‘সঠিক কাজ’ না করলে, মাদুরোর চেয়েও বেশি মূল্য দিতে হবে: ভেনেজুয়েলার নতুন নেত্রীকে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার নতুন নেত্রী ডেলসি রদ্রিগেজকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তিনি যদি 'সঠিক কাজ' না করেন, তবে তাকে 'চরম মূল্য দিতে হতে পারে, যা সম্ভবত মাদুরোর চেয়েও বেশি'। খবর বিবিসির।
মার্কিন সাময়িকী 'দ্য আটলান্টিক'-কে দেওয়া তাঁর এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল যখন দেশটির অপসারিত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো সোমবার নিউ ইয়র্কের একটি আদালতে হাজির হওয়ার কথা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচার এবং অস্ত্র সংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগ এনেছে এবং তার বিরুদ্ধে একটি 'মাদক-সন্ত্রাসবাদী' শাসনব্যবস্থা চালানোর দাবি করেছে—মাদুরো অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
শনিবার কারাকাসে বিমান হামলার পর মাদুরো ও তার স্ত্রীকে হেফাজতে নেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরের ঘটনায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জোর দিয়ে বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত নয়।
কয়েকজন ডেমোক্র্যাটিক আইন প্রণেতা এই অভিযানকে 'যুদ্ধের শামিল' বলে অভিহিত করেছেন।
গত রোববার 'দ্য আটলান্টিক' ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প রদ্রিগেজ সম্পর্কে বলেন, 'তিনি যদি সঠিক কাজ না করেন, তবে তাকে অত্যন্ত চড়া মূল্য দিতে হবে, যা সম্ভবত মাদুরোর চেয়েও বেশি।'
তিনি ভেনেজুয়েলা প্রসঙ্গে আরও বলেন, 'একে শাসন পরিবর্তন বা আপনারা যা খুশি বলতে পারেন, তবে এটি বর্তমানে যা আছে তার চেয়ে ভালো। পরিস্থিতি এর চেয়ে খারাপ হওয়ার সুযোগ নেই।'
শনিবার ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, একটি 'নিরাপদ, যথাযথ এবং বিচক্ষণ পরিবর্তন' সম্ভব না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই দেশটি 'পরিচালনা' করবে।
ট্রাম্প আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো অবকাঠামো সংস্কার করতে এবং 'দেশের জন্য অর্থ উপার্জন শুরু করতে' ভেনেজুয়েলায় প্রবেশ করবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এসব দাবি সত্ত্বেও, মাদুরোর মিত্ররাই এখনও ক্ষমতায় রয়েছেন।
কিউবান সরকার জানিয়েছে যে, মার্কিন বাহিনী যখন মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আক্রমণ ও বন্দি করে, তখন ৩২ জন 'সাহসী কিউবান যোদ্ধা' নিহত হয়েছেন। মাদুরোর দীর্ঘদিনের সমাজতান্ত্রিক মিত্র কিউবা এই ঘটনায় দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে।
রোববার সকালে বেশ কয়েকটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে রুবিও ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের পক্ষ সমর্থন করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই পদক্ষেপের মানে এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ আমেরিকার ওই দেশটির সাথে যুদ্ধে লিপ্ত।
রোববার সকালে এনবিসি-র 'মিট দ্য প্রেস' অনুষ্ঠানে রুবিও বলেন, 'আমরা মাদক পাচারকারী সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধে আছি। এটি ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধ নয়।'
পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিবিএস-কেও জানিয়েছেন যে, ভেনেজুয়েলা যদি 'সঠিক সিদ্ধান্তগুলো' না নেয়, তবে আমাদের স্বার্থ রক্ষা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য 'বহুমুখী কৌশল' বজায় রাখবে।
রুবিও বলেন, এর মধ্যে ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা 'কোয়ারেন্টাইন' বা অবরোধও অন্তর্ভুক্ত।
তিনি আরও বলেন, 'তারা কী করছে তার ওপর ভিত্তি করেই আমরা সবকিছু বিচার করব এবং আমরা দেখব তারা কী পদক্ষেপ নেয়্।'
এদিকে এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রতিবেশী দেশ কলম্বিয়াকেও হুমকি দিয়েছেন।
কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা তিনি নাকচ করে দেননি; বরং বলেছেন, 'এটি (সামরিক পদক্ষেপ) আমার কাছে ভালোই মনে হচ্ছে।' তিনি কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেট্রোকে একজন 'অসুস্থ মানুষ' হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ট্রাম্প বলেন, 'কলম্বিয়াও খুব অসুস্থ, যা একজন অসুস্থ মানুষের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে; যে কোকেন তৈরি করতে এবং তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি করতে পছন্দ করে। সে খুব বেশিদিন আর এটি করতে পারবে না।'
ভেনেজুয়েলার ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টির নেতা মাদুরো, যিনি ২০১৩ সাল থেকে ক্ষমতায় আছেন, তার বিরুদ্ধে প্রায়শই বিরোধী দলগুলোকে দমন এবং কখনও কখনও সহিংসতার মাধ্যমে ভিন্নমত থামিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
দেশটির অভ্যন্তরীণ বিরোধী পক্ষ এবং বিদেশি সরকারগুলোর কাছে তিনি ব্যাপকভাবে পরিচিত এমন একজন নেতা হিসেবে, যিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনে অবৈধভাবে জয়ী হয়েছেন।
ভেনেজুয়েলার এই বামপন্থী নেতা এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তাদের বাসভবন থেকে বন্দি করে বিমানে করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এটি ছিল শনিবার ভোরে পরিচালিত স্পেশাল ফোর্সের একটি নাটকীয় অভিযানের অংশ, যে সময় দেশটির সামরিক ঘাঁটিগুলোতেও হামলা চালানো হয়েছিল।
এরপর থেকে এই দম্পতির বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক সংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে এবং সোমবার নিউ ইয়র্কের একটি আদালতে তাঁদের হাজির করার কথা রয়েছে।
মাদুরো কার্টেল নেতা হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন এবং অভিযোগ করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে এবং ভেনেজুয়েলার তেল দখল করার অজুহাত হিসেবে 'মাদক বিরোধী যুদ্ধ'কে ব্যবহার করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলেছেন, হামলার সময় কোনো আমেরিকান সেনা আহত হননি। তবে ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো জানিয়েছেন, মাদুরোর নিরাপত্তা দলের একটি 'বড় অংশ' এবং 'সেনা ও নিরীহ নাগরিক' নিহত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানের আগে কেন কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়া হয়নি—এবিসি-র এমন প্রশ্নের জবাবে রুবিও বলেন, 'এর কোনো প্রয়োজন ছিল না কারণ এটি কোনো আগ্রাসন ছিল না।'
তিনি একে একটি 'আইন প্রয়োগকারী অভিযান' হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন যে এফবিআই এজেন্টরা মাদুরোকে সশরীরে গ্রেপ্তার করেছে। তিনি আরও বলেন, এ ধরণের অভিযানের কথা কংগ্রেসকে আগে জানানো যায় না কারণ 'এটি ফাঁস হয়ে যাবে'।
ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্টে শপথ নেওয়ার পর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এখন দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট। দেশটির সেনাবাহিনীও তাকে সমর্থন দিয়েছে। স্থানীয় সময় সোমবার সকাল ৮টায় (গ্রিনিচ মান সময় রাত ১২টা) কারাকাসে তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর সাথে কথা বলার সময় রুবিওর কাছে জানতে চাওয়া হয় যে যুক্তরাষ্ট্র রদ্রিগেজকে ভেনেজুয়েলার বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয় কি না।
উত্তরে তিনি বলেন, 'এটি বৈধ প্রেসিডেন্ট সংক্রান্ত কোনো বিষয় নয়', কারণ যুক্তরাষ্ট্র এই শাসনব্যবস্থাকেই (রেজিম) বৈধ বলে স্বীকার করে না।
