৯৬ বছর বয়সে মারা গেলেন জার্মান দার্শনিক ও সমাজতাত্ত্বিক ইয়ুর্গেন হাবারমাস
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর জার্মানির অন্যতম প্রভাবশালী দার্শনিক এবং সমাজতাত্ত্বিক ইয়ুর্গেন হাবারমাস ৯৬ বছর বয়সে মারা গেছেন।
হাবারমাস ১৯৬০-এর দশকে ফ্রাঙ্কফুট বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন ও সমাজবিজ্ঞান পড়াতে শুরু করেন। সেই সময়ে পশ্চিম জার্মানির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গড়ে ওঠা ছাত্র বিদ্রোহের জোরালো সমর্থক ছিলেন।
তিনি 'ফ্রাঙ্কফুট স্কুল'-এর একজন নেতৃস্থানীয় সদস্য ছিলেন। এই চিন্তাধারাটি প্রথাগত মার্কসবাদ থেকে আলাদা একটি 'নব্য বামপন্থী' দৃষ্টিভঙ্গি যা পুঁজিবাদের সমালোচনা করত।
তিনি নাৎসি জার্মানিতে বড় হয়েছেন এবং ১৯৮০-র দশকে সেই সব রক্ষণশীল ঐতিহাসিকদের সাথে এক তীব্র বিতর্কে অংশ নিয়েছিলেন, যারা হলোকাস্ট (ইহুদি নিধনযজ্ঞ) শুধুমাত্র জার্মানির একটি অনন্য ঘটনা কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
হাবারমাসের মৃত্যুর খবরটি গত শনিবার তার প্রকাশক সুহরকাম্প ঘোষণা করেন।
তিনি ১৯২৯ সালের জুনে ডুসেলডর্ফে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা স্থানীয় চেম্বার অফ কমার্সের প্রধান ছিলেন এবং ১৯৩৩ সালে নাৎসি পার্টিতে যোগ দেন।
তরুণ ইয়ুর্গেন 'হিটলার ইউথ'-এর সদস্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়ার মতো বয়স তখনো তার হয়নি।
যুদ্ধের পর হাবারমাস দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং মারবার্গ ইউনিভার্সিটি থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করার পর ফ্রাঙ্কফুট ইউনিভার্সিটির 'ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল রিসার্চ'-এ যোগ দেন।
ম্যাক্স হর্কহেইমার এবং থিওডর অ্যাডর্নোর পাশাপাশি তিনি ফ্রাঙ্কফুট স্কুলের অন্যতম প্রধান চিন্তাবিদ হয়ে ওঠেন।
এই স্কুলটি মূলত 'ক্রিটিক্যাল থিওরি' বা সমালোচনামূলক তত্ত্বের জন্য পরিচিত—যা দাবি করে, পুঁজিবাদী সমাজ মানুষের মুক্তি নিশ্চিত করার পরিবর্তে সক্রিয় নাগরিকদের নিছক পরনির্ভরশীল ভোক্তায় পরিণত করে।
হাবারমাস গণমাধ্যম ও বিনোদন জগতের বাণিজ্যিকীকরণের সমালোচনা করেছিলেন। তার মতে, ব্যাপকভাবে উৎপাদিত বা 'মাস-প্রোডিউসড' সংস্কৃতি সমালোচনামূলক জনআলোচনাকে ধ্বংস করে দেয়।
১৯৮৯-৯০ সালে তিনি পূর্ব জার্মানিকে দ্রুত পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে একীভূত করার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। তার আশঙ্কা ছিল, এতে জাতীয়তাবাদের পুনরুত্থান ঘটতে পারে। তিনি বরং ধীর ও পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়ার পক্ষে মত দিয়েছিলেন।
১৯৯০-এর দশকে হাবারমাস একটি ঐক্যবদ্ধ ইউরোপের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন। তার মতে, জাতীয়তাবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতার পুনরুত্থানের বিরুদ্ধে এটিই ছিল সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা।
১৯৮১ সালে প্রকাশিত তার সবচেয়ে প্রভাবশালী গ্রন্থ 'দ্য থিওরি অফ কমিউনিকেটিভ অ্যাকশন'-এ তিনি যুক্তি দেন, মানব সমাজ রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক শক্তি দ্বারা নয়, বরং যুক্তিনির্ভর সংলাপের সক্ষমতার মাধ্যমে টিকে থাকে।
হাবারমাস জন্মগতভাবে 'ক্লেফট প্যালেট' বা তালু ফাঁটা নিয়ে জন্মেছিলেন, যার ফলে শৈশবে বারবার তার অস্ত্রোপচার করতে হয়েছিল।
এই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি পরবর্তীতে বলেছিলেন, এই অভিজ্ঞতাই ভাষা ও যোগাযোগ সম্পর্কে তার চিন্তাভাবনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
