দক্ষতার ঘাটতি কমাতে জেলা পর্যায়ে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ সেন্টার চালু করবে সরকার
চাকরি প্রার্থীদের সরকারি ও বেসরকারি চাকরির তথ্য দিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ সেন্টার চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে নেওয়া ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার আওতায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় আগামী ৩০ আগস্টের মধ্যে দেশের অন্তত পাঁচটি জেলায় এসব কেন্দ্র চালুর লক্ষ্য নিয়েছে।
এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জগুলোতে চাকরির তথ্যের পাশাপাশি কোন ধরনের দক্ষতা অর্জন করলে কী ধরনের চাকরি পাওয়া যাবে এবং কোথা থেকে সেই দক্ষতার প্রশিক্ষণ নেওয়া যাবে—এসব তথ্যও দেওয়া হবে।
কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফোকাল পয়েন্ট যুগ্মসচিব এ কে এম ফজলুর রহমান টিবিএসকে বলেন, "কর্মসংস্থান সংক্রান্ত তথ্য বিনিময়ের জন্য এই এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে চাকরি প্রত্যাশী ও চাকরিদাতা উভয়পক্ষই উপকৃত হবেন।"
তিনি বলেন, "অল্প শিক্ষিত বা শিক্ষিত অনেক তরুণ-তরুণীরই কোন খাত তাদের জন্য উপযুক্ত, সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকে না। দেশের কোন খাতে কী ধরনের জনবলের চাহিদা রয়েছে, সেটিও অনেকের অজানা। এই এক্সচেঞ্জ সেই তথ্য দেবে এবং ক্যারিয়ার গাইডলাইন হিসেবে কাজ করবে।"
তিনি আরও বলেন, "এর মাধ্যমে কর্মপ্রত্যাশীদের একটি তথ্যভান্ডার তৈরি হবে, যা থেকে চাকরিদাতারা প্রয়োজনীয় জনবল সহজে খুঁজে নিতে পারবেন।"
তবে এ বিষয়ে ভিন্নমত দিয়েছেন একজন সাবেক শ্রম সচিব। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি টিবিএসকে বলেন, তথ্যভান্ডার তৈরির পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া বেশি জরুরি। তার মতে, দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র থেকেই এসব তথ্য ও দিকনির্দেশনা দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, "তৈরি পোশাক খাত দেশে বড় কর্মসংস্থান তৈরি করেছে, তবে এ খাতে নানা সমস্যাও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দক্ষ শ্রমিকরাও দীর্ঘমেয়াদে কাজের সুযোগ পান না এবং একসময় তাদের চাকরি হারাতে হয়।"
জানা গেছে, শ্রম ও কর্মসংস্থান অধিদপ্তরের অধীনে এসব এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ জন্য একটি সফটওয়্যারভিত্তিক তথ্যভান্ডার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় শ্রম আইন সংস্কার ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ রয়েছে, যার মাধ্যমে শিশুশ্রম ও জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বর্তমানে ৬৫টি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে। সরকার আগামী ৩০ এপ্রিলের মধ্যে উপযুক্ত খাত নির্বাচন করে মজুরি নির্ধারণের উদ্যোগ নেবে।
পাশাপাশি চা, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং আয়রন ফাউন্ড্রি খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি আগামী ৩০ জুনের মধ্যে ঘোষণা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই কর্মসূচির আওতায় আগামী ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া শ্রম সংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) পদ্ধতি চালু করা হবে। নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় চট্টগ্রামের কালুরঘাট ও নারায়ণগঞ্জে হোস্টেল স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার জন্যও বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তৈরি পোশাক খাতের সব কারখানায় যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি গঠন করা হবে এবং আগামী ৩০ জুনের মধ্যে অন্তত ৩০০টি কোম্পানিকে ওয়ার্কার প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডের আওতায় আনা হবে।
এই তহবিলে অন্তর্ভুক্ত কোম্পানিগুলোকে তাদের লভ্যাংশের ৫ শতাংশ শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে দিতে হয়। এ তহবিল থেকে শ্রমিকদের চিকিৎসায় এক লাখ টাকা এবং মৃত্যুর ক্ষেত্রে পরিবারকে দুই লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হয়।
এছাড়া শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষাবৃত্তিও দেওয়া হয়। কর্মহীন শ্রমিকদের সহায়তায় চলতি অর্থবছরের বাকি সময়ে ৪,৫০০ শ্রমিককে মাসে ৫ হাজার টাকা করে তিন মাস পর্যন্ত দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ বিষয়ে শ্রম মন্ত্রণালয়ের ফোকাল পার্সন যুগ্মসচিব তাহমিনা বেগম টিবিএসকে বলেন, "যারা আগে অন্তত ছয় মাস কাজ করেছেন কিন্তু বর্তমানে বেকার, তাদের কর্মহীন শ্রমিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাদের তিন মাস পর্যন্ত মাসে ৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়।"
তিনি জানান, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩,৫০০ শ্রমিককে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল, যার মধ্যে প্রথম আট মাসে ৩,২০০ জনকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ১৮০ দিনের কর্মসূচির আওতায় অতিরিক্ত ১,৫০০ শ্রমিককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিমের আওতায় দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের জন্য সহায়তার পরিমাণ বাড়ানো এবং আহত শ্রমিকদের সুবিধা বৃদ্ধির পরিকল্পনাও রয়েছে।
