আমি মন্ত্রী থাকলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কোনো সিন্ডিকেট হবে না: প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সিন্ডিকেটের সুযোগ দেওয়া হবে না।
আজ মঙ্গলবার (২ জুন) প্রবাসী কল্যাণ ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "আমি যদি মন্ত্রী থাকি, এখানে কোনো সিন্ডিকেট হবে না। জিরো টলারেন্স। ইনশাআল্লাহ ১০-১৫ দিন থেকে এক মাসের মধ্যে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।"
প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য মালয়েশিয়া সফর প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, এ নিয়ে আলোচনা চলছে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে নতুন কোনো সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বা চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত তথ্য তার কাছে নেই। তবে চলমান প্রক্রিয়া দ্রুতই পরিষ্কার হবে এবং সংশ্লিষ্ট কাজ এগিয়ে যাচ্ছে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে দীর্ঘদিন ধরে সীমিতসংখ্যক বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হয়, যা শ্রম অভিবাসন খাতে 'সিন্ডিকেট' হিসেবে পরিচিত।
রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর দাবি, এই সিন্ডিকেট পদ্ধতির সূচনা ২০১০ সালে। সে সময় মাত্র ১০টি এজেন্সিকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এটি শ্রম অভিবাসন নিয়ন্ত্রণকারী একটি শক্তিশালী ব্যবস্থায় পরিণত হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে ১০০ এজেন্সির একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং ২০২৪ সালের মে মাসের সময়সীমার আগে প্রায় ১৮ হাজার কর্মীকে মালয়েশিয়ায় পাঠাতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
প্রবাসীদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তিতে বিশেষ সেল
বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যা ও অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে 'অভিযোগ নিষ্পত্তি ও নিরসন সেল' গঠন করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
সোমবার (১ জুন) মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা থেকে জারি করা এক অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী জানান, এ আদেশ তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে। প্রবাসীরা এই সেলে সরাসরি অভিযোগ জমা দিতে পারবেন। পাশাপাশি হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমেও অভিযোগ গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে শিগগিরই বিস্তারিত প্রক্রিয়া জানানো হবে।
অফিস আদেশ অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং ও এনফোর্সমেন্ট অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব বা যুগ্মসচিবকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের এ সেল গঠন করা হয়েছে।
আদেশে বলা হয়েছে, minister@probashi.gov.bd এবং minister.expat@gmail.com ঠিকানায় প্রাপ্ত অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে সেলটি।
এ ছাড়া প্রাপ্ত অভিযোগ ও সেগুলোর বিষয়ে গৃহীত পদক্ষেপ দৈনিক বা সাপ্তাহিক ভিত্তিতে মন্ত্রী ও সচিবের কাছে উপস্থাপন করা হবে।
মন্ত্রী বলেন, "প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যার দ্রুত সমাধানের জন্যই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান অভিযোগ ব্যবস্থাও চালু থাকবে।"
তিনি বলেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রবাসীদের সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করা হবে।
প্রবাসী কার্ড চালুর পরিকল্পনা
আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, "প্রবাসী কার্ড হলে আলাদা করে বিএমইটি কার্ডের প্রয়োজন হবে না। এতগুলো কার্ডের প্রয়োজন কী? আমরা চাই একটি কার্ডের মাধ্যমেই যেন একজন প্রবাসী সব সুবিধা ভোগ করতে পারেন।"
মন্ত্রণালয় জানায়, শুধু রেমিট্যান্সযোদ্ধা নয়, ইউরোপ, আমেরিকা, লাতিন আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরাও এ কার্ডের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
মন্ত্রী বলেন, "কার্ডটি ক্রেডিট কার্ডের মতো কাজ করবে। আমাদের একটি সেল থাকবে। সেখানে আবেদন করা হবে, যাচাই-বাছাই শেষে যোগ্য প্রবাসীরা এ কার্ড পাবেন।"
তিনি জানান, প্রবাসী কার্ডের সুবিধাগুলোর চূড়ান্ত কাঠামো এখনো নির্ধারণ হয়নি। তবে এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা সংক্রান্ত সুবিধা, সহজে রেমিট্যান্স পাঠানোর সুযোগ, ব্যাংকিং সেবা, ডিজিটাল পরিচয় ও তথ্য ট্র্যাকিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে।
মন্ত্রী বলেন, "প্রবাসী কার্ডধারীদের ভূমি-সংক্রান্ত সেবায় অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়েও আমরা কাজ করছি। এ নিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে। একইভাবে হাসপাতালে গেলে তারা যেন বিশেষ অগ্রাধিকার পান, সে বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।"
প্রস্তাবিত প্রবাসী কার্ড সম্পর্কে তিনি বলেন, ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানো এবং বৈধভাবে বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসীদের তথ্য যাচাইয়ের ভিত্তিতে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হবে।
তার ভাষায়, "যারা বৈধভাবে দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেন, তাদের প্রতি রাষ্ট্রের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে।"
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কার্ডধারীরা স্বাস্থ্যসেবা, ব্যাংকিং সুবিধা, সরকারি সেবায় অগ্রাধিকারসহ বিভিন্ন বিশেষ সুবিধা পেতে পারেন। তবে এসব সুবিধার চূড়ান্ত কাঠামো এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
রিক্রুটিং এজেন্সির অনিয়মে কঠোর অবস্থান
এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, কোনো রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল হওয়ার পর তারা অন্য নামে ব্যবসা শুরু করছে কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে।
দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা
মন্ত্রী বলেন, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এলে তা তদন্ত করে দেখা হবে।
তিনি বলেন, "কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দোষী প্রমাণিত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। যা যা করার প্রয়োজন, আমরা করব। অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে।"
সংবাদ সম্মেলনে প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক ও মন্ত্রণালয়ের সচিব মোখতার হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
'মন্ত্রণালয়কে সিন্ডিকেট এবং দুর্নীতিমুক্ত করতে না পারলে চলে যাব'
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সিন্ডিকেটমুক্ত হবে কি না, রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়বে কি না, দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে অগ্রগতি হবে কি না এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করা হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, "এটা আমার চ্যালেঞ্জ। এটা যদি করতে না পারি, তাহলে চলে যাব। আমি বিষয়টিকে বিশেষভাবে নিয়েছি এবং আমরা এটাই চাই।"
