চিহ্নবিহীন গতিরোধক–খানাখন্দে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে রাজধানীর হাতিরঝিল সড়ক
রোববার দুপুরে হাতিরঝিলের এফডিসি বোট ঘাট এলাকা দিয়ে মোটরসাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিলেন সিনিয়র সাংবাদিক রাশিদুল হাসান। এ সময় চিহ্নবিহীন (আনমার্কড) একটি স্পিড ব্রেকার দেখতে না পেয়ে তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কে পড়ে যান। এতে তার মাথা ও পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে এবং নাক-মুখ দিয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়।
ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের প্রধান প্রতিবেদক (ডিজিটাল) রাশিদুল বর্তমানে লাইফ সাপোর্টে রয়েছেন।
পারিবারিক সূত্র জানায়, দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা তাকে প্রথমে তেজগাঁওয়ের সমরিতা হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে তাকে স্কয়ার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়।
সহকর্মীরা রাশিদুলকে একজন অভিজ্ঞ ও নিয়ম মেনে চলা মোটরসাইকেল চালক হিসেবেই চেনেন। প্রত্যক্ষদর্শীরাও জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার সময় তিনি দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন না।
স্থানীয় বাসিন্দা ও চালকদের অভিযোগ, চিহ্নবিহীন স্পিড ব্রেকার, খানাখন্দ ও দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণের কারণে হাতিরঝিল সড়কে দুর্ঘটনা বাড়ছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা জানান, চিহ্নবিহীন স্পিড ব্রেকার এবং হঠাৎ চোখে না পড়া বড় গর্তের কারণে প্রায়ই যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি খানাখন্দ মেরামতের জন্য সড়ক সংস্কার করা হলেও যথাযথ সাইনেজ ও নিরাপত্তা চিহ্ন না থাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। ছোটখাটো দুর্ঘটনা প্রায় নিয়মিত ঘটছে বলেও জানান তারা।
দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি কিংবা পর্যাপ্ত সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের ভাষ্যমতে, রাতে চিহ্নবিহীন স্পিড ব্রেকার প্রায় দেখাই যায় না। আর বৃষ্টির সময় গর্তগুলো পানিতে ভরে যাওয়ায় প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে যাত্রীদের।
দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ
প্রায় ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই চক্রাকার সড়কের ৮ কিলোমিটার অংশ বর্তমানে চালু রয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) তত্ত্বাবধানে নির্মিত সড়কটির বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি একাধিক স্থানে কোনো ধরনের সাদা মার্কিং, রিফ্লেক্টর বা সতর্কসংকেত ছাড়াই বসানো হয়েছে স্পিড ব্রেকার। ফলে দ্রুতগতির যানবাহন হঠাৎ ব্রেক করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে।
সম্প্রতি পুলিশ প্লাজা থেকে রামপুরা, মধুবাগ, এফডিসি ও তেজগাঁও অংশ ঘুরে দেখা যায়, অনেক এলাকায় সড়কবাতিও অকার্যকর। নেই রোড মার্কিং কিংবা স্পিড ব্রেকারের দৃশ্যমান কোনো চিহ্ন। বর্ষার পানি জমে থাকায় দূর থেকে অনেক গর্ত বোঝারও উপায় থাকে না। ফলে হাতিরঝিলের এই ৮ কিলোমিটার সড়ক এখন চালক ও যাত্রীদের কাছে দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
মধুবাগ এলাকার এক হকার বলেন, "গত সপ্তাহেও রাতে একটি মোটরসাইকেল গর্তে পড়ে পিছলে যায়। এতে এক আরোহীর পা ভেঙে গেছে।"
হাতিরঝিল সড়কে চলাচলকারী মোটরসাইকেল চালক শাহাদাত বিপ্লব বলেন, "এখানে গতিরোধকে কোনো মার্কিং নেই। ফলে হঠাৎ করে বোঝা যায় না কোথায় স্পিড ব্রেকার রয়েছে। অনেক দিন ধরে কাজ চললেও এখনো কোনো চিহ্ন দেওয়া হয়নি।"
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুজ্জামান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "বেশিরভাগ সময় দুর্ঘটনার পর মোটরসাইকেল বা গাড়ির চালক নিজেরাই চলে যান। পুলিশকে জানানো হয় না। তবে কেউ মারা গেলে বা অভিযোগ করলে আমরা বিষয়টি দেখি। সড়কের গর্ত বা স্পিড ব্রেকারে চিহ্ন দেওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলতে পারবে।"
সড়ক সংস্কার শেষে স্পিড ব্রেকারে মার্কিং: রাজউক
প্রকল্পটির তত্ত্বাবধানে থাকা রাজউক জানিয়েছে, সড়ক সংস্কারের কাজ চলমান রয়েছে। প্রায় ১১ দশমিক ৫ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ৮ কিলোমিটারের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
রাজউকের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) তাসমিন হুদা বলেন, বাকি কাজ শেষ হলে রোড মার্কিং ও স্পিড ব্রেকারের সাইনেজ (নির্দেশক চিহ্ন) বসানো হবে।
তিনি বলেন, প্রশাসনিক জটিলতা ও বৃষ্টির কারণে কাজে বিলম্ব হয়েছে। নির্বাচনকালীন সময়েও কাজ বন্ধ ছিল। বৃষ্টির কারণেও অগ্রগতি ধীর হয়েছে। ঈদের পর পুরোদমে কাজ আবার শুরু হবে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক নেটওয়ার্কে পরিণত হলেও হাতিরঝিল প্রকল্পের দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার অভাবে এটি এখন দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় পরিণত হয়েছে।
