ডাকযোগে ভোটের সুযোগ থাকছে না স্থানীয় সরকার নির্বাচনে, ভোট হতে পারে বছরের শেষ নাগাদ
এবার সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখছে না নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের খসড়া বিধিমালা ও আচরণবিধিতে এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্দলীয় ভিত্তিতে আয়োজনের বিধানও বহাল রাখা হয়েছে।
সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় ইসি বলেছে, প্রবাসী ভোটারদের কাছে ব্যালট পাঠানো, তা সংগ্রহ ও যাচাই করা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গণনা প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল হবে।
কমিশন স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনের জন্য আচরণবিধির খসড়া তৈরি করেছে। গত ১০ জুন এসব খসড়া ইসির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে ৩০ জুনের মধ্যে জনসাধারণের মতামত চাওয়া হয়েছে।
রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল অর্ডার, ১৯৭২ অনুযায়ী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিদেশ থেকে ভোট দিতে পারেন। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন-সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনে এমন কোনো বিধান নেই।
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাসউদ টিবিএসকে বলেন, প্রবাসীদের ভোট দেওয়ার জন্য নতুন কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার সুযোগও থাকবে না।
ইসির এ সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করেছেন প্রবাসীরা। তারা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাদেরকে বাইরে রাখা বৈষম্যমূলক।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস স্টেট ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক তারেক আজিজ বলেন, "স্থানীয় নির্বাচনে ভোট দিতে না পারা খুবই হতাশাজনক। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা আমাদের পরিচিত এবং সড়ক, পানি সরবরাহসহ স্থানীয় উন্নয়ন ও সেবামূলক কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাদের নির্বাচনে ভোট দিতে না পারা কষ্টের।"
মালয়েশিয়াপ্রবাসী আহমেদুল কবির বলেন, প্রবাসীরা বিদেশে থাকলেও তাদের পরিবার, বাড়িঘর, জমিজমা সবই স্থানীয় এলাকাতেই থাকে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের নেওয়া সিদ্ধান্ত তাদের পরিবারের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
তিনি বলেন, "আমরা চাই, আমাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হোক।"
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার টিবিএসকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রবাসীদের জন্য ডাকযোগে ভোটের সুযোগ না রাখা যথাযথ হবে না।
তিনি বলেন, "তারা বাংলাদেশের নাগরিক ও ভোটার। তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।"
বদিউল আলম মজুমদার আরও বলেন, জাতীয় নির্বাচনে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা হয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনা করে সমাধান বের করা উচিত। কিন্তু এসব চ্যালেঞ্জের কারণে প্রবাসীদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা উচিত হবে না।
তার মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রবাসীদের ডাকযোগে ভোট দেওয়ার বিষয়ে আইনে স্পষ্ট বিধান না থাকলেও বিষয়টি নীতিগত। প্রবাসীদের সব নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত।
তিনি বলেন, "প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশন বিধিমালা বা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ ব্যবস্থা চালু করতে পারে। সরকার চাইলে আইনও সংশোধন করতে পারে। শেষ পর্যন্ত এটি একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত।"
জাতীয় নির্বাচনে ডাকযোগে ভোট
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার জন্য মোট ১৫ লাখ ২৮ হাজার ১৩১ জন ভোটার নিবন্ধন করেছিলেন। এর মধ্যে প্রবাসী ভোটার ছিলেন ৭ লাখ ৬৭ হাজার ২৩৩ জন।
নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে ১২ লাখ ২৪ হাজার ১৮৮ জন ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে বিদেশ থেকে ভোট দিয়েছেন ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৩৭২ জন।
ইসি জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছানো ব্যালটই শুধু গণনায় নেওয়া হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে ১০ লাখ ৭৩ হাজার ৪৯৭টি ভোট বৈধ হিসেবে গণ্য করা হয়।
বছরের শেষ নাগাদ স্থানীয় সরকার নির্বাচন হতে পারে
স্থানীয় সরকার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৬১টি জেলা পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা এবং নির্বাচন উপযোগী ১৩টি সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন পদ।
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাসউদ বলেন, আগামী অক্টোবরের মধ্যে সব প্রস্তুতি শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে ইসির। বছরের শেষ নাগাদ এসব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল সংসদে বলেন, আগামী সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। আগামী বছরের মধ্যে এসব নির্বাচন শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
