শিশু রামিসা ধর্ষণ-হত্যা মামলার রায় আজ, আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা জোরদার
রাজধানীর পল্লবীতে আলোচিত শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় করা মামলায় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে আজ রায় ঘোষণা করবেন আদালত। এ রায়কে ঘিরে আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
রোববার (৭ জুন) সকাল ১১টার দিকে ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে আসামিদের উপস্থিতিতে রায় ঘোষণা করা হবে।
রায়কে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গণে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য। আদালত চত্বর ও ট্রাইব্যুনাল এলাকায় বাড়ানো হয়েছে নজরদারিও।
সকাল থেকেই আদালত প্রাঙ্গণে বিভিন্ন গণমাধ্যমের কর্মীরা উপস্থিত হতে শুরু করেন। রায়কে ঘিরে আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। আদালতের বিভিন্ন স্থানে উৎসুক মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এরমধ্যে সকাল ৮টা ২৫ মিনিটের দিকে আসামি স্বপ্না আক্তারকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে আনা হয়েছে। পরে তাকে আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়।
এর প্রায় ২০ মিনিট পর, সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে প্রধান আসামি সোহেল রানাকেও আদালতে আনা হয়। পরে তাকেও হাজতখানায় রাখা হয়েছে।
এদিকে, মামলায় দ্রুত বিচার এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানিয়েছে রামিসার পরিবার।
বাদী ও ভিকটিমের বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বলেন, "শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু রাষ্ট্র নয়, পরিবার, প্রতিবেশী ও সমাজকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। যদি তা না পারেন, তাহলে অন্তত এমন একটি সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলুন, যেখানে আর কোনো বাবা-মায়ের বুক খালি হবে না। কোনো বাবা-মাকে সারা জীবন জিন্দা লাশ হয়ে বেঁচে থাকতে হবে না।"
তিনি আরও বলেন, "সন্তান যদি সমাজের এমন নৃশংসতার শিকার হয়, তাহলে এর দায় শুধু পরিবারের নয়; সমাজ ও রাষ্ট্রকেও এর জবাবদিহি করতে হবে। আমি আমার রামিসা হত্যার সুষ্ঠু বিচার চাই। বাংলাদেশের আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাশা করি এবং সেই শাস্তি দ্রুত কার্যকর হোক, সেটাই দেখতে চাই।"
গত ৪ জুন রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের জন্য এ দিন নির্ধারণ করেন আদালত।
যুক্তিতর্ক শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং আইনি বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি আদালতে বলেন, সাক্ষীরা সন্দেহাতীতভাবে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। তাই তিনি আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আবেদন জানান।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের বিশেষ আইনজীবী মুসা কালিমুল্লাহ আদালতে বলেন, ঘটনার সময় প্রধান আসামি সোহেল রানা নেশাগ্রস্ত ছিলেন। তিনি সোহেলের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে শুধু লাশ গুমের অভিযোগে দণ্ডের আবেদন জানান।
তিনি বলেন, সোহেল রানা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের নাম উল্লেখ করেননি। ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবে লাশ গুমে তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
গত ২ জুন মামলার ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন আদালত। সাক্ষীরা গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য, ভিডিও প্রমাণ ও বিভিন্ন আলামত আদালতে উপস্থাপন করেন। এতে রামিসাকে খোঁজার ঘটনা, সন্দেহভাজন ফ্ল্যাট শনাক্তকরণ, রক্তের আলামত উদ্ধার এবং শিশুটির মরদেহ উদ্ধারের বিষয় উঠে আসে। একই সঙ্গে অভিযোগ অনুযায়ী স্বপ্না আক্তার কীভাবে সোহেল রানাকে পালাতে সহায়তা করেছিলেন, সে বিষয়ও উল্লেখ করা হয়।
৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানিতে আদালত ১৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দি পড়ে শোনান। এরপর সোহেল রানার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি আদালতকে বলেন, "আমিও দোষ করছি, ডলারও দোষ করছে স্যার। ওরে ধরেন স্যার।"
পরে তিনি বলেন, "আমাকে মাফ করে দেন। আর আমার বউ কোনো দোষ করেনি, সে নির্দোষ।"
এ সময় বিচারক তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, "আপনার বিষয়ে আপনি বলুন।"
এরপর আদালত স্বপ্না আক্তারের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি প্রথমে নীরব থাকেন। পরে বিচারক তাকে জিজ্ঞাসা করেন, দরজা না খোলার বিষয়ে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দিতে চান কি না। একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেন, স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে একই শাস্তি তার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।
জবাবে স্বপ্না বলেন, "আমি কিছু করিনি স্যার, আমি নির্দোষ।"
এর আগে ২ জুন মামলার বাদী ও ভিকটিমের বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লার সাক্ষ্যের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ভিকটিমের মা পারভীন আক্তার, বড় বোন রাইসা আক্তার, ফুপু মাহমুদা আক্তার, চাচা মিজানুর রহমান লিটন, প্রতিবেশীসহ মোট ১৬ জন সাক্ষী আদালতে জবানবন্দি দেন।
গত ২৪ মে পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান তদন্ত শেষে সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। পরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে মামলাটি বিচারের জন্য শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠান।
মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা আক্তার (৮) গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বাসা থেকে বের হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, স্বপ্না আক্তার কৌশলে তাকে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে যান।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খুঁজতে গিয়ে তার বাবা-মা আসামিদের ফ্ল্যাটের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান। পরে ডাকাডাকিতে কোনো সাড়া না পেয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন তারা।
এ সময় শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ এবং একটি বড় বালতির মধ্যে তার মাথা দেখতে পান। সেখানে উপস্থিত স্বপ্না আক্তারকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান, তার স্বামী সোহেল রানা শিশুটিকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করেছেন।
এ ঘটনায় ১৯ মে রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। প্রথমে স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২০ মে সোহেল রানা আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। একই দিন স্বপ্না আক্তারকে কারাগারে পাঠানো হয়।
