ফের পুরোদমে ব্যাংকিং সেবা চালু ন্যাশনাল ব্যাংকের: চাহিদামতো বিভিন্ন শাখা থেকে টাকা তুলতে পারছেন গ্রাহকরা, দিচ্ছেন জমাও
ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে আবারও চাহিদামতো টাকা তুলতে পারছেন গ্রাহকেরা। পাশাপাশি ব্যাংকটির কয়েকটি শাখায় ব্যবসায়িক হিসাবেও টাকা জমা দিচ্ছেন গ্রাহকেরা।
আজ বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকাল ১০ টা থেকে ব্যাংকটির সব শাখা ও এটিএম চাহিদামতো টাকা তুলতে পারছেন গ্রাহকরা। রাজধানীর মতিঝিল, দিলকুশা ও ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখা ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে।
এর আগে, ১৫ অক্টোবর থেকে ব্যাংকটির সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা চালু হবে বলে টিবিএসকে জানিয়েছিলেন ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান মেলিতা মেহজাবীন। একই সঙ্গে সব শাখা ও এটিএম বুথে পর্যাপ্ত তারল্য নিশ্চিত করা হবে বলেও জানান তিনি।
১১ অক্টোবর বড় অঙ্কের আমানতকারীদের কাছ থেকে টাকা তোলার আবেদন নেওয়া শুরু করেছিল ব্যাংকটি।
অনিয়ম ও দুর্বল সুশাসনের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ন্যাশনাল ব্যাংক পূর্ণ সক্ষমতায় কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছিল না বলে জানান মেলিতা মেহজাবীন।
তিনি বলেন, 'এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংককে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালুর নির্দেশ দিয়েছে। গ্রাহকেরা এখন সব ধরনের ঋণপত্র (এলসি) খুলতে পারবেন। পাশাপাশি চেক, আরটিজিএস, এনপিএসবি ও অন্যান্য বিদ্যমান সেবার মাধ্যমে টাকা তুলতে পারবেন।'
মেহজাবীন জানান, ন্যাশনাল ব্যাংক দেশের প্রথম বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক। ব্যাংকটির রয়েছে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। একসময় এর আমানতের পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
তিনি বলেন, 'এখনো গ্রাহকদের ব্যাংকটির ওপর আস্থা রয়েছে। ১৫ অক্টোবর থেকে সব সেবা পাওয়া যাচ্ছে—এটি দেখার পর গ্রাহকেরা আবারও আমাদের কাছে টাকা জমা দেওয়া শুরু করবেন বলে আশা করছি।'
আগের মতো সেবা দিতে ব্যাংকটির ২২১টি শাখা, ৬৫টি উপশাখা ও ৫৩টি এটিএম বুথ প্রস্তুত রাখা হবে বলেও উল্লেখ করেছিলেন তিনি।
আজ মতিঝিল শাখার ক্যাশ কাউন্টার থেকে ২০ হাজার টাকা তোলেন গ্রাহক এম এ খান। তিনি টিবিএসকে বলেন, 'গত দুই বছরে ন্যাশনাল ব্যাংকে যে সেবা পেয়েছি, আজকের চিত্র তার চেয়ে পুরোপুরি ভিন্ন। আগে কোনো ধরনের আবেদন না করেই টাকা তুলতে পেরে আমি খুব খুশি।'
শাখাটির ব্যবস্থাপক রোকসানা পারভিন টিবিএসকে বলেন, 'গ্রাহকদের জমা দেওয়া আবেদনগুলো প্রধান কার্যালয়ে পাঠানোর অপেক্ষা না করে আমরা আগেই টাকা পরিশোধ করেছি।'
তিনি জানান, বৃহস্পতিবার ওই শাখায় ৭৩ লাখ টাকা জমা পড়েছে। অন্যদিকে, গ্রাহকেরা এখন পর্যন্ত ৬ লাখ টাকা তুলে নিয়েছেন। আমানত জমা দেওয়া গ্রাহকদের মধ্যে এইচ ইন্টারন্যাশনাল ও এইচপি ট্রেডার্স রয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটি যথাক্রমে ৩০ লাখ টাকা করে জমা দিয়েছে।
মতিঝিলের দিলকুশা শাখায়ও গ্রাহকদের চাহিদামতো টাকা তুলতে দেখা গেছে।
শাখাটির অপারেশনস ম্যানেজার চন্দন কুমার দাস টিবিএসকে বলেন, ১১ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত ৬৪ জন গ্রাহক আমানতের টাকা তোলার আবেদন করেছেন। এসব আবেদনের বিপরীতে মোট অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি টাকা।
তিনি বলেন, 'আজ আবেদনকারীদের বাইরেও প্রায় ১০০ জন গ্রাহককে তাদের আমানতের টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। গ্রাহকপ্রতি সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত পরিশোধ করা হয়েছে।'
দিলকুশা শাখার গ্রাহক শামসুজ্জোহা টিবিএসকে বলেন, 'আজ একটি চেক দিয়ে এক লাখ টাকা তুলেছি। এর চেয়ে বেশি টাকাও তুলতে পারতাম।'
শাখাটির ক্যাশ কাউন্টারে দায়িত্ব পালন করা এক নারী কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিবিএসকে বলেন, সকাল থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত তারা ৩৬ জন গ্রাহককে সেবা দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজনকে সর্বোচ্চ সাড়ে ৪ লাখ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, ন্যাশনাল ব্যাংকের মতিঝিল ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখায়ও গ্রাহকদের আমানত উত্তোলনের আবেদনের বিপরীতে টাকা পরিশোধ করতে দেখা গেছে।
শাখাটির সেকেন্ড ম্যানেজার মাহবুবুর রহমান বলেন, 'কয়েকটি হিসাব খোলা হচ্ছে, যেগুলোর প্রতিটিতে দুই কোটি টাকার বেশি অর্থ রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ২০ জন গ্রাহককে তাদের আমানতের টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, ডিজে গার্মেন্টস তাদের ঋণপত্রের (এলসি) বিপরীতে প্রায় ৩১ লাখ টাকা জমা দিয়েছে। রাজধানী ট্রেডার্সের নামেও ৬ লাখ টাকা জমা দেওয়া হয়েছে।
ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মেলিতা মেহজাবীন টিবিএসকে বলেন, 'সকাল থেকে অনেকগুলো শাখা ঘুরেছি। গ্রাহকদের হাসিমাখা মুখ দেখতে পেয়েছি। তারা তাদের চাহিদা অনুযায়ী টাকা তুলতে পারছেন।'
তিনি আরও বলেন, 'গ্রাহকদের সব ধরনের সেবা দিতে বর্তমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ব্যাপক পরিশ্রম করেছে। এই ব্যবস্থাপনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।'
মেহজাবীন বলেন, 'আজ আমাদের সব শাখা ও এটিএম বুথ থেকে টাকা দেওয়া হচ্ছে। কোনো শাখায় গ্রাহকেরা সেবা পেতে বিলম্বের শিকার হলে, বিষয়টি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ করছি।'
৭ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা
ন্যাশনাল ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আর্থিক সংকটে থাকা ব্যাংকটি স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করতে এরই মধ্যে ৭ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক এই অর্থ ধার দিয়েছে।
তবে এই অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ন্যাশনাল ব্যাংককে একগুচ্ছ শর্ত দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে অন্যতম হলো, এ অর্থ থেকে ব্যাংকটির সাবেক বা বর্তমান কোনো পরিচালকের আমানত ফেরত দেওয়া যাবে না। পাশাপাশি, এই অর্থ ব্যবহার করে কোনো ঋণও বিতরণ করা যাবে না।
গত সোমবার ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো চিঠিতে এসব নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চিঠিতে বলা হয়েছে, ধার হিসেবে দেওয়া এই তারল্য সহায়তার সুদহার হবে ১০ শতাংশ এবং মেয়াদ তিন মাস।
এদিকে, গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী আমানতের টাকা ফেরত দিতে গত ১১ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত উত্তোলনের আবেদন সংগ্রহ করে ন্যাশনাল ব্যাংক।
ব্যাংকটির সূত্র জানায়, এই চার দিনে প্রায় ১১ হাজার গ্রাহক মোট ২ হাজার কোটি টাকা উত্তোলনের আবেদন করেছেন। গ্রাহকদের এই চাহিদার কথা দেশজুড়ে ব্যাংকটির শাখাগুলো থেকে প্রধান কার্যালয়কে জানানো হয়। পরে সেই অনুযায়ী শাখাগুলোতে অর্থ সরবরাহ করা হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে কয়েক দিন আবেদনকারী গ্রাহকদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের টাকা ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যাংকটি। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে অন্য গ্রাহকদেরও আমানতের টাকা ফেরত দেওয়া হবে।
