চট্টগ্রামে ‘দেশের প্রথম সৌরশক্তি-চালিত’ কোল্ড স্টোরেজ চালু করল র্যানকন
চলমান বিদ্যুৎ সংকট ও জ্বালানির ক্রমবর্ধমান দামের মধ্যে চট্টগ্রামের সদরঘাট এলাকায় নিজেদের সি-ফিশিং ডিভিশনে কোল্ড স্টোরেজ চালু করেছে র্যানকন গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এটিই 'দেশের প্রথম সৌরশক্তিচালিত' কোল্ড স্টোরেজ।
র্যানকন ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের বাস্তবায়নে এই প্রকল্পটি কোল্ড স্টোরেজের ছাদে স্থাপন করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রায় ১.৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে মাত্র দুই মাসে প্রকল্পটি সম্পন্ন করা হয়েছে এবং গত এপ্রিল মাস থেকে এটি চালু হয়েছে। প্রকল্পটির উৎপাদন সক্ষমতা ২৯৬ কেডব্লিউপি ডিসি (কিলোওয়াট-পিক ডিরেক্ট কারেন্ট) ও ২৫০ কিলোওয়াট এসি।
প্রায় ২৮ হাজার বর্গফুট ছাদে মোট ৪৮২টি সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে। ৬১৫ ওয়াট-পিক সক্ষমতার প্রতিটি প্যানেলের দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৩৮২ মিলিমিটার ও প্রস্থ ১ হাজার ১৩৪ মিলিমিটার। স্বাভাবিক রোদেলা দিনে প্রতিটি প্যানেল প্রায় ২.৮ কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে; আর মেঘলা বা বর্ষার দিনে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ২.২ কিলোওয়াট-ঘণ্টা।
সৌর প্রযুক্তিতে '২,৩৮২ মিমি বাই ১,১৩৪ মিমি' বলতে মূলত উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন এবং বড় আকারের বাইফেসিয়াল (উভয় দিক থেকে শক্তি উৎপাদনে সক্ষম) সোলার মডিউলের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থকে বোঝায়।
কোম্পানির তথ্য অনুসারে, ৫০০ টন মাছ সংরক্ষণের জন্য এই কোল্ড স্তরেজে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ২০০ কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়।
কর্মকর্তারা বলেন, রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়ায় এই সোলার সিস্টেম হিমাগারের দিনের বেলার প্রায় পুরো বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে সক্ষম।
এই সিস্টেম স্থাপনের আগে কোল্ড স্টোরেজটির মাসিক বিদ্যুৎ বিল আসত প্রায় ৬.৭২ লাখ টাকা। এখন তা কমে ২.৫৯ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। ফলে প্রতি মাসে সাশ্রয় হচ্ছে প্রায় ৪.১৩ লাখ টাকা।
খরচ কমানোর পাশাপাশি প্রকল্পটি পরিবেশ রক্ষায়ও ভূমিকা রাখবে। কোম্পানিটির প্রাক্কলন অনুসারে, এর ফলে বছরে প্রায় ২১০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ রোধ করা সম্ভব হবে।
বিদ্যুতের চাহিদা যখন কম থাকে, তখন সোলার প্যানেলে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
তবে এখানে কোনো ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেম স্থাপন না করায় এখনো রাতের বেলায় বিদ্যুতের জন্য জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভর করতে হয়। কর্মকর্তারা বলছেন, উচ্চ আমদানি শুল্ক ও যন্ত্রপাতির অতিরিক্ত দামের কারণে ব্যাটারি স্টোরেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা বাণিজ্যিকভাবে এখনো চ্যালেঞ্জিং।
র্যানকন সি-ফিশিং ডিভিশনের বেইস ইঞ্জিনিয়ার সাদ্দাম হোসেন টিবিএসকে বলেন, এ প্রকল্প একইসাথে আর্থিক ও পরিবেশগত সুবিধা দিচ্ছে।
'এই ব্যবস্থাটি কোল্ড স্টোরেজে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি বিদ্যুৎ খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিচ্ছে,' উল্লেখ করে তিনি বলেন, অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি এটি পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণেও সহায়ক ভূমিকা রাখছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তি সুবিধা দেবে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন পরিবেশগত মানদণ্ড মেনে চলা সরবরাহকারীদের বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে, বিশেষ করে সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের মতো রপ্তানিমুখী শিল্পের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত জরুরি।
র্যানকন ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চিফ অপারেটিং অফিসার সুবাইল বিন আলম বলেন, এই সোলার প্রকল্পটি প্রায় ২৫ বছর চালু থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে।
উচ্চ শুল্কের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ
দেশের কোল্ড স্টোরেজগুলোতে সাধারণত যেসব রেফ্রিজারেশন সিস্টেম ব্যবহার করা হয়, তা মাইনাস ১৮ থেকে মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় চলে। এতে প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ হয়।
সুবাইল বিন আলম বলেন, বাংলাদেশে ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু দেশের বিদ্যমান কর কাঠামো ও আমদানি শুল্ক ব্যবস্থার কারণে বিনিয়োগকারীরা হিমশিম খাচ্ছেন।
তিনি বলেন, 'বাংলাদেশে এক অদ্ভুত বাস্তবতা বিরাজমান। আমাদের পর্যাপ্ত সূর্যালোক এবং ছাদে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের অপার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু উচ্চ শুল্ক ও নীতিগত বাধার কারণে উদ্যোক্তারা একে লাভজনক করে তুলতে পারছেন না।'
তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক শূন্য বা শূন্যের কাছাকাছি রেখেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রাংশের জন্য ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ আমদানিনির্ভর।
সুবাইল বলেন, আসন্ন জাতীয় বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের বাধাগুলো দূর করার বড় সুযোগ রয়েছে।
