ছাপা অভিধানের বিদায়ঘণ্টা
পুরনো পল্টন দিয়ে হাঁটার সময় হঠাৎ একটি ছোট লাল বই আমার চোখে পড়ল; চকচকে পেপারব্যাক এবং পরীক্ষার গাইড বইগুলোর ভিড়ে এটি ছিল একেবারেই বেমানান। এটি ছিল একটি অভিধান—যা একসময় বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের নিত্যসঙ্গী ছিল।
তখনই মাথায় একটি প্রশ্ন এলো, "শেষ কবে আমি একটি ছাপা অভিধান খুলেছিলাম?"
আমি আসলে মনে করতে পারলাম না। স্মার্টফোন, সার্চ ইঞ্জিন, অ্যাপ এবং এখনকার এআই চ্যাটবটের এই যুগে ছাপা অভিধানগুলো তাদের প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে—বিশ্বজুড়ে এবং বাংলাদেশেও। বর্তমানে এগুলো প্রয়োজনের চেয়ে স্মারক হিসেবেই বেশি টিকে আছে; আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে এমন এক সময়ের কথা যখন একটি নতুন শব্দ শেখার জন্য স্ক্রিনে ট্যাপ করার বদলে পৃষ্ঠা উল্টাতে হতো।
বিশ্বজুড়ে পটপরিবর্তন
ছাপা অভিধানের এই পতন কেবল বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বজুড়ে বড় বড় প্রকাশনা সংস্থাগুলো এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সরে যাচ্ছে। ২০১০ সালে 'অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি' ঘোষণা করেছিল তাদের পরবর্তী সংস্করণটি সম্ভবত আর কখনোই ছাপা হবে না, এটি ছিল এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
এর কারণগুলো স্পষ্ট- সুবিধা, সহজলভ্যতা এবং কন্টেন্ট ক্রমাগত আপডেট করার সক্ষমতা। অনলাইন অভিধান বছরে কয়েকবার সংশোধন করা যায়, যেখানে ছাপা সংস্করণ বের করতে কয়েক দশক সময় লেগে যায়। এখন একটি রাইট-ক্লিক বা দ্রুত সার্চের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ, উচ্চারণ, শব্দতত্ত্ব এবং ব্যবহারের উদাহরণ পেয়ে যাচ্ছেন।
তবে এই রূপান্তর সমালোচনা মুক্ত নয়। কেউ কেউ স্পর্শের মাধ্যমে বই পড়ার অভিজ্ঞতা এবং পাতা উল্টে পড়ার আনন্দ হারানোর জন্য আক্ষেপ করেন—যেখানে একটি শব্দ খুঁজতে গিয়ে অপ্রত্যাশিত আরও কয়েকটি শব্দ আবিষ্কার করার সুযোগ থাকত।
একই সাথে, ডিজিটাল এই বিপ্লব একটি বৈপরীত্যও তৈরি করেছে। অভিধান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে, কিন্তু অভিধান ব্যবসা সংকটের মুখে পড়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে পূর্ণকালীন অভিধানলেখক বা লেক্সিকোগ্রাফারদের সংখ্যা গত দুই দশকে ২০০ থেকে কমে বর্তমানে এক-চতুর্থাংশেরও নিচে নেমে এসেছে।
বাংলাদেশি নস্টালজিয়া
বাংলাদেশেও এই পরিবর্তন সমানভাবে দৃশ্যমান, যদিও এটি পরিবর্তনশীল অভ্যাস, শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং প্রযুক্তির সহজলভ্যতার সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
এমন এক সময় ছিল যখন অভিধান ছিল প্রতিটি ছাত্রজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সাংস্কৃতিক কর্মী মো. শামসুল আরিফিন বলেন, "অভিধান একসময় সকল শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল, এখন বিলুপ্তির পথে।"
বাংলা একাডেমি বেশ কয়েকটি বড় ছাপা অভিধান প্রকাশ করে, যার মধ্যে রয়েছে 'ব্যবহারিক বাংলা অভিধান', 'সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান', 'সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান' এবং 'বাংলা একাডেমি বাংলা-ইংরেজি অভিধান'। অন্যান্য সুপরিচিত অভিধানের মধ্যে রয়েছে সংসদ বাংলা অভিধান, চলন্তিকা এবং বঙ্গীয় শব্দকোষ।
এছাড়াও বিশেষায়িত কাজের মধ্যে রয়েছে 'বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান', 'বাংলা উচ্চারণ অভিধান', 'বাংলা বানান অভিধান', 'মধ্যযুগের বাংলা ভাষার অভিধান', 'লেখক অভিধান', 'বাংলা একাডেমি চরিতাভিধান' এবং 'জয়কলি ইংরেজি থেকে বাংলা ডিকশনারি'।
এই অভিধানগুলো দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশে সবচাইতে স্বীকৃত এবং ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। তবে ডিজিটাল সরঞ্জাম, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন এবং অনলাইন অনুবাদ প্ল্যাটফর্মের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এগুলোর ব্যবহার কমেছে। বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার পরিবর্তে এগুলো ধীরে ধীরে দৈনন্দিন রেফারেন্স টুল থেকে আরও বিশেষায়িত একাডেমিক এবং সাহিত্যিক সম্পদে পরিণত হচ্ছে।
বাংলা একাডেমির তথ্য অনুযায়ী, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী সম্পাদিত 'বাংলা একাডেমি ইংলিশ-বেঙ্গলি ডিকশনারি' বইটিকে বাংলাদেশের একমাত্র একাডেমিক বই হিসেবে গণ্য করা হয় যা ১৯৯৩ সালে প্রথম প্রকাশের পর থেকে দশ লাখেরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে।
দীর্ঘ বছর ধরে অভিধানের বিক্রি ছিল বেশ। ২০২৩ বা ২০২৪ সালের মতো একটি সফল বছরে একাডেমি কেবল ফেব্রুয়ারি মাসেই তাদের শীর্ষ তিনটি অভিধানের ২০,০০০ থেকে ৪০,০০০ কপি বিক্রি করত, যার মূল চালিকাশক্তি ছিল অমর একুশে বইমেলার চাহিদা।
তবে এই ধারায় পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪-২৫ সালে মোট বার্ষিক বিক্রি ২০,০০০ থেকে ২৫,০০০ কপিতে নেমে এসেছে। এই পতন পাঠকদের অভ্যাসের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে দৈনন্দিন ব্যবহারে ডিজিটাল টুলগুলো ছাপা অভিধানের জায়গা দখল করে নিচ্ছে, যদিও এগুলোর একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব এখনো রয়ে গেছে।
ইংলিশ মিডিয়ামের শিক্ষার্থী সাদ খান বলেন, "সঠিক অর্থ খোঁজার জন্য ছোট বা মাঝারি আকারের অভিধান বহন করা আজকাল সেকেলে এবং বেশ সময়সাপেক্ষ। আমি অনলাইন এবং অফলাইন মোবাইল ডিকশনারি অ্যাপ ব্যবহার করি। এগুলো খুব সহজ এবং সময় বাঁচায়।"
ডিজিটাল টুলের উত্থান মানুষের শব্দের সাথে মিথস্ক্রিয়ার ধরন মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে। অনলাইন অভিধানগুলো কেবল সংজ্ঞার চেয়েও বেশি কিছু অফার করে; সেখানে সমার্থক শব্দ, বিপরীত শব্দ উচ্চারণ নির্দেশিকা, ব্যুৎপত্তি, উদাহরণ বাক্য এবং এমনকি ভিডিও অন্তর্ভুক্ত থাকে। এর অনেকগুলোই বিনামূল্যে পাওয়া যায় এবং নিয়মিত আপডেট করা হয়।
আরিফিন যেমনটি উল্লেখ করেছেন, "অনলাইন এবং অফলাইন ডিকশনারি অ্যাপগুলো অত্যন্ত দ্রুত, ব্যবহার-বান্ধব, হালকা, আকর্ষণীয় এবং পরিবর্তনযোগ্য। এছাড়া এটি উচ্চারণের সুযোগও দেয়, যা শব্দগুলো সঠিকভাবে উচ্চারণ করার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।"
এমনকি শিক্ষকরাও এই পরিবর্তন গ্রহণ করেছেন। মাইলস্টোন স্কুলের শিক্ষক নায়েফ মাহমুদ স্বীকার করেন, "যদি কোনো অজানা ইংরেজি শব্দের অর্থ দেখার প্রয়োজন হয়, আমি আমার ফোনে থাকা মোবাইল ডিকশনারি অ্যাপটি ব্যবহার করি। শেষ কবে আমি ছাপা অভিধান ব্যবহার করেছি তা মনে করা সত্যিই অসম্ভব। এটি বছরের পর বছর ধরে আমার বুকশেলফে পড়ে আছে।"
এক পড়তির বাজার
অভিধানের এই পতন সম্ভবত সবচাইতে স্পষ্ট নীলক্ষেতের বইয়ের বাজারে, যা একসময় অভিধান বিক্রিতে মুখরিত থাকত।
বইয়ের দোকানের মালিক রমজান আলী বলেন, "১০ বছরেরও বেশি সময় আগে অভিধানের ব্যাপক চাহিদা ছিল, কিন্তু এখন সারা বছরে আমি মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি বিক্রি করতে পারি।"
বর্তমানে অবশিষ্ট গ্রাহকরা সংখ্যায় খুবই কম; ইংরেজি বিভাগের ছাত্র যারা উচ্চারণের চিহ্ন খুঁজছেন, চাকরিপ্রার্থী যারা কাস্টমাইজড অভিধান কিনছেন এবং মেডিকেল শিক্ষার্থীরা যারা বিশেষায়িত অভিধান কিনছেন। তিনি আরও বলেন, "ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ছাড়া চাকরিপ্রার্থীরাও অভিধান কিনতে আসে, তবে তাদের সংখ্যা খুব কম।"
পকেট ডিকশনারির গল্পটি এই পতনকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। ১৯৯০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে এর বিক্রি ছিল মাসে ১০,০০০ কপি। আজ সেই সংখ্যা বছরে মাত্র ৫০০ কপিতে নেমে এসেছে।
নীলক্ষেতের বই বিক্রেতা আলমাস হোসেন বলেন, "অভিধানের চাহিদা কমে গেছে। পাঁচ থেকে সাত বছর আগেও আমরা প্রতিদিন দুই থেকে পাঁচটি অভিধান বিক্রি করতাম, বিশেষ করে কলেজ শিক্ষার্থী এবং যারা আইইএলটিএস-এর প্রস্তুতি নিচ্ছিল তাদের কাছে। এখন সেই সংখ্যা সপ্তাহে মাত্র এক বা দুটিতে নেমে এসেছে।"
তিনি আরও বলেন, "আমাদের এখনো অল্প কিছু গ্রাহক আছে, মূলত বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা যারা একাডেমিক উদ্দেশ্যে বাংলা থেকে বাংলা অভিধান কেনেন। আগে মানুষ শিক্ষিত হওয়ার নিদর্শন হিসেবে বাড়িতে একটি অভিধান রাখত। সেই সংস্কৃতি এখন আর নেই।"
জ্ঞানকোষ প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী শহীদ হাসান তরফদার বলেন, "অতীতে মানুষ উৎসাহ নিয়ে অভিধান কিনত। সেই উৎসাহ এখন ম্লান হয়ে গেছে।"
তিনি উল্লেখ করেন, "এর কারণগুলো একই সাথে প্রযুক্তিগত এবং অর্থনৈতিক। মোবাইল অ্যাপের উত্থানের ফলে ২০১৫-১৬ সালের দিকে বিক্রি ব্যাপকভাবে কমে যায়। একই সময়ে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। কাগজের দাম ২০১৮ সালের প্রতি রিম ৮০০-৯০০ টাকা থেকে বেড়ে এখন ১,৭০০-১,৮০০ টাকা হয়েছে। শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে। মুনাফা এখন আগের তুলনায় অর্ধেকও নেই।"
ভাষার ওপর প্রভাব
অর্থনীতির বাইরেও ছাপা অভিধানের পতন ভাষা শেখার প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।
নাজমা ইয়াসমীন হক লিখেছেন, "অভিধান হলো একটি ভাষা শেখার সরঞ্জাম।" তিনি বিশেষ করে দ্বিতীয় ভাষা শেখার ক্ষেত্রে এর গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। তবুও বাজারে অভিধানের প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও ব্যবহার কমেছে। তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন, "অভিধানের বৈচিত্র্য মানেই এই নয় যে আমাদের শিক্ষার্থীরা বা আমরা নিজেরা এগুলো বেশি বেশি ব্যবহার করছি। যদি তা-ই হতো, তবে ভাষা শেখার ক্ষেত্রে ক্রমাগত অবনতি ঘটত না।"
ইংরেজি অভিধানগুলো সফলভাবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরিত হলেও বাংলার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা জটিল। সংগীতা ইমাম হাইলাইট করেছেন যে, ডিজিটাল টুলগুলো ইংরেজি শেখাকে সহজ করে দিলেও (যেমন অটো-কারেকশন এবং গ্রামার সফটওয়্যার), বাংলা অভিধানগুলো তাল মেলাতে পারেনি।
তিনি লিখেছেন, "এখনো বাংলা অভিধানের ক্ষেত্রে অনলাইনে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা তৈরি হয়নি।" এই ঘাটতির কারণে অনির্ভরযোগ্য অ্যাপ এবং ওয়েবসাইটের সংখ্যা বাড়ছে, যা প্রায়ই ভুল অর্থ এবং বানান ছড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, "ভুল বানান এবং ভুল অর্থগুলো সঠিক হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।"
তিনি যুক্তি দেন যে, এর সমাধান নিহিত রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক হস্তক্ষেপে। প্রাথমিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে বাংলা একাডেমিকে বাংলা অভিধানের ডিজিটালাইজেশন এবং মানসম্মতকরণে নেতৃত্ব দিতে হবে। ডিজিটাল ইন্টিগ্রেশন ব্যাপক সম্পদগুলোকে আরও সহজলভ্য করতে পারে এবং ছড়িয়ে পড়া ভুলগুলো সংশোধন করতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডিজিটালাইজেশন মানে ছাপানো সংস্করণ পুরোপুরি ত্যাগ করা নয়। ইমাম নোট করেছেন, "ছাপা অভিধানের প্রয়োজনীয়তা থাকবে," তবে হয়তো আরও বিশেষায়িত প্রেক্ষাপটে।
বাংলাদেশে অভিধানের গল্পটি কেবল পতনের নয়; এটি রূপান্তরেরও।
ছাপা বই ডিজিটাল প্রতিযোগিতার মধ্যেও বিশ্বজুড়ে টিকে আছে। প্রতি বছর শত কোটি কপি বই বিক্রি হয়। কিন্তু অভিধান আলাদা। এগুলো হলো সরঞ্জাম (tools), আর সরঞ্জামের বিবর্তন ঘটে প্রযুক্তির সাথে সাথে।
আজ অভিধান হারিয়ে যায়নি; এটি স্থানান্তরিত হয়েছে। এটি এখন বাস করে সার্চ বার, অ্যাপ এবং অ্যালগরিদমে। এটি মানুষের পকেটে, হাতের তালুতে এবং একটি রাইট-ক্লিকের দূরত্বে।
বাংলাদেশ যখন এই রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন চ্যালেঞ্জটি পরিবর্তনের বিরোধিতা করা নয় বরং একে ব্যবস্থাপনা করা; যাতে সহজলভ্যতা যেন নির্ভুলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে এবং সুবিধা যেন সঠিক বোঝাপড়ার জায়গা দখল না করে।
