা করেছেন। এমনকি এআই দিয়ে এই ঘটনার অনেক কিছু তৈরি করা হয়েছে৷ যেমন- সাতটি কুকুরের সিনেমার পোস্টার, তাদের রোমাঞ্চকর পলায়ন নিয়ে মুভি ট্রেলার, এমনকি তাদের মালিকদের সাথে পুনর্মিলনের আনন্দঘন মুহূর্তের ছবিও বাদ যায়নি।
এই ঘটনাটি এটিই প্রমাণ করে যে, একটি ভাইরাল মুহূর্তের পর কীভাবে ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এআই-এর যুগে এই ধরনের আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ গল্পগুলো যাচাই করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। এই ক্ষেত্রে, কিছু মিথ্যা গল্পের সাথে বর্ণবাদী নেতিবাচক ধারণাও যুক্ত করা হয়েছিল।
চারদিকের নেতিবাচক সংবাদের মাঝে দর্শকরা পশুপাখির ভিডিওর মতো সুন্দর এবং ইতিবাচক কন্টেন্ট খুঁজছেন।
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের আরএমআইটি ইউনিভার্সিটির ডিজিটাল মিডিয়ার সহযোগী অধ্যাপক টিজে থমসন বলেন, 'এই ভিডিওগুলো মানুষকে বাস্তবতা থেকে কিছুটা মুক্তি দেয়। তবে এর জনপ্রিয়তা সোশ্যাল মিডিয়ার কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের ক্লিকের আশায় নতুন গল্প বানাতে বা অতিরঞ্জিত করতে উৎসাহিত করে।'
তিনি বলেন, 'মানুষ ভাইরাল কন্টেন্ট বা ট্রেন্ডকে পুঁজি করার চেষ্টা করছে। অনলাইন এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় মনোযোগই হলো টাকা। সুতরাং, আপনি যত বেশি মনোযোগ পাবেন, তত বেশি সাড়া পাবেন।'
মিথ্যা গল্পের শুরু যেভাবে
চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যম কভার নিউজের মতে, সাতটি কুকুরের ভিডিওটি গত ১৫ মার্চ জিলিন প্রদেশের একটি দুর্গম এলাকায় গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় এক ব্যক্তি ধারণ করেছিলেন।
তিনি এটি অনলাইনে পোস্ট করেন এবং ধারণা করেন যে, কুকুরগুলো সম্ভবত কুকুরের মাংস বহনকারী কোনো গাড়ি থেকে পালিয়েছে। যদিও পরে তিনি স্পষ্ট করেছিলেন যে, তিনি নিজে এমন কোনো পলায়ন দেখেননি।
ভিডিওটি চীনের সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং দেশটির প্রধান দুটি প্ল্যাটফর্ম ডুইন ও ওয়েইবো-তে ৯০ মিলিয়নেরও বেশি ভিউ পায়। এরপর এটি বিশ্বব্যাপী টিকটক, এক্স (টুইটার), ইনস্টাগ্রাম এবং একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
কুকুরগুলো চুরি করা হয়ে থাকতে পারে—এমন তত্ত্বও বেশ জনপ্রিয় হয়। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরা লক্ষ্য করেন যে, বেশ কয়েকটি কুকুর আহত জার্মান শেফার্ডটির খুব কাছ দিয়ে হাঁটছিল এবং বারবার সেটির দিকে তাকাচ্ছিল। তাদের দাবি ছিল, এটি দলের কোনো আহত সদস্যকে রক্ষা করার প্রমাণ।
অন্যরা দলটির সামনে হাঁটতে থাকা ছোট কর্গিটির প্রেমে পড়ে যান। সেটি মাঝেমধ্যেই পেছনের দিকে তাকাচ্ছিল, যেন একজন সাহসী নেতার মতো নিশ্চিত করছিল যে কেউ পেছনে পড়ে নেই তো!
চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন 'সিটি ইভিনিং নিউজ' কুকুরের মালিকদের খুঁজে বের করেছে। তাদের তথ্যমতে, সবকটি কুকুরই হাইওয়ের কয়েক কিলোমিটার দূরে থাকা গ্রামবাসীদের। মালিকরা জানিয়েছেন, জার্মান শেফার্ডটি তখন প্রজনন ঋতুতে ছিল, আর সেই কারণেই অন্য কুকুরগুলো তার পেছনে পেছনে ঘুরছিল।
'কভার নিউজ' জানিয়েছে, গ্রামের বেশিরভাগ কুকুরই মুক্তভাবে ঘুরে বেড়ায় এবং প্রজনন ঋতুতে তারা প্রায়ই একদিন বা দুইদিনের জন্য নিখোঁজ হয়ে যায়। সেই সাতটি কুকুরও ইতোমধ্যে বাড়ি ফিরে এসেছে। জার্মান শেফার্ডটিকে এখন তার মালিক শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছেন যতক্ষণ না তার সেই বিশেষ সময়টি পার হয়।
থমসন বলেন, 'ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। প্রাণীদের ভিডিও আমাদের শিশুসুলভ প্রকৃতি এবং ছোট প্রাণীদের প্রতি যত্নের আকাঙ্ক্ষাকে জাগিয়ে তোলে।' তিনি আরও যোগ করেন, 'প্রাণীরা সম্প্রদায়, একাত্মতা এবং একাকীত্বের মতো সর্বজনীন বিষয়গুলো প্রকাশের একটি নিরপেক্ষ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। আর এই ধরনের সুন্দর কন্টেন্ট যুদ্ধ এবং দুর্যোগের হাজারো সংবাদের মাঝে মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দেয়।'
ক্লিকের নেশা
ভুয়া কন্টেন্ট তৈরির পেছনের উদ্দেশ্য ভিন্ন ভিন্ন হলেও সবচেয়ে বড় কারণ হলো ক্লিক এবং ট্রাফিক, যা থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় টাকা আয় করা যায়।
অস্ট্রেলিয়ার পার্থের কার্টিন ইউনিভার্সিটির ইন্টারনেট স্টাডিজের অধ্যাপক তামা লিভার বলেন, 'এই ধরণের কন্টেন্ট অবিশ্বাস্যভাবে জনপ্রিয় হতে পারে এবং ভাইরাল হতে পারে। তার মানে হলো এটি কোনো অ্যাকাউন্টের ফলোয়ার খুব দ্রুত বাড়িয়ে নেওয়ার একটি কার্যকর উপায়।'
কিছু মানুষের কাছে ভাইরাল হওয়া পশুর ভিডিওটি আসল নাকি নকল তা গুরুত্বপূর্ণ নাও হতে পারে। কিন্তু সমস্যা তখনই হয় যখন দর্শকরা যা দেখছেন তা কোনো প্রশ্ন ছাড়াই বিশ্বাস করে নেন—বিশেষ করে যখন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কিছু হয়৷
উদাহরণস্বরূপ, লিভার বলেন যে ইরান যুদ্ধ নিয়ে প্রচুর পরিমাণে ভুয়া ভিডিও রয়েছে যা অনেক মানুষই সত্য বলে বিশ্বাস করে নিতে পারে। তিনি বলেন, 'যখন আমরা আমাদের প্রত্যাশা কমিয়ে দিই এবং স্বীকার করি যে একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সত্য-মিথ্যা নিয়ে আমাদের কিছু যায় আসে না, তখন এর মানে হলো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও আমাদের বিচার করার ক্ষমতা আর তীক্ষ্ণ থাকবে না।'
এই সাতটি কুকুরের ঘটনাটি হয়তো তুচ্ছ বা ক্ষতিকর মনে নাও হতে পারে কিন্তু এখানেও বিপদ রয়েছে। যেমন, কুকুরগুলোকে মাংসের কারখানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল—এমন মিথ্যা গল্প চীনাদের সম্পর্কে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে যে তারা কুকুরের মাংস খায়। এটির মাধ্যমে বিদেশে চীনাদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদকে উসকে দেওয়া হয়েছে৷
থমসন বলেন, 'কোভিড-১৯ মহামারীর পর পশ্চিমা বিশ্বে চীনারা যখন ইতোমধ্যে বিদ্বেষের শিকার হচ্ছেন, তখন এই ধরণের ভিডিও বাইরের মানুষের মনে চীন সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা আরও গভীর করতে পারে। ইন্টারনেটে যত বেশি এআই-জেনারেটেড আবর্জনা জমা হবে, ভুল তথ্য তত বেশি ছড়িয়ে পড়বে—যা আমাদের সত্য এবং বিশ্বাসের বোধকে চ্যালেঞ্জ করবে।'
থমসন পরিশেষে বলেন, 'যখন আপনি সত্যিই জানেন না কাকে বিশ্বাস করবেন বা কী বিশ্বাস করবেন, এমনকি নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারেন না—তখন আপনি একটি ভয়ানক পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যান।'
