২৫০ বছরের পুরোনো মোগল ফরমান: গঙ্গাস্নানে কর মওকুফ, খরচ বহন করত সরকার
সে সময় ভারত এক বিশাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। একদিকে মোগল সাম্রাজ্যের পতন ঘনিয়ে আসছিল, অন্যদিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ধীরে ধীরে পুরো উপমহাদেশে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করছিল। ইতিহাসের সেই সন্ধিক্ষণে জারি করা একটি রাজকীয় দলিল বা 'ফরমান' আজও গঙ্গার তীর্থযাত্রীদের প্রতি ধর্মীয় উদারতা ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে টিকে আছে।
বর্তমানে ঐতিহাসিক এই দলিলটি তেলেঙ্গানার 'স্টেট আর্কাইভস অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট' (টিএসএআরআই)-এ সংরক্ষিত রয়েছে।
এটি ছিল মূলত মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম; যিনি আবুল মুজাফফর জালালউদ্দিন মুহাম্মদ নামেও পরিচিত—তার নামে জারি করা একটি রাজকীয় আদেশ। এই ফরমানে তৎকালীন এলাহাবাদ সুবাহর (প্রদেশ) কর্মকর্তা ও প্রশাসকদের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, গঙ্গাস্নানে আসা কোনো তীর্থযাত্রীর কাছ থেকে কোনো প্রকার ফি বা কর আদায় করা যাবে না। এমনকি তীর্থযাত্রার যাবতীয় খরচ সরকারি তহবিল থেকে বহনের নির্দেশনাও ছিল এই ফরমানে।
টিএসএআরআই-এর পরিচালক জারিনা পারভিন জানান, ১৭৭৩ সালে জারি করা এই আদেশটি লেখা হয়েছিল 'শিকস্তা' নামক এক বিশেষ ধরনের ভাঙা লিপিতে। তিনি ফরমানটি অনুবাদ করে 'দ্য হিন্দু' পত্রিকাকে বলেন, "এতে সব ধরনের কর ও শুল্ক মওকুফের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল। পবিত্র স্নানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আচার হিসেবে বিবেচনা করে বলা হয়েছিল, এতে যেন কোনোভাবেই বিঘ্ন সৃষ্টি না হয়। এমনকি কোটওয়ালদের (তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী) প্রতিও একই নির্দেশ জারি করা হয়েছিল। আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল এই ফরমানে।"
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, এই ফরমানে 'গুজরাটি' ও 'মারাঠা'—এই দুই সম্প্রদায়ের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যারা সে সময় এলাহাবাদে গঙ্গাস্নানে আসতেন।
গবেষক আনাবেল তেহ গ্যালপ তার 'দ্য জেনেলজিক্যাল সিল অব দ্য মোগল এম্পেরর্স অব ইন্ডিয়া' গ্রন্থে মোগল সম্রাটদের বংশানুক্রমিক সিলমোহর বা রাজকীয় মোহরের বিশেষত্বের কথা উল্লেখ করেছেন। এই সিলমোহরের কেন্দ্রে থাকত বর্তমান সম্রাটের নাম এবং তাকে ঘিরে উপবৃত্তাকার বিন্যাসে আবর্তিত হতো তার পূর্বপুরুষদের নাম। প্রতিটি নামের আগে 'ইবন' (পুত্র) শব্দটি যুক্ত থাকত, যা দেখতে অনেকটা স্যাটেলাইটের কক্ষপথের মতো লাগত।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, "এটি ছিল এক অনন্য রাজকীয় প্রতীক, যার মাধ্যমে পূর্বসূরিদের বীরত্বগাথা ও আভিজাত্যকে তুলে ধরে শাসকের বৈধতা ও ক্ষমতা জাহির করা হতো।" মোগল সাম্রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে এই সিলমোহরের খ্যাতি ও গ্রহণযোগ্যতা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল।
সংরক্ষিত এই ফরমানটির ডান পাশে বংশানুক্রমিক সিলের পাশাপাশি আরেকটি বিশেষ মোহর রয়েছে। এর গঠন অনেকটা সুরাহি বা কলসির মতো—নিচের দিকটি স্ফীত এবং ওপরের দিকটি সরু। এর কেন্দ্রে খোদাই করা আছে সম্রাট আবুল মুজাফফর জালালউদ্দিনের নাম এবং চারপাশের গোলকগুলোতে রয়েছে তার পূর্বপুরুষদের নাম।
জারিনা পারভিন বলেন, "সিলটি দেখতে হুবহু একটি সুরাহি পাত্রের মতো। মোগলরা নথি সংরক্ষণের বিষয়ে কতটা নিখুঁত ও দূরদর্শী ছিল, তা আজ ইতিহাসবিদদের কাছে গবেষণার বিষয়। হাতে তৈরি কাগজে লেখা এই ফরমানে যে কালি ব্যবহার করা হয়েছে, তা এতটাই উন্নত যে কয়েক শতাব্দী পরেও তা একটুও ম্লান হয়নি।"
দলিলটির স্থায়িত্বের এক বিস্ময়কর প্রমাণ পাওয়া যায় প্রায় ২৫ বছর আগে। সে সময় এক ভয়াবহ বন্যায় মোগল আমলের এই নথিপত্র রাখার কক্ষটি প্লাবিত হয়েছিল। পরবর্তীতে আর্কাইভের কর্মীরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রতিটি পাতা আলাদা করে শুকিয়ে নেন। তখন দেখা যায়, পানি লেগে কালি তো মুছে যায়ইনি, বরং আগের চেয়ে আরও উজ্জ্বল ও গাঢ় হয়েছে—যা এই দলিলের অতুলনীয় মান নিশ্চিত করে।
ঐতিহাসিক এই দলিলের শীর্ষে স্বর্ণালি ও লাল কালিতে মহান সৃষ্টিকর্তার স্তুতিবাক্য খোদাই করা আছে। তার ঠিক নিচেই একটি বর্গাকার সোনালি-লাল চিহ্নে শোভা পাচ্ছে সম্রাটের নাম। দলিলের শেষভাগে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এটি সম্রাট শাহ আলম দ্বিতীয়ের শাসনকালের চতুর্দশ বছরে জারি করা হয়েছিল—হিসাব অনুযায়ী যা আজ থেকে প্রায় ২৫০ বছর আগের এক অনন্য ইতিহাস।
