মহাকাশ তুমি কার?
একসময় রাতের আকাশ ছিল মানুষের বিস্ময়ের জায়গা। চাঁদ, সূর্য, তারা আর ধূমকেতু দেখে মানুষ কখনো দেবতার ইশারা খুঁজেছে, কখনো পথ চিনেছে, কখনো মহাবিশ্বের রহস্য ভেদ করার চেষ্টা করেছে। আকাশটা ছিল সবার—কোনো সীমানা ছিল না, মালিকানার দাবিও ছিল না।
মহাকাশের এই নতুন দৌড় কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা নিয়ে নিউ ইন্টারন্যাশনালিস্টে লিখেছেন নিক ডাওসন। তাঁর 'হু ওউন্স আউটার স্পেস?' নিবন্ধে সতর্ক করা হয়েছে, 'নতুন কালের মহাজন', ধনকুবের ও বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর নতুন মহাকাশ প্রতিযোগিতা বৈষম্য বাড়াতে পারে, সংঘাতকে আরও দীর্ঘ করতে পারে, ক্ষতি করতে পারে পরিবেশেরও। তবে ডাওসনের মতে, মহাকাশের ভবিষ্যতের পথ একটিই নয়।
১৮৬৫ সাল। মানুষ তখনো আকাশে উড়তে শেখেনি। মহাকাশে যাওয়ার কথা তো দূরের ব্যাপার। অথচ সেই সময় এক ফরাসি লেখক বসে বসে এমন এক গল্প লিখলেন, যা তাঁর সময়ের মানুষের কাছে প্রায় অসম্ভব কল্পনা ছাড়া আর কিছুই মনে হওয়ার কথা। লেখক জুল ভের্ন। গল্পের নাম 'ফ্রম দ্য আর্থ টু দ্য মুন'। গল্পে বাল্টিমোরের একদল কামানবাজ ঠিক করল, কামান দিয়ে একটা বিশাল গোলা ছুড়ে দেওয়া হবে চাঁদের দিকে। শুধু গোলা নয়—সেই গোলার ভেতর মানুষও থাকবে। অর্থাৎ কামানের গোলাই হবে মহাকাশযান। চার বছর পর গল্পের দ্বিতীয় অংশ 'অ্যারাউন্ড দ্য মুন'-এ সেই গোলা চাঁদের কাছে পৌঁছাল। কিন্তু চাঁদে গিয়ে পড়ল না। চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ তাকে আটকে ফেলল। গোলাটি চাঁদের চারপাশে কক্ষপথে ঘুরতে শুরু করল—হয়ে গেল একধরনের কৃত্রিম উপগ্রহ।
ভের্নের সেই কল্পনার জগৎ থেকে আজকের পৃথিবীতে আসতে লেগেছে ১৬০ বছরের বেশি সময়। এর মধ্যে মানুষ সত্যিই চাঁদে গেছে, মহাকাশ স্টেশনে থেকেছে, দূর মহাকাশে মহাকাশযান পাঠিয়েছে। পৃথিবীর চারপাশে ছড়িয়ে দিয়েছে হাজার হাজার কৃত্রিম উপগ্রহ।
কিন্তু এই সাফল্যের গল্পের ভেতরেই লুকিয়ে আছে নতুন এক প্রশ্ন। তখন প্রশ্ন ছিল, মানুষ কি মহাকাশে যেতে পারবে? এখন প্রশ্ন—মহাকাশ কার?
আজ মহাকাশে মানুষের পাঠানো জিনিসের অভাব নেই। আকাশের দিকে তাকালে যে ছোট ছোট আলোকে অনেক সময় তারা বলে ভুল হয়, তার অনেকগুলোই আসলে মানুষের বানানো। উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট।
জুল ভের্নের গল্পে মানুষ কামানের গোলার ভেতর চড়ে চাঁদের দিকে যাচ্ছিল। আজ আমরা হাজার হাজার উপগ্রহ পাঠাচ্ছি পৃথিবীর চারপাশে। তখন প্রশ্ন ছিল—মানুষ কি সত্যিই মহাকাশে যেতে পারবে?
আজ প্রশ্নটা অন্য রকম।
এই মহাকাশের মালিক শেষ পর্যন্ত কে হবে?
মহাকাশের দৌড় শুরু
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানির ভি-২ রকেট ছিল মানুষের বানানো প্রথম বস্তু, যা মহাকাশে পৌঁছেছিল। এরপর ১৯৫৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠাল স্পুটনিক নামের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ। ছোট্ট গোলাকার সেই উপগ্রহটির ব্যাস ছিল মাত্র ৫৮ সেন্টিমিটার। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ আর নিজের গতির টানে ভারসাম্য রেখে সেটি ঘুরে চলল পৃথিবীর চারপাশে। আর রেডিওতে পাঠাতে থাকল সেই বিখ্যাত—'বিপ, বিপ, বিপ'।
নামটাও কম সুন্দর ছিল না—স্পুটনিক। রুশ ভাষায় যার অর্থ 'সহযাত্রী' বা 'পথের সাথি'। সত্যিই তো, পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে থাকা ছোট্ট সেই গোলকটি যেন মানুষের নতুন এক যাত্রার সঙ্গী হয়ে উঠেছিল। আকাশের অন্ধকারে ঘুরতে ঘুরতে সে শুধু 'বিপ, বিপ, বিপ' সংকেতই পাঠাচ্ছিল না; পৃথিবীর মানুষকে জানিয়ে দিচ্ছিল, মানবজাতি মহাকাশের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবীর নানা প্রান্তে মানুষ সেই অদ্ভুত সংকেত শুনল। আর সেদিনই, অনেকটা সবার অজান্তে শুরু হয়ে গেল মহাকাশে আধিপত্য বিস্তারের সেই দীর্ঘ দৌড়। পরের লক্ষ্য চাঁদ।
১৯৫৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের চালকহীন লুনা-২ চাঁদে পৌঁছাল। আর ১৯৬৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপোলো-১১-এ চড়ে মানুষও চাঁদের মাটিতে পা রাখল।
এরপর মহাকাশ নিয়ে মানুষের কল্পনার সঙ্গে বাস্তবের দূরত্ব দ্রুত কমতে লাগল।
মহাকাশ দুরবিন পাঠানো হলো। সেগুলো পৃথিবীর মানুষের সামনে খুলে দিল গ্যালাক্সি আর মহাবিশ্বের অকল্পনীয় সব দৃশ্য। এর আগে এমন দৃশ্য কেবল কল্পকাহিনিতেই দেখা যেত।
কিন্তু গত ১০-১৫ বছরে মহাকাশে আরেক ধরনের দৌড় শুরু হয়েছে। রকেট ছোড়া বেড়েছে। বেড়েছে জ্বালানি পোড়ানো। আর পৃথিবীর চারপাশের কক্ষপথ ভরে উঠেছে উপগ্রহ আর উপগ্রহে। এই দশকের শুরুতে কক্ষপথে ছিল প্রায় ২ হাজার উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট। এখন সেই সংখ্যা ১৫ হাজার ছাড়িয়েছে। মহাকাশে ঢুকে পড়ছে বেসরকারি ব্যবসা। ধনকুবের আর বণিকেরা। কক্ষপথে 'চর' দখলের এই নতুন দৌড়ে সবচেয়ে বড় নাম এখন ইলন মাস্কের স্পেসএক্স।
২০১৮ সালের মে মাসে স্পেসএক্সের ফ্যালকন-৯ রকেটে গ্রেস-এফও মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির যৌথ এই মিশনে দুটি স্যাটেলাইট ব্যবহার করে পৃথিবী ও তার বায়ুমণ্ডলের ভর এবং বিভিন্ন অস্বাভাবিক পরিবর্তন পরিমাপ করা হয়। কিন্তু মহাকাশে যত বেশি জিনিস পাঠানো হচ্ছে, ততই প্রশ্ন উঠছে—এর পরিবেশগত মূল্য কত?
ডার্কস্কাই নামের একটি সংগঠন রাতের আকাশ রক্ষা ও আলোকদূষণ কমানোর কাজ করে। সংগঠনটির প্রধান নির্বাহী রাসকিন হার্টলি বলছেন, মহাকাশে পাঠানো প্রতিটি স্যাটেলাইট শেষ পর্যন্ত কক্ষপথ থেকে নেমে আসে। তখন বায়ুমণ্ডলে পুড়ে যায় এবং বায়ুমণ্ডলের গঠনেও পরিবর্তন ঘটায়। তাঁর কথা খুব সহজ, মহাকাশে পাঠানোর আগে ভালো করে দেখে নেওয়া দরকার, আমরা আসলে কী করতে যাচ্ছি। আকাশেও তৈরি হচ্ছে নির্ভরতা।
কক্ষপথের স্যাটেলাইটগুলোর বড় অংশ এখন স্পেসএক্সের।
চলতি বছরের জুনে কোম্পানিটি প্রথমবার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য শেয়ার ছাড়ে। এমনভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি সাজানো হয়েছে, যাতে নাসডাক শেয়ার সূচকে দ্রুত অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে বহু পেনশন তহবিল স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এর শেয়ার কিনে ফেলে।
শেয়ারের দাম যদি পরে বোঝা যায় বাস্তব মূল্যের তুলনায় অনেক বেশি ছিল, তাহলে জনগণের সম্পদের বিপুল অংশ চলে যেতে পারে বেসরকারি কোম্পানির হাতে। আর সেই অর্থেই যদি মাস্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবসার ঝুঁঁকি পুষিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? এক মুরগিকে দুবার জবাই করা—একেই বলে!
স্পেসএক্স একই সঙ্গে এক্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মালিক।
স্টারলিংক দিয়ে স্যাটেলাইট যোগাযোগের বাজারে এবং রকেট উৎক্ষেপণের বাজারে কোম্পানিটি দ্রুত আধিপত্য তৈরি করেছে। এখন মহাকাশ আর শুধু বিজ্ঞানীদের গবেষণার জায়গা নয়। আমরা জিপিএস ব্যবহার করি। আবহাওয়ার খবর পাই। যোগাযোগ করি। নজরদারি চলে উপগ্রহের মাধ্যমে। অর্থাৎ মহাকাশের ওপর আমাদের নির্ভরতা বাড়ছে।
স্পেস ওয়াচ ইউকে নামের সংস্থাটি মহাকাশের সামরিকীকরণ ও করপোরেট দখলের বিরুদ্ধে কাজ করে। সংগঠনটির পিটার বার্টের কথায়, দৈনন্দিন জীবনের অনেক কিছুই এখন মহাকাশব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। অবস্থান, পথনির্দেশ, সময় নির্ধারণ, আবহাওয়ার পূর্বাভাসসহ অনেক কিছু। আর একটা বড় সমস্যা হলো, মহাকাশপ্রযুক্তির প্রায় সবকিছুরই সামরিক ব্যবহার করা যায়।
যে প্রযুক্তি দিয়ে আবহাওয়ার খবর পাওয়া যায়, সেটিই অন্য কাজে বা নজরদারিতেও ব্যবহার করা সম্ভব। অর্থাৎ বেসামরিক মহাকাশ আর সামরিক মহাকাশকে আলাদা করা দিনকে দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
মূল্য চুকায় কারা
মহাকাশের ব্যবসায় পুঁজি জোগায় জনগণ। ঝুঁকিও নিচ্ছে জনগণ। কিন্তু লাভের দরজাটা চিচিং ফাঁক—বেসরকারি কোম্পানির জন্য। রকেট উৎক্ষেপণের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক জায়গা সাধারণত দুর্গম অঞ্চল—মেরু কিংবা বিষুবরেখার কাছাকাছি। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার প্রধান মহাকাশকেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে ফরাসি গায়ানার কুরোতে। ফরাসি গায়ানা ফ্রান্সের একটি বিদেশি প্রশাসনিক অঞ্চল।
এখন নতুন উৎক্ষেপণকেন্দ্রের জন্যও বিভিন্ন দেশ ছুটছে। চীন জিবুতিতে মহাকাশকেন্দ্র বানাতে চাইছে। তুরস্ক সোমালিয়ায় তৈরি করছে। ইতালি কেনিয়ায় আবার মহাকাশকেন্দ্র চালুর সম্ভাবনা দেখছে।
এখানে একটা পুরোনো গল্প আবার ফিরে আসে।
মহাকাশের দৌড় যত এগোচ্ছে, পৃথিবীর দরিদ্র আর প্রান্তিক মানুষের জমিজমা ততই চলে যাচ্ছে নতুন নতুন উৎক্ষেপণকেন্দ্র, সামরিক ঘাঁটি আর মহাকাশ অবকাঠামোর দখলে। আকাশের দিকে তাকালে মনে হয়, মহাকাশে বুঝি কোনো সীমানা নেই। কিন্তু পা মাটিতে রাখলেই দেখা যায়, এখানে সীমানা আছে। জমির মালিকানা আছে। ক্ষমতার হিসাব আছে।
আর সেই হিসাবের সবচেয়ে পুরোনো নিয়মটাই এখানে খাটে—যার টাকা বেশি, তার ক্ষমতাও বেশি।
'মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য—একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না?'
পৃথিবীতে এই গানের কথার যতবার প্রয়োগ হয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব হয়ে যেন দেখা গেছে মহাকাশে। সেখানে একসময় পাশাপাশি কাজ করেছে এমন দুই দেশের মানুষ, যাদের দেশের মাটিতে তখনো শত্রুতার রাজনীতি। মহাকাশে গিয়ে তারা বুঝেছে—ওপরে উঠলে হয়তো পৃথিবীর সীমারেখাগুলো একটু ঝাপসা হয়ে যায়।
মহাকাশ অবশ্য সব সময় যুদ্ধ আর প্রতিযোগিতার গল্প ছিল না। বরং কখনো কখনো সেখানে সহযোগিতার এমন কিছু দৃশ্য তৈরি হয়েছে, যা পৃথিবীর রাজনীতিকে লজ্জায় ফেলে দিতে পারে।
১৯৭৫ সালের জুলাই মাস। মহাকাশে মুখোমুখি হলেন মার্কিন নভোচারী টমাস স্ট্যাফোর্ড এবং সোভিয়েত মহাকাশচারী আলেক্সেই লিওনভ। তারপর বাড়িয়ে দিলেন হাত। দুই শত্রু পরাশক্তির দুই মহাকাশচারীর সেই করমর্দন ছিল শুধু দুই ব্যক্তির হাত মেলানো নয়; পৃথিবীর নিচে চলতে থাকা দীর্ঘ স্নায়ুযুদ্ধের মাঝখানে যেন এক মুহূর্তের জন্য অন্য রকম পৃথিবীর দরজা খুলে দেওয়া।
সত্তরের দশকেই মানুষ পাঠিয়েছিল ভয়েজার-১ ও ভয়েজার-২। প্রথমে তাদের কাজ ছিল বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন ঘুরে দেখা। তারপর তারা এগিয়ে গেল সৌরজগতের বাইরের অন্ধকারের দিকে। পৃথিবীর মানুষ আর কত দূর যেতে পারে—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যেন দুই দূত একসময় আমাদের পরিচিত মহাজগতের সীমানাও পেরিয়ে গেল।
এরপর এল আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্র বা স্পেস স্টেশন।
২০০০ সালের ২ নভেম্বর থেকে সেখানে সব সময়ই মানুষ বসবাস করছে। পৃথিবীর চারপাশে একবার ঘুরে আসতে স্টেশনটির সময় লাগে মাত্র ৯০ মিনিট। অর্থাৎ সেখানে থাকা মানুষ দিনে ১৬ বার সূর্যোদয় আর ১৬ বার সূর্যাস্ত দেখতে পায়। ভাবুন তো—আমরা যেখানে এক সূর্যোদয় আর এক সূর্যাস্ত দেখেই দিন গুনি, সেখানে মহাকাশ স্টেশনের মানুষ এক দিনেই ১৬ বার করে দুটোই দেখেন।
কিন্তু সেই দৃশ্য দেখতেই তারা সেখানে যাননি। তাঁদের কাজের চাপও কম নয়। কউ নতুন ওষুধ তৈরির গবেষণা করছেন। কেউ দেখছেন, মাধ্যাকর্ষণহীন পরিবেশে মানুষের শরীরে কী ঘটে। কেউ পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণ করছেন। কেউ বিশ্লেষণ করছেন মহাজাগতিক কণা।
তবু স্টেশনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হয়তো এসব পরীক্ষার মধ্যেও নয়। সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব—মানুষের একসঙ্গে কাজ করে যাওয়া। পৃথিবীতে তখন রাশিয়া আর যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক যতই টানাপোড়েনের হোক, মহাকাশ স্টেশনে তাদের নভোচারীরা পাশাপাশি থেকেছেন, কাজ করেছেন। একই জায়গায় খেয়েছেন, একই যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেছেন, একই বিপদের মুখোমুখি হয়েছেন। কারণ, সেখানে জাতীয় পতাকার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় একটি সাধারণ সত্য—বাঁচতে হলে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
স্টেশনে মানুষের ঘাম আর মূত্র পুনর্ব্যবহার করে প্রায় ৯৮ শতাংশ পানি ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা রয়েছে। পৃথিবীতে যে জিনিসকে আমরা ফেলে দেওয়ার কথা ভাবি, মহাকাশে সেটাই আবার ঘুরেফিরে জীবন বাঁচানোর পানিতে পরিণত হয়। অবশ্য এত প্রযুক্তির পরও মানুষ তো মানুষই।
সাতজন মানুষকে দীর্ঘদিন একটা সীমিত জায়গায় একসঙ্গে রাখলে গন্ধ হবেই। মহাকাশ স্টেশনের বাতাস পরিশোধনের ব্যবস্থা সেই গন্ধ পুরোপুরি দূর করতে পারে না।
খাবারের অবস্থাও খুব একটা রাজকীয় নয়। খাবারে গরম পানি মিশিয়ে আবার খাওয়ার উপযোগী করতে হয়। আর মাধ্যাকর্ষণ না থাকায় খাবারের ছোট ছোট টুকরো যাতে বাতাসে ভেসে বেড়াতে না পারে, সেদিকেও নজর রাখতে হয়। অর্থাৎ মহাকাশে গিয়ে মানুষ শুধু বিজ্ঞান শেখেনি। শিখেছে একসঙ্গে থাকার অদ্ভুত এক ব্যাকরণও।
ব্রিটিশ নভোচারী টিম পিক ২০১৫ সালের ডিসেম্বর থেকে সেখানে ছয় মাস কাটিয়েছিলেন। তাঁর কাছে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন শুধু বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার ছিল না। এটি ছিল মানুষ কীভাবে একটি সাধারণ লক্ষ্য সামনে রেখে একসঙ্গে কাজ করতে পারে, তার জীবন্ত উদাহরণ। পৃথিবীতে আমরা বলি—'ভাই ভাই থাকে না স্বার্থের লীলায়।'
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনও ধীরে ধীরে বুড়িয়ে যাচ্ছে। সেখানে ফাটল দেখা দিয়েছে, বাতাস বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি জুন মাসে একটি ঘটনায় স্টেশনের মানুষকে সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩১ সালে স্টেশনটিকে কক্ষপথ থেকে নামিয়ে দেওয়া হবে।
তারপর?
তার জায়গায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য অন্তত একটি বেসরকারি মালিকানাধীন, কিন্তু সরকারি অর্থে তৈরি মহাকাশ স্টেশন আসতে পারে। অর্থাৎ যে মহাকাশ স্টেশন মানুষের বহু দেশের সহযোগিতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল, তার উত্তরাধিকার এবার বেসরকারি মালিকানার হাতে যাওয়ার পথে।
আর চীন তো এই সহযোগিতার বাইরে ছিলই। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস চীনকে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের অংশীদার হতে দেয়নি। তাই চীন ইতিমধ্যেই নিজের মহাকাশ স্টেশন তৈরি করেছে। রাশিয়াও নিজেদের মডিউল আলাদা করে নিজস্ব ব্যবস্থা তৈরির কথা ভাবছে।
তাহলে ছবিটা কী দাঁড়াল?
একদিকে ছিল 'সমস্ত মানবজাতির জন্য' মহাকাশের সেই স্বপ্ন। এমন এক জায়গা, যেখানে দেশের সীমান্ত পেরিয়ে মানুষ একসঙ্গে কাজ করবে। কিন্তু এখন সগৌরবে ফিরে আসছে রাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা, সামরিক স্বার্থ আর বেসরকারি ব্যবসার হিসাব। অথচ একসময় মানুষ পৃথিবীর সীমানা পেরিয়ে আকাশে উঠেছিল। ভেবেছিল, সেখানে হয়তো নতুন কোনো নিয়ম তৈরি করা যাবে। একটু কম শত্রুতা, একটু বেশি সহযোগিতা, আর সবার জন্য একটুখানি জায়গা।
কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে মানুষ যেখানে যায়, তার সঙ্গে তার পৃথিবীটাও সেখানে পৌঁছে যায়।
মহাকাশের সেই সুন্দর অধ্যায়েরও তাই শেষ হচ্ছে।
মহাকাশে যুদ্ধের রণভেরি!
'ওরে আয়, ওই মহাসিন্ধুর পার হতে রণভেরি শোনা যায়'—কাজী নজরুল ইসলামের এই পঙ্ক্তিতে 'মহাসিন্ধু'র জায়গায় আজকের কোনো জেন-জেড কবি যদি 'মহাকাশ' বসিয়ে দেন, খুব একটা বাড়াবাড়ি হবে না। বরং বাস্তবতার সুরটাই যেন আরও জোরেশোরে বেজে উঠবে। কারণ, মানুষ যে মহাকাশে গিয়েছিল স্বপ্ন নিয়ে, সেই মহাকাশেই এখন বাজছে যুদ্ধের রণভেরি।
ষাটের দশকে যখন মহাকাশ নিয়ে আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন তৈরির চেষ্টা চলছিল, তখন একটা বড় কথা ছিল—মহাকাশ কোনো দেশের সম্পত্তি নয়। ১৯৬৭ সালের মহাকাশ চুক্তিতে বলা হলো, কোনো দেশ মহাকাশ বা চাঁদসহ অন্য কোনো মহাজাগতিক বস্তুর ওপর নিজের সার্বভৌমত্ব দাবি করতে পারবে না। মহাকাশ থাকবে সব দেশের ব্যবহারের জন্য। চাঁদ বা অন্য মহাজাগতিক বস্তুকে সামরিক ঘাঁটি বানানোর পথও বন্ধ করা হলো। আর কক্ষপথে পারমাণবিক অস্ত্র বা অন্য গণবিধ্বংসী অস্ত্র বসানো যাবে না।
স্বপ্নটা ছিল সুন্দর। মহাকাশ থাকবে যুদ্ধের বাইরে। পৃথিবীর নিচে দেশগুলোর যত ঝগড়াঝাঁটি থাকুক, অন্তত মাথার ওপরের আকাশটা থাকবে সবার। কিন্তু পৃথিবী তো আর চুক্তির কাগজ মেনে চলে না সব সময়।
মহাকাশ ধীরে ধীরে হয়ে উঠল সামরিক শক্তির নতুন ক্ষেত্র। উপগ্রহ দিয়ে নজরদারি করা যায়, যোগাযোগ করা যায়, অবস্থান নির্ণয় করা যায়, ক্ষেপণাস্ত্রের গতিবিধি সম্পর্কে সতর্ক হওয়া যায়। ফলে যে জিনিস একসময় বিজ্ঞানীর চোখে গবেষণার যন্ত্র ছিল, সামরিক বাহিনীর চোখে সেটিই হয়ে উঠল যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। আর তাই উপগ্রহ ধ্বংস করার অস্ত্রও তৈরি হলো।
চীন ২০০৭ সালে নিজের একটি আবহাওয়া উপগ্রহকে ভূমি থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রও ২০০৮ সালে একটি উপগ্রহ ধ্বংস করার সক্ষমতা দেখিয়েছিল। ভারত ২০১৯ সালে উপগ্রহবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করে। রাশিয়াও ২০২১ সালে একই ধরনের পরীক্ষা চালায়।
এখানে বিপদটা শুধু যুদ্ধ নয়। মহাকাশে কোনো উপগ্রহ ভেঙে গেলে তার টুকরাগুলো ঘণ্টায় হাজার হাজার কিলোমিটার বেগে ছুটতে পারে। একটি ধ্বংস হওয়া উপগ্রহ তাই শুধু একটি সামরিক সম্পদ হারানোর ঘটনা নয়; তার ধ্বংসাবশেষ অন্য উপগ্রহের জন্যও বিপদ হয়ে উঠতে পারে।
অর্থাৎ যুদ্ধ করতে গিয়ে মহাকাশটাকেই এমন জায়গায় পরিণত করার ঝুঁকি আছে, যেখানে পরে শান্তিপূর্ণ কাজ করাটাও কঠিন হয়ে পড়বে। আর এখন সেই আশঙ্কার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন এক নাম—গোল্ডেন ডোম।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মূল অংশ ভূমিতে থাকলেও এর পরিকল্পনায় মহাকাশভিত্তিক ব্যবস্থাও রয়েছে। স্যাটেলাইট দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত, অনুসরণ এবং সম্ভাব্যভাবে মোকাবিলার কথা বলা হচ্ছে। এমনকি কক্ষপথে অস্ত্র রাখার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
তখন প্রশ্নটা আর শুধু এই নয়—মহাকাশ কার? প্রশ্নটা হয়ে দাঁড়ায়—মহাকাশে যুদ্ধ শুরু হলে পৃথিবীর কী হবে?
কারণ, আজকের পৃথিবী উপগ্রহের ওপর এমনভাবে নির্ভরশীল যে মহাকাশে বড় ধরনের সংঘাতের ধাক্কা শুধু সেনাবাহিনীর ওপর পড়বে না। যোগাযোগ, ব্যাংকিং, নেভিগেশন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস—সবকিছুর ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। যে আকাশকে মানুষ একদিন সীমান্তহীন ভেবেছিল, সেখানে এখন আবার সীমান্ত টানা হচ্ছে। যে মহাকাশকে বলা হয়েছিল 'সমস্ত মানবজাতির জন্য', সেখানে ক্রমেই শোনা যাচ্ছে সামরিক শক্তির পদশব্দ।
তবে এই রণ-উন্মাদনারও অবশ্য বিরোধিতা হচ্ছে। ওয়েলসের পেমব্রোকশায়ারে নতুন একটি রাডারকেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনার বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষ আন্দোলনে নেমেছেন। তাঁদের ভয়, নিজেদের অঞ্চলকে যদি উপগ্রহ শনাক্ত করা কিংবা হামলার কাজে ব্যবহার করা হয়, তাহলে একদিন তাঁদের এলাকাই হামলার লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপেও সামরিকীকরণের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চলছে। দ্বীপটির আন্দোলনকর্মী সুং-হি চোইয়ের কথায়, মহাকাশকেন্দ্রগুলো জেজুর সামরিকীকরণের সঙ্গে যুক্ত হলেও কর্তৃপক্ষ তা খুব কমই সরাসরি স্বীকার করে।
চোইয়ের অভিযোগ, বিষয়টি শুধু জেজুতে আটকে নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর মহাকাশশিল্পের প্রসারের নামে সারা বিশ্বেই সামরিকীকরণ বাড়ছে। অর্থনীতির চেহারাও বদলে যাচ্ছে। সামরিক বাহিনী, প্রযুক্তি কোম্পানি আর মহাকাশ ব্যবসার স্বার্থ যেন ধীরে ধীরে একই সুতোয় গাঁথা পড়ছে।
লাভের গুড় পিঁপড়ায় খায়। সেই গুড়ের ভাগ বসিয়েছে সামরিক বাহিনী, করপোরেশন আর বণিক সংঘগুলো। আর তার খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। তাদের দৈনন্দিন জীবন আরও বেশি করে সামরিকীকরণের আওতায় ঢুকে পড়ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ, নষ্ট হচ্ছে প্রতিবেশব্যবস্থার ভারসাম্য।
আমাদের নতুন মহাজাগতিক জমিদার
এবার গল্পটা আরও একটু দূরে নিয়ে যাওয়া যাক।
মানুষের পাঠানো পাঁচটি মহাকাশযান এরই মধ্যে সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে গেছে। বা সেই পথে এগিয়ে চলেছে। সবচেয়ে দূরে রয়েছে ভয়েজার-১। ১৯৭৭ সালে পৃথিবী থেকে যাত্রা শুরু করেছে এই মহাকাশযান। এত দিনে পৃথিবী থেকে সূর্যের গড় দূরত্বের ১৭০ গুণের বেশি দূরে পৌঁছে গেছে। প্রতিদিনই সে দূরত্ব আরও বাড়ছে। অথচ প্রায় ২ হাজার ৫৫০ কোটি কিলোমিটার দূরে থেকেও ভয়েজার-১ এখনো নিজ দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করছে।
মানুষ অবশ্য শুধু মহাকাশযানই পাঠায়নি। পৃথিবীর কক্ষপথের বাইরেও পাঠিয়েছে নানা রকম জিনিস। এর মধ্যে আছে একটি আস্ত গাড়িও—টেসলা রোডস্টার। গাড়িটির চালকের আসনে বসানো হয়েছে একটি পুতুল। ইলন মাস্কের খেয়ালেই ২০১৮ সালে গাড়িটি মহাকাশে পাঠানো হয়েছিল। ধারণা করা হয়, কোটি কোটি বছর ধরে এটি সূর্যকে ঘিরে ঘুরে বেড়াতে পারে। কখনো কোনো ভিনগ্রহের প্রাণী যদি সেটি খুঁজে পায়? গাড়ির ভেতরে বসানো পুতুলটির দিকে তাকিয়ে তারা হয়তো গালে হাত দিয়ে ভাববে—এ কোন সভ্যতা, যারা মহাকাশে পৌঁছে প্রথমেই একটা আস্ত গাড়ি ফেলে গেছে!
মহাকাশে জিনিস পাঠানোর এই ব্যবসায় সিলিকন ভ্যালির ধনকুবেরদের প্রবেশ এখন সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি। এই দৌড়ে বড় নাম আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের মহাকাশ কোম্পানি ব্লু অরিজিন। গুগলের সাবেক প্রধান নির্বাহী এরিক শ্মিটও মহাকাশ ও সামরিক প্রযুক্তির ব্যবসায় অর্থ ঢেলেছেন। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত প্রাণঘাতী ড্রোন তৈরির উদ্যোগের পাশাপাশি রকেট নির্মাতা কোম্পানি রিলেটিভিটি স্পেসেও বিনিয়োগ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র এখনো মহাকাশে সরকারি অর্থ ব্যয়ের দিক থেকে সবার ওপরে। ২০২৪ সালে বিশ্বের মোট সরকারি মহাকাশ ব্যয়ের আনুমানিক ৬১ শতাংশই করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে সেই অর্থ খরচের ধরন এখন বদলে গেছে। এমন এক সময় ছিল, যখন বোয়িং বা লকহিড মার্টিনের মতো বড় অস্ত্র ও মহাকাশ কোম্পানিকে সরাসরি টাকা দেওয়া হতো রকেট, মহাকাশযান বা নানা ধরনের যন্ত্রপাতি তৈরির জন্য।
এখন নাসা ও তার অংশীদারেরা অনেক ক্ষেত্রে বেসরকারি কোম্পানিকে নতুন মহাকাশযান তৈরি করার জন্য অর্থ দেয়। কাজ শেষ হলে আবার সেই কোম্পানির কাছ থেকেই উৎক্ষেপণ কিংবা মহাকাশযাত্রার সেবা কেনে। অর্থাৎ ব্যবসার পুঁজি আসে সরকারি কোষাগার থেকে। ঝুঁকির বড় অংশও থাকে সরকারের ঘাড়ে। কিন্তু ব্যবসা দাঁড়িয়ে গেলে মুনাফার মালিকানা থাকে বেসরকারি কোম্পানির হাতে। এ যেন মাছের তেলে মাছ ভাজার মহাকাশ সংস্করণ। তেলও আপনার, মাছও আপনার—শুধু ভাজা শেষে মুচমুচে মাছটা চলে গেল অন্যের পাতে! কথাটা নিছক রসিকতা নয়। মহাকাশ অর্থনীতিতে সরকারি অর্থ কীভাবে বেসরকারি মুনাফার ভিত্তি হয়ে উঠছে, তারই একটি ছবি এটি।
দুনিয়াজুড়ে কোভিড-১৯ বিশ্বমারির সময় টিকা তৈরির ক্ষেত্রেও আমরা সরকারি অর্থ, সরকারি সহায়তা ও বেসরকারি কোম্পানির সমন্বয়ে এমন মডেল দেখেছি। মহাকাশের ব্যবসাতেও এখন সেই আদল ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বিজ্ঞান থেকে ব্যবসা
স্পেসএক্সের স্টারলিংক এরই মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বীদের অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে। ভবিষ্যতে এটি বিশ্বের অন্যতম বড় ইন্টারনেট সেবা সরবরাহকারী হয়ে উঠতে পারে। ইউক্রেনের যুদ্ধ থেকে ইরানের বিক্ষোভ—বিভিন্ন সংকটের সময়ও স্টারলিংকের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু মহাকাশে বাণিজ্যের বিস্তার যত বাড়ছে, ততই বিজ্ঞান আর ব্যবসার মধ্যে টানাপোড়েনও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
স্পেসএক্স কক্ষপথে ১০ লাখ স্যাটেলাইট পাঠানোর আবেদন করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব স্যাটেলাইট সৌরশক্তিচালিত তথ্যকেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। বিজ্ঞানীরা অবশ্য এতে উদ্বিগ্ন। তাঁদের আশঙ্কা, আকাশে এত বিপুলসংখ্যক স্টারলিংক স্যাটেলাইট ছড়িয়ে পড়লে রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণ আরও কঠিন হয়ে উঠবে। মহাকাশ থেকে পৃথিবীর দিকে তাকানোর পাশাপাশি পৃথিবী থেকে মহাকাশ দেখাটাও যে বিজ্ঞানের জন্য জরুরি!
অন্যদিকে মহাকাশের সম্পদ নিয়েও শুরু হয়েছে নতুন এক দৌড়। ১৯৬৭ সালের মহাকাশ চুক্তি বলছে, মহাকাশ, চাঁদ কিংবা অন্য কোনো মহাজাগতিক বস্তু কোনো দেশ নিজের জাতীয় ভূখণ্ড বা সম্পত্তি হিসেবে দাবি করতে পারবে না। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে মহাকাশের সম্পদ নিয়ে ব্যবসার দরজা পুরোপুরি বন্ধ। বরং সেই দরজা খুলতেই বিভিন্ন দেশ এখন আইন তৈরি করছে।
২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি আইন করে, যাতে মার্কিন নাগরিক ও কোম্পানিগুলো মহাকাশ থেকে সংগ্রহ করা সম্পদের মালিকানা দাবি করতে পারে। ২০১৭ সালে লুক্সেমবার্গও মহাকাশের সম্পদের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানার অধিকার স্বীকৃতি দেওয়া দেশগুলোর কাতারে যোগ দেয়।
এরপর শুরু হলো আরও এক অদ্ভুত অধ্যায়। ২০২০ সাল থেকে নাসা চাঁদের মাটি, অর্থাৎ রেগোলিথ কেনার জন্য চারটি প্রতীকী চুক্তি করে। চুক্তিগুলোর অর্থের পরিমাণ ছিল খুবই সামান্য। এমনকি চাঁদের মাটি সত্যিই নাসার হাতে তুলে দিতে হবে—এমন বাধ্যবাধকতাও ছিল না। জাপানের আইস্পেস তো শুধু তাদের চন্দ্রযানের পায়ে লেগে থাকা রেগোলিথ সংগ্রহের ঘোষণা দিয়েছিল।
শুনতে তুচ্ছ ব্যাপার। চাঁদের মাটির একটু ধুলো—তাতে আবার কী! কিন্তু আইনের চোখে বিষয়টি মোটেই তুচ্ছ নয়। কারণ, আজ যদি চাঁদের মাটি কেনাবেচার ধারণা স্বাভাবিক হয়ে যায়, কাল কি চাঁদের খনিজও কেনাবেচা হবে? তার পরদিন কেনাবেচা হবে কী কোনো গ্রহাণুর সম্পদ? আর একদিন কি মহাকাশের কোনো অংশ নিয়েও উঠবে মালিকানার দাবি? প্রশ্নগুলো এখন কল্পকাহিনির মতো শোনালেও মহাকাশে বণিকের মানদণ্ড সে পথেই এগিয়ে চলেছে। তাই এই ঘটনাগুলোকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই। তবে এ চলার ইতি কোথায়? মালিকানার নামে নতুন মোড়কে উপনিবেশের এই দৌড় গিয়ে থামবে কোথায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
এদিকে নতুন মহাকাশ কোম্পানিগুলো সামরিক চুক্তির ওপরও ক্রমে বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। চলতি জুনেই স্পেসএক্স আকাশে থাকা লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও অনুসরণে সামরিক বাহিনীকে সহায়তার জন্য ৪০০ কোটি ডলারের একটি চুক্তি পেয়েছে। অর্থাৎ মহাকাশে বিজ্ঞান আর ব্যবসার সীমারেখা ঝাপসা হচ্ছে। বাণিজ্য আর সামরিক স্বার্থের মাঝের দূরত্বও কমছে। একসময় মহাকাশ ছিল বিজ্ঞানীদের স্বপ্নের জায়গা। এখন সেখানে বিজ্ঞানীর পাশে ব্যবসায়ী, আর ব্যবসায়ীর পাশে সামরিক বাহিনীও এসে দাঁড়িয়েছে।
আবার জুল ভের্নের কাছে ফিরে আসি
১৮৬৫ সালে জুল ভের্ন যখন মানুষকে একটা বিশাল কামানের গোলার ভেতর ভরে চাঁদের দিকে পাঠাচ্ছিলেন, তখন তাঁর কল্পনার সবচেয়ে বড় সীমা ছিল প্রযুক্তি।
মানুষ কি মহাকাশে যেতে পারবে? ভের্ন সেই সীমাটাই ঠেলে দিয়েছিলেন। তাঁর গল্পে মানুষ চাঁদের দিকে ছুটেছিল। গোলাটি চাঁদের মাধ্যাকর্ষণের টানে কক্ষপথে ঘুরেছিল। তখন মহাকাশ ছিল বিস্ময় আর অজানার এক জগৎ। সেখানে পৌঁছানোই ছিল মানুষের স্বপ্ন।
আজ আমরা সেই স্বপ্ন থেকে অনেক দূর এগিয়ে এসেছি। মানুষ চাঁদে গেছে। মহাকাশ স্টেশনে থেকেছে। দূর মহাকাশে মহাকাশযান পাঠিয়েছে। পৃথিবীর চারপাশে হাজার হাজার উপগ্রহ বসিয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে একটা অদ্ভুত পরিবর্তনও ঘটেছে। তখন প্রশ্ন ছিল, মানুষ কি মহাকাশে যেতে পারবে? এখন প্রশ্ন, মহাকাশ কার?
যে মহাকাশকে একসময় 'সমস্ত মানবজাতির' সম্পদ ভাবা হয়েছিল, সেখানে আজ রাষ্ট্রের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে গেছে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী কয়েকজন মানুষ ও তাঁদের করপোরেশন। মহাকাশ যেন হয়ে উঠছে এক নতুন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুনিয়া! মহাকাশের নতুন মহাজনরা শুধু আকাশে ব্যবসা করতে আসেনি, তারা আকাশের সম্পদের ওপর ভবিষ্যতের সুদের হিসাবও কষছে।
ইলন মাস্ক, জেফ বেজোস এবং তাঁদের মতো 'লর্ড ক্লাইভ'দের হাতে মহাকাশের যোগাযোগব্যবস্থা, উৎক্ষেপণব্যবস্থা, তথ্যপ্রবাহ—সবকিছুর ওপর ক্রমেই বড় নিয়ন্ত্রণ তৈরি হচ্ছে। মহাকাশকে তাঁরা শুধু নতুন সীমান্ত হিসেবে দেখছেন না, দেখছেন নতুন বাজার হিসেবেও। আর বাজার যেখানে ঢোকে, সেখানে মালিকানার প্রশ্নও আসে।
আজ উপগ্রহ। কাল চাঁদের মাটি। পরশু হয়তো গ্রহাণুর খনিজ।
তারও পরে কী হবে?
জুল ভের্নের যুগে মানুষ মহাকাশের দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখত। আজ আমরা সেই মহাকাশের দিকে তাকিয়ে আরেকটি প্রশ্ন করতে বাধ্য হচ্ছি—যে আকাশটা সবার মাথার ওপর, সেটারও যদি একদিন মালিক হয়ে বসেন কয়েকজন কোটিপতি, তখন পৃথিবীতে আমাদের নিজেদের বলে আর কী থাকবে? তখন প্রশ্ন ছিল, মানুষ কি মহাকাশে যেতে পারবে? এখন প্রশ্ন, মহাকাশ তুমি কার?
