তৃতীয় প্রান্তিকে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলোর মুনাফা বেড়েছে; লোকসানে গ্যাস ও শিল্প খাত
২০২৫-২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো মিশ্র আর্থিক ফলাফল দেখিয়েছে। খাতভেদে ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতির কারণে ফলাফলের এরকম তারতম্য হয়েছে।
প্রান্তিক ভিত্তিক আর্থিক তথ্য বলছে, জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠান, বিশেষত তেল বিপণন কোম্পানিগুলো ধারাবাহিকভাবে মুনাফা করছে। তবে আর্থিক, গ্যাস ও শিল্প খাতের কিছু রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এখনো চাপে রয়েছে—যা এসব খাতের কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
তেল কোম্পানিগুলোর ধারাবাহিক মুনাফা
তালিকাভুক্ত তিন তেল বিপণন কোম্পানি—পদ্মা অয়েল কোম্পানি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েল—চলতি অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে মুনাফা করেছে।
তবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এসব কোম্পানির রাজস্ব কিছুটা কমেছে। কারণ তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর আয় কমেছে মূল ব্যবসা থেকে। অবশ্য নন-অপারেটিং আয় কোম্পানির মুনাফায় বড় প্রভাব ফেলেছে।
আলোচ্য প্রান্তিকে কোম্পানিগুলোর নগদ অর্থ ও মজুত ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন এসেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামা, আমদানি ব্যয়, মজুত ব্যবস্থাপনা ও নগদ প্রবাহের পরিবর্তনের প্রভাব কোম্পানিগুলোর আর্থিক চিত্রে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
এই প্রান্তিকে পদ্মা অয়েল ১৩২.৩৭ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৪৫.৩৮ কোটি টাকা। এ সময় কোম্পানির রাজস্ব কমে দাঁড়িয়েছে ৮৫.৪৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৯২.৩০ কোটি টাকা।
মেঘনা পেট্রোলিয়ামের মুনাফা কমে ৮৩.৯৪ কোটি টাকায় নেমে এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৪১ কোটি টাকা। একইভাবে রাজস্ব কমে ২২.৯৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২৮.০২ কোটি টাকা।
কোম্পানিটি জানিয়েছে, গ্রাহকদের কাছ থেকে আয় কম হওয়া এবং সরবরাহকারী ও কর্মীর অর্থ প্রদানের পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণে পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে পরিচালন কার্যক্রম থেকে নিট নগদ প্রবাহে বড় ধরনের হ্রাস দেখা গেছে।
অন্যদিকে যমুনা অয়েল মুনাফায় প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। কোম্পানিটি এ প্রান্তিকে ১৩৯.৭৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১১০.৭৮ কোটি টাকা। তবে তাদের রাজস্ব কমে ৫২.১২ কোটি টাকায় নেমে এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৭০.৪১ কোটি টাকা।
কোম্পানিটি তাদের আর্থিক ফলাফলের ব্যাখ্যায় বলেছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের সংশ্লিষ্ট সময়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে রাখা আমানতের ওপর প্রাপ্য সুদ অনিশ্চিত হওয়ায় সেটি হিসাবভুক্ত বা আয় হিসেবে গণ্য করা হয়নি। সাধারণত এই ধরনের সুদ আয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হলে কোম্পানির মোট আয় ও নিট মুনাফা বাড়ে। কিন্তু অনিশ্চয়তার কারণে তা অন্তর্ভুক্ত না করায় নিট মুনাফা কমেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে শেয়ারপ্রতি আয়ের (ইপিএস) ওপর।
কোম্পানিটি আরও বলেছে, অনিশ্চিত আয় বাদ দিয়ে রক্ষণশীল হিসাবনীতি অনুসরণ করার ফলে প্রতিবেদনে ইপিএস আগের তুলনায় কম দেখিয়েছে। এছাড়া ক্রেডিট ও অ্যাক্রুয়ালস কমে যাওয়ায় ২০২৫ সালের জুনের তুলনায় শেয়ারপ্রতি নিট অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো কমেছে বলে কোম্পানিটি উল্লেখ করেছে।
৭টি প্রতিষ্ঠান লোকসানে
আর্থিক খাতের কোম্পানি ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অভ বাংলাদেশ (আইসিবি) এখনও বড় লোকসানে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এ প্রান্তিকে ২৭৭ কোটি টাকা লোকসান করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৬১ কোটি টাকা। উল্লেখযোগ্যভাবে, এ সময় তাদের রাজস্ব ঋণাত্মক হয়ে ২২১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে আগের বছর তা ছিল ৬৩ কোটি টাকা ঋণাত্মক।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ২২৪ কোটি টাকা লোকসান করেছে, যা আগের বছর ছিল ২৩৬ কোটি টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির রাজস্ব ৯ হাজার ২২ কোটি টাকা থেকে কমে ৮ হাজার ৬১৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) লোকসান কমাতে পেরেছে। প্রতিষ্ঠানটি এ প্রান্তিকে লোকসান ৩২ কোটি টাকা লোকসান করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৭২ কোটি টাকা। এ সময় তাদের রাজস্ব সামান্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮২.৪১ কোটি টাকা।
ন্যাশনাল টিউবস লিমিটেড লাভ থেকে লোকসানে চলে গেছে। প্রতিষ্ঠানটি এ প্রান্তিকে ১.৩১ কোটি টাকা লোকসান করেছে, যেখানে আগের বছর একই সময়ে ১.৪৩ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল। এ প্রান্তিকে কোম্পানিটির রাজস্ব কমে ৮.১২ কোটি টাকায় নেমে এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৩.৫১ কোটি টাকা।
ইস্টার্ন কেবলস লিমিটেডও লোকসানে রয়েছে। এই প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটি ৩.৪৫ কোটি টাকা লোকসান করেছে, যা আগের বছর ছিল ৩.৫৮ কোটি টাকা। তবে তাদের রাজস্ব সামান্য বেড়ে ৮.৫২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
আইসিবির লোকসান মূলত পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটেরই প্রতিফলন। অন্যদিকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিপণন কোম্পানিগুলোর টানা লোকসান ইঙ্গিত দেয়, পরিচালনাগত দুর্বলতা, ব্যয় কাঠামোর চাপ ও বাজার পরিস্থিতি এখনো তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
কিছু প্রতিষ্ঠানের ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অভ বাংলাদেশ লিমিটেড উল্লেখযোগ্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এ প্রান্তিকে ৯৪ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যেখানে আগের বছর একই সময়ে ১৮৬ কোটি টাকা লোকসান ছিল। রাজস্বও বেড়ে ৭১৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
কোম্পানিটি জানিয়েছে, এ বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় তাদের ইপিএস ৬.৫৮ টাকা বেড়েছে। মোট আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়া ও সামগ্রিক ব্যয় কমিয়ে আনাকেই এই উন্নতির মূল কারণ হিসেবে দেখছে তারা।
বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিসিএল) শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেড়ে ৭৪.৪৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর ছিল ৪৭.৮২ কোটি টাকা। রাজস্ব বেড়ে ১২৫.৩১ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
কোম্পানিটি জানিয়েছে, ইপিএস বৃদ্ধির মূল কারণ হলো এই সময়ে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম থেকে রাজস্ব ও অন্যান্য আয় বৃদ্ধি পাওয়া।
ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টস ব্লেন্ডারস লিমিটেডও ভালো প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। প্রতিষ্ঠানটি এ প্রান্তিকে ৪.২৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১.৫৭ কোটি টাকা। এ সময় তাদের রাজস্ব বেড়ে ২৩.৯৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
পাওয়ার গ্রিড ও বিএসসিসিএলের মতো প্রতিষ্ঠানের উন্নতি দেখায় যে, সঠিক ব্যবস্থাপনা, চাহিদা বৃদ্ধি ও কার্যকর নীতিমালা থাকলে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোও ভালো পারফরম্যান্স দিতে পারে।
