সংসদে ফজলুর রহমানের মন্তব্যে উত্তেজনা: বিরোধী দলের প্রতিবাদ ও এক্সপাঞ্জের দাবি
জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনাকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) এক উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক বাগ্বিতণ্ডা ও হট্টগোল শুরু হয়।
বিশেষ করে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের তুলনা এবং জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে করা মন্তব্যে সংসদ কক্ষে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে স্পিকারকে বারবার হস্তক্ষেপ করতে হয়।
বক্তব্যের শুরুতে ফজলুর রহমান তার নিজ এলাকা কিশোরগঞ্জের হাওড় অঞ্চলের দুর্দশার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "হাওড় অঞ্চলের মানুষের একমাত্র ফসল শিলাবৃষ্টি ও আগাম বন্যায় তলিয়ে যাচ্ছে। তাদের সারাবছর অন্যের ওপর নির্ভর করতে হবে। আমি সরকারকে অনুরোধ করছি এই অঞ্চলকে বাঁচাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিন এবং হাওড় ব্যবস্থাপনায় একটি পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করুন।" এরপর তিনি রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, ভাষণে মুক্তিযুদ্ধের কথা থাকলেও তা আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা হলে আরও মহিমান্বিত হতো।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে ফজলুর রহমান মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের তুলনা টেনে বলেন, 'স্বাধীনতা সংগ্রাম কোনো স্বল্প সময়ের ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ফল। মুক্তিযুদ্ধ প্রশান্ত মহাসাগরের মতো বিশাল। এর সঙ্গে অন্য কোনো স্বল্পমেয়াদি আন্দোলনের তুলনা করা যায় না।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'আগস্ট কোনো বিপ্লব নয়, এটি একটি গণঅভ্যুত্থান। আমি আগস্টকে ছোট করছি না, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ৫ই আগস্টের তুলনা করা মানে হিমালয় পর্বতের সঙ্গে টিলার তুলনা করা।'
তার এই মন্তব্যের সময় সরকারি দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানালেও বিরোধী দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে তীব্র প্রতিবাদ ও চিৎকার শুরু করেন। ফজলুর রহমান বলেন, তিনি নিজেও ৫ই আগস্ট রাজপথে ছিলেন এবং ১০ বছর ধরে আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের লড়াই চালিয়েছেন।
উত্তেজনা আরও বাড়ে যখন ফজলুর রহমান বিরোধী দলীয় নেতার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, 'কেউ যদি নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক বলে এবং একই সাথে জামায়াত করে, তবে সেটি ডাবল অপরাধ। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াত করতে পারে না।' এই মন্তব্যের পর বিরোধী দলের সদস্যরা আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার শুরু করেন এবং প্রতিবাদ জানান।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্পিকার বলেন, 'মাননীয় সদস্যবৃন্দ, সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষা করুন। এটি জাতীয় সংসদ, সারা জাতি লাইভ টেলিকাস্টে দেখছে। কারও বক্তব্যে আপত্তি থাকলে পরে যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করুন।' তিনি ফজলুর রহমানের বক্তব্য এবং বিরোধী দলীয় নেতার দাবি পরীক্ষা করে কোনো অসংসদীয় শব্দ থাকলে তা 'এক্সপাঞ্জ' করার আশ্বাস দেন।
হট্টগোলের মধ্যেও ফজলুর রহমান পুনরায় বক্তব্য শুরু করে ৫ই আগস্ট পরবর্তী সহিংসতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, "থানা লুট হয়েছে, পুলিশ হত্যা হয়েছে—এগুলোর তদন্ত হওয়া উচিত। এগুলো কোনোভাবেই ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) পাওয়ার কথা না।" এছাড়া ১৪ই ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যাকারীদের বিষয়ে কোনো শোক প্রস্তাব নেওয়া হলে ইতিহাস ভুল বার্তা পাবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
