আলোকচিত্রের ১০ মহাজন ১০ ছবি
'ফটোগ্রাফি'—শিল্পমাধ্যমের সবচেয়ে নবতর সংযোজন হলেও এই শিল্পের বয়স এখন ২০০ বছর। ১৮৩৯ সালের ১৯ আগস্ট—ফরাসি সরকার এই দিনকে 'বিশ্ব আলোকচিত্র দিবস' হিসেবে ঘোষণা করলেও এই শিল্পের বাস্তব ভিত্তি গড়ে ওঠে ১৮২৬ সালে। এই প্রচেষ্টার মূল মানুষ ছিলেন সেই দেশের জোসেফ নিসেফোর নিপেস ও লুই ডাগুয়ের। বাংলাদেশে যে কয়েকজন আলোকচিত্রশিল্পীর কাজের মধ্য দিয়ে সৃজনশীল আলোকচিত্রশিল্পের সাবালকত্ব লাভ করে—গোলাম কাসেম ড্যাডি, নাইব উদ্দিন আহমেদ, আমানুল হক, ড. নওয়াজেশ আহমদ, মনজুর আলম বেগ, সাইদা খানম, বিজন সরকার, রশীদ তালুকদার, আজিজুর রহমান ও আনোয়ার হোসেন তাঁদের অন্যতম। আলোকচিত্রের ২০০ বছর ও বিশ্ব আলোকচিত্র দিবস উপলক্ষে এসব পথিকৃৎ আলোকচিত্রশিল্পীর তোলা ১০টি কালজয়ী ছবি নিয়ে এই রচনা। এই ছবিগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে বিশ শতকে বাংলার দৃশ্য-ইতিহাসের মূল ধারাটি।
সহদোরা
পাশাপাশি দাঁড়ানো দুটি মেয়ে। একজনের স্নেহের হাত আরেক জনের কাঁধে। দুজনের গায়ে কালো পাড়ের সাদা শাড়ি। তেলে জবজবে কালো চুলের মাঝখানে সূক্ষ্ম সিঁথি। চোখে মায়া জড়ানো সারল্য। দুজনের চোখ ঠিক ক্যামেরার দিকে নয়। একজনের মুখে মৃদু হাসি। আরেকজনের কৌতূহলী দৃষ্টি। দেখে মনে হয় ক্যামেরার পেছন থেকে ইশারায় কেউ তাদের ডাকছে। মেয়ে দুটির পেছনে কালো কাপড়ের পর্দা। ওপরের দিকে একটু সাদা অংশ বের হয়ে আছে। তাতে একটা কার্ভ লাইন তৈরি হয়েছে। ১৯২১ সালে গোলাম কাসেম ড্যাডির তোলা এই ছবি গ্লাস প্লেট নেগেটিভ যুগের এক অপূর্ব নিদর্শন।
ড্যাডি যখন এই ছবি তোলেন, তখন ভারতবর্ষে বাঙালি মুসলমান মেয়েদের ছবি তোলা ছিল এক দুঃসাহসিক ব্যাপার! কোনো মুসলমান মেয়ে তখন ঘর থেকে বের হতেন না; স্বেচ্ছায় ক্যামেরার সামনে আসতে চাইতেন না। মেয়েদের ছবি তোলার ব্যাপারটি ধর্মীয় দৃষ্টিতে গর্হিত কাজ বলেও তখন বিবেচিত হতো।
এই ছবির মূল নেগেটিভটি আছে দৃক পিকচার লাইব্রেরির সংগ্রহে। তাদের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ছবিটি ১৯২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের মেদেনীপুর থেকে তোলা। এতটুকু তথ্য ছাড়া এই ছবির মেয়ে দুটি কে, কী তাদের পরিচয়, ছবিটা কেমন করে তোলা সম্ভব হলো—এসবের কোনো কিছুই কারও জানা ছিল না। তবে ছবিটির সমস্ত তথ্য ও রহস্য বেরিয়ে আসে অনেকটা কাকতালীয়ভাবে।
ছয় বছর আগে স্থাপত্য অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান স্থপতি অধ্যাপক শাহ আলম জাহিরউদ্দিনের ছবি তুলতে তাঁর মনিপুরীপাড়ার বাসায় যাই। কথায় কথায় জানলাম, ড্যাডি তাঁর খালুশ্বশুর। তার স্ত্রী সেলিমা জাহিরকে বললাম, 'ড্যাডির একটা আইকনিক ছবি আছে। দেখেন তো, এই ছবির মেয়ে দুটিকে চিনতে পারেন কি না?' ছবিটা দেখে তিনি চিৎকার করে উঠলেন। বললেন, 'আরে, এত তো আমার মা জাহান আরা আর মেজ খালা জামাল আরা!' তিনি তাঁর ছোট মামা ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শফির ফোন নম্বর দিয়ে যোগাযোগ করতে বললেন।
ক্যাপ্টেন শফি যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী। হোয়াটসঅ্যাপে আমি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনিই ছবিটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানান। এই ছবিটি যখন তোলা হয়, তখন তাঁর জন্ম হয়নি। তবে বাবার কাছে তিনি এই ছবি তোলার গল্প শুনেছেন। ছবিটি দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরস্থ তাঁদের ১৭ নম্বর টার্ফ রোডের বাড়িতে তোলা। ১৯২০ সালে এই বাড়িতেই তাঁর ফুফাতো বোন হোসেনে আরার সঙ্গে ড্যাডির বিয়ে হয়। বিয়ের কয়েক মাস পর নতুন দম্পতি তাঁদের বাসায় বেড়াতে আসেন। তখন বিশাল আয়োজন করে তাঁর দুই বোনের ছবিটি তোলা হয়।
নদী ও রাখাল
ব্রহ্মপুত্র নদে নৌকার গলুইয়ে বসে বাঁশিতে সুর তুলছেন মাথায় গামছা বাঁধা এক গ্রাম্য রাখাল। তার শরীরে রোদের ছায়া। দূরে প্রজাপতির মতো পাল তোলা নৌকা। আকাশে বর্ষার মেঘ। নদী আর আকাশের মাঝ বরাবর মিশে গেছে দূরের গ্রাম; অনেকটা কালো রেখার মতো। নাইব উদ্দিন আহমেদের তোলা গ্রামবাংলার যত আইকনিক ছবি রয়েছে, এই ছবি তার অন্যতম। নাইব উদ্দিনের ফটো অ্যালবাম 'আমার বাংলা'র প্রচ্ছদ ছবি এটি। ছবিটির ক্যাপশনে উল্লেখ করা হয়—'ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে, ময়মনসিংহ, ১৯৬২'।
এই ছবির পটভূমি জানতে নাইব উদ্দিনের কনিষ্ট পুত্র নওফেল আহমেদ পান্থর সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনিই জানালেন, এই রাখালের নাম সুরুজ মিয়া। তার বাড়ি ময়মনসিংহ শহরের মাসকান্দা এলাকার দিগারকান্দায়। পিতার নাম কাঞ্চন মুনশি। ১৯৭৩ সালে নাইব উদ্দিনের ময়মনসিংহের বাসায় আসেন ১২ বছরের সুরুজ। তিনি নাইব উদ্দিনের গরু পালতেন ও বাগান পরিচর্যা করতেন। পান্থ জানালেন, ছবিটি ১৯৮১ সালের ২৩ মে দুপুরে তোলা। বললেন, ছবি তোলার বৃত্তান্তও।
ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায় কালিরবাজার বলে একটা বিখ্যাত হাট আছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে ওই হাটের দূরত্ব কম করে হলেও ১০ মাইল। একদিন সকালে হাটের উদ্দেশ্যে দুলাল মাঝির নৌকায় করে নাইব উদ্দিন রওনা হলেন কালিরবাজারে। সঙ্গে পান্থ, সুরুজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সহকর্মী। নাইব উদ্দিন ব্রহ্মপুত্রের দুই পাড়ের ছবি তুলতে ব্যতিব্যস্ত। হঠাৎ নৌকার গলুইয়ে বসে বাঁশিতে সুর তুললেন সুরুজ। ঠিক ওই সময় একটা পালতোলা নৌকা আসছিল তাঁদের দিকে। নাইব উদ্দিন তাঁর জাদুকরী রোলিফ্লেক্সে মন্ত্র পাঠ করে নদী-নৌকা আর রাখালের নাটকীয় এক্সপ্রেশন ফ্রেমে ধরলেন।
অলস মধ্যাহ্ন
মাঝদুপুরে রাস্তার ধারে অলস সময় কাটাচ্ছেন তিনজন ছিন্নমূল নারী। কম্পোজিশনের খাতিরেই হয়তো এক নারীর পুরো শরীর ছবিতে রাখা হয়নি। মাঝখানে যিনি হাঁটু উঁচিয়ে পেছনমুখ করে বসে আছেন, তাঁর মাথায় উকুনের দঙ্গল। দুই হাত দিয়ে তিনি উকুন ছাড়াতে ব্যস্ত। তাঁর এলোমেলো চুলে বিলি কাটছে এক নেংটা শিশু। আরেকটি শিশু নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে তাঁর নরম কোলে। পাশের নারীটি বসে আছেন পা বিছিয়ে। তাঁর পায়ের ওপরও আরেকটি ঘুমন্ত শিশু। দুপুরের আহার শেষে খাওয়ার জন্য পান বানাচ্ছেন। ১৯৫২ সালের কোনো এক দিনে কলকাতা রেলস্টেশনের কাছে এই ছবিটি তোলেন আমানুল হক। তিনি ছবিটি নাম দেন 'অলস মধ্যাহ্ন'। ওই বছর কলকাতার প্রগতিশীল ত্রৈমাসিক 'নতুন সাহিত্য'র শারদীয় সংখ্যার (অক্টোবর-ডিসেম্বর ১৯৫২, কার্তিক-পৌষ ১৩৫৯) মুখপাতে ছবিটি ছাপা হয়। এই ছবি ছাপা হওয়ার পর দুই বাংলার শিল্পমহলে বেশ সাড়া পড়ে যায়।
ওই সময় ছবিটি যাঁকে বেশি নাড়া দেয়, তিনি বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়। সত্যজিৎ ছবিটিকে মানবিক সংবেদনশীলতার প্রতিনিধিত্বশীল চিত্র হিসেবে প্রশংসা করেন। ছবিটিকে তিনি বিশ্বসেরা ফরাসি আলোকচিত্রী হেনরি কার্তিয়ের ব্রেসোঁর আলোকচিত্রের সঙ্গে তুলনা করেন।
সত্যজিৎ একদিন আমানুলকে বললেন, 'আপনাকে এমন একজন ফটোগ্রাফারের ছবি দেখাব, যাঁর মতো পৃথিবীতে কেউ জন্মায়নি; কোনো দিন জন্মাবেও না—হেনরি কার্তিয়ের ব্রেসোঁ!...আপনি আমাকে যে ছবিটি দিয়েছেন, ঠিক ওই রকম।' আমানুল তখনো ব্রেসোঁর নাম জানতেন না। সত্যজিৎ বললেন, 'ব্রেসোঁ আমাকে খুব স্নেহ করেন।'
সংগ্রাম
বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে নূরানীগঙ্গা নদী। সবাই একে আদর করে বলে, 'নলগোলা'। নলগোলা গিয়ে মিশেছে কালীগঙ্গার সঙ্গে। নলখোলার ঢেউগুলো মাথায় রুপালি টোপর পরে আছড়ে পড়ছে বাড়ির সামনের সিঁড়ির ঘাটে। দূর দিয়ে ধীরগতিতে চলছে সারি সারি পাল তোলা নাও। ঘন নীল আকাশে তুলোর মতো সাদা সাদা মেঘ। শরতের এত রূপ! হাতের ছোট্ট আলোর বাক্সটা ক্লিক করে উঠল। নওয়াজেশ আহমদের যত দূর মনে পড়ে, এটাই তাঁর প্রথম আলোকচিত্র। বড় ভাই নাইব উদ্দিন আহমদের বেবি ব্রাউনি ক্যামেরায় তুলেছিলেন ছবিটা।
১৯৪৭ সাল। দেশ ভাগাভাগির ডামাডোল শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু প্রকৃতি চলছে তার আপন নিয়মে। শরতের আকাশে খণ্ড খণ্ড মেঘ। সেই মেঘপুঞ্জের ছায়া নলগোলার টলটলে জলের আরশিতে ভেসে বেড়ায়। সিঁড়ির ঘাট কিংবা ঘরের জানালা থেকে অবাক বিস্ময়ে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকেন বারো বছরের নওয়াজেশ। একদিন দেখলেন দুজন মাঝি খালি গায়ে নদীর পাড় ধরে গুণ টেনে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। ক্যামেরাটা নিয়ে দৌড়ে গেলেন নদীর পাড়ে। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন। নৌকাগুলো যাচ্ছে, আকাশে তখন রাশি রাশি মেঘ। তিনি অপেক্ষা করতে থাকেন কখন উজানের দিকে যাবে সেই মেঘ। হঠাৎ একটা মেঘের খণ্ড উল্টো দিক থেকে ধেয়ে আসে। তখন নওয়াজেশের মনে হলো—এই মেঘ শুধু স্রোতের বিপরীতেই ধেয়ে আসছে না, প্রকৃতিরও বিপরীতেও যাচ্ছে। ঠিক তখনই তুললেন ছবিটা। মেঘের নাটকীয়তা ধরতে লেন্সের সামনে মেলে ধরলেন লাল সেলোফেন। এ সময় তাঁর শরীরের ভেতর অন্য রকম এক শিহরণ বয়ে গেল। নওয়াজেশ ছবিটির নাম দিলেন—'সংগ্রাম'।
১৯৪৮ সালে কমনওয়েলথ ইনস্টিটিউট লন্ডনে যে আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে সেখানে এই ছবিটা প্রদর্শিত হয়। এই ঘটনা তাঁকে এক উদ্দীপনা জোগায়। নওয়াজেশ মনে করতেন, তাঁর প্রথম সিরিয়াস ফটোগ্রাফি হলো—গুণটানা। ইচ্ছে করেই তিনি ফ্রেমের ভেতর নৌকা দেখাতে চাননি। নৌকা রাখলে মাঝিদের স্ট্রাগলটা এত ডিটেইলে ধরা সম্ভব হতো না। এই ছবি তোলার সময়ই তাঁর মাথায় প্রথম সিম্বলিজমের ধারণা আসে। পরে তো তিনি পুরোদস্তুর পরাবাস্তবতার দিকে ঝুঁকলেন।
১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে নওয়াজেশ আহমদের 'বাস্তবের অন্বেষা' শিরোনামে যে ফটো অ্যালবাম প্রকাশিত হয়, তার ভূমিকায় অধ্যাপক ও শিল্পসমালোচক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম লিখেছিলেন—'তিনি শুরু করেছিলেন সেই স্কুলে পড়ার সময়। প্রথম ছবিতেই তিনি স্বাক্ষর রাখলেন তাঁর প্রখর অন্তর্দৃষ্টির, বলিষ্ঠ জীবন জিজ্ঞাসার এবং শিল্পী মানসের। গুণটানা নামে ছবিটি তিনি তুলেছিলেন নিজ গ্রাম পারিলে। গুণটানা মাঝিরা এগিয়ে যাচ্ছে পরিশ্রম করতে করতে, মেঘের বিপরীতে—এবং এ ছবিটি জীবনের সংগ্রামমুখরতার একটি প্রতীকও বটে। কিন্তু আলোছায়ার পরিমিত ব্যবহারে সে সংগ্রামময়তায় অর্পিত হয় এক সৌন্দর্যের মাত্রা, যা সাধারণ মানুষের পরিশ্রমী জীবনকে মহিমান্বিত করে তোলে।'
ছায়াপুষ্প
নগরের পিচঢালা রাস্তায় সিমেন্টের তৈরি কতগুলো মোটা পাইপ। তপ্ত দুপুরে সেই পাইপের ভেতর শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে দুই শ্রমজীবী। তাঁদের পাশ দিয়ে ধীরগতিতে চলছে একটি নির্মাণসামগ্রীর ট্রাক। প্রাত্যহিক নাগরিক জীবনের এই ছবি দেখে আমার মধ্যে একটু অন্য রকমের অনুভূতি হয়। কঠিন জড়বস্তুর মধ্যে আমি এক প্রাণের সঞ্চার দেখি। সারিবদ্ধ পাইপগুলোর একেকটার ফাঁকা জায়গা দিয়ে আলো ঢুকছে সহজে। সেই আলো হালকা ছায়ার মধ্যে যে বক্রাকার রেখা তৈরি করেছে, তা অনেকটা গোলাপের পাপড়ির চক্রাকার বিন্যাসের মতো মনে হয়। আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগের তোলা এই ছবি স্ট্রিট ফটোগ্রাফির এক অনবদ্য উপস্থাপনা। স্ট্রিট ফটোগ্রাফি হলো ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা।
ছবিটি ঠিক কবে, কোথায় তোলা জানা যায় না। তবে ছবিটির দিকে গভীরভাবে তাকালে এর সম্ভাব্য স্থান ও কাল সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। আন্দাজ করি, ছবিটি স্বাধীনতার পর পর ঢাকায় তোলা। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের রাজধানী শহর তখনো বেশ ফাঁকা। রাস্তায় মানুষের আনাগোনা কম। সড়কে রাখা পয়োনিষ্কাশনের পাইপ আর দূরে ঊর্ধ্বমুখী দালানকোঠা যেন একটি নতুন রাষ্ট্রের অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতীক। বোঝা যাচ্ছে যুদ্ধের ধকল কাটিয়ে রাজধানীর পরিধি বিস্তৃত হচ্ছে।
আলোকচিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান 'কাউন্টার ফটো'র প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ সাইফুল অমির কাছে এই ছবির একাডেমিক মূল্যায়ন জানতে চাই। তিনি লিখলেন—'স্ট্রিট ফটোগ্রফির প্রধান বৈশিষ্ট মূলত দুটো। কম্পোজিশনের চমক আর আলোকচিত্রীর মুহূর্ত ধরতে পারার ক্ষমতা। জগদ্বিখ্যাত প্রায় সব আলোকচিত্রীর কাজে এই বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়া যায়। এই প্রবণতার একটা স্বাভাবিক বিপদ হচ্ছে বেশির ভাগ সময়ই ছবি হয়ে ওঠে আলোকচিত্রীর নিজস্ব ক্ষমতা আর প্রতিভার গুণে। মানুষ সেখানে গৌণ। আলোকচিত্রের সব ধারার মধ্যে স্ট্রিট ফটোগ্রাফি তাই সবচেয়ে বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক। বেগ স্যারের এই বিশেষ ছবিটি স্ট্রিট ফটোগ্রাফির সব প্রথা ভাঙা এক ছবি—যার একটার পর একটা তলা। রাস্তায় পড়ে থাকা মানুষ, অন্তহীন যাতনার অতল জীবন—যার চক্কর থেকে বের হয়ে আসার ক্ষমতা তার নাই। আলোর খেলা, বাঁয়ে চলমান গাড়ি, যা জীবনেরই সিম্বল। দমবন্ধ করা পাইপের ভেতর আটকে যাওয়া জীবন—আর কে এমন করে বলতে পারে গল্প; দারিদ্র্যের, বেঁচে থাকার—এইখানেই বেগ স্যার সবার থেকে আলাদা।
হাতির ট্রেন
কাপ্তাই লেকের তীর ধরে চলছে সারিবদ্ধ হাতির পাল। স্বচ্ছ কাচের মতো লেকের নীল জলে এসে পড়ছে দুপুরের আলো। শান্ত জলে ভাসছে কয়েকটি জেলে নাও। আকাশে হালকা তুলোর মতো আষাঢ়ের মেঘ। দূর-দিগন্তে মিশে গেছে ছোট পাহাড়। শিল্পীরা কল্পনায় যে নিসর্গ আঁকার কথা ভাবেন, এই ছবিটা ঠিক সেই রকম। ছবিটা বিজন সরকারের তোলা। তিনি ঐতিহাসিক এই ছবিটার নাম দিয়েছিলেন 'দ্য রিলিজিয়াস ফেইথ'। যে কয়েকটা ছবির জন্য মানুষজন বিজন সরকারকে চেনে—এই ছবিটা তার অন্যতম। ছবিটা শৈল্পিক দৃষ্টিতে দেখলে মনে হয়, রেললাইনের ওপর দিয়ে ট্রেন চলছে ধীর গতিতে। আর হাতিগুলোকে মনে হয় একেকটি বগি।
এই ছবি তোলার একটি চমকপ্রদ গল্প আছে। ১৯৭৪ সালের ১৭ জুন ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিদর্শনে যান। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের আলোকচিত্রী হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাপ্তাই সফরের ছবি তোলার দায়িত্ব পান বিজন সরকার। রাষ্ট্রপতির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে পাহাড়ি এলাকার ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে ২৪টি পোষা হাতি আনা হয়। অনুষ্ঠান শেষে হাতিগুলো সীতাপাহাড় সংরক্ষিত বনের দিকে রওনা দেয়। বিজন সরকার পর্যটনের মোটেলের ছাদে ওঠেন। মোটেলের সামনেই ছিল একটা শিমুল গাছ। শিমুল ডালের ফাঁকে তিনি ধরলেন তার মামিয়া ক্যামেরা। দুটি ছবি তুলেই বুঝতে পারলেন প্রত্যাশিত মুহূর্তটি পেয়ে গেছেন তিনি।
ছবিটা ১৯৭৭ সালে জাপানে এশিয়া কালচারাল সেন্টার ফর ইউনেসকো আয়োজিত আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান লাভ করে। ১৯৮০ সালে সাইপ্রাসে অনুষ্ঠিত প্রথম কমনওয়েলথ ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ফেস্টিবলে পায় সার্টিফিকেট অব মেরিট। ১৯৮৫ সালে ডিএফপি থেকে আলোকচিত্রশিল্পী আনোয়ার হোসেনের সম্পাদনায় 'বাংলাদেশ: লাইফ অ্যান্ড কালচার' নামে যে ফটো অ্যালবাম প্রকাশিত হয়, তার দুই পৃষ্ঠাজুড়ে ছবিটি ছাপা হয়।
এই অ্যালবামের মুখবন্ধে ছবিটি সম্পর্কে সম্পাদক লিখেছেন—'রাঙামাটির এক বিস্তৃত দৃশ্যপট। মানুষ ও প্রকৃতি—উভয়ের জন্যই এক উৎসবমুখর দিন; রাজার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্দেশ্যে এগিয়ে চলেছে বিশাল হাতির মিছিল, যাদের বিশালতার কাছে মানুষ যেন নিতান্তই ক্ষুদ্র; আর সেই মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে আছে কোমল মেঘমালা ও দূরবর্তী পাহাড়শ্রেণি। সৃজনশীলতার অনন্য প্রকাশভঙ্গিতে একজন আলোকচিত্রী হয়তো কোনো সূক্ষ্ম ও আবেগঘন ক্লোজআপ ছবির চেয়ে এক অসীম বিস্তৃত দৃশ্যপটকেই অধিক পছন্দ করতে পারেন। বিজন সরকারও তাই বিশালদেহী ও জাঁকালো হাতিগুলোর জৌলুসে মুগ্ধ না হয়ে বরং মৃদু মর্মর শিমুলপাতার সূক্ষ্ম আবহে প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ছবিতে ফুটিয়ে তুলেছেন।'
ভুবন ভোলানো হাসি
শ্যামল মেয়েটির মুখে ভুবন ভোলানো হাসি। রুপার দানার মতো তার দাঁত। নাকফুলটা যেন হাসি দিয়ে আছে বোতাম ফুলের মতো। হাসির ভাঁজে লেগে আছে রোদের নরম ছায়া। গলায় তিন লহরের রুপার শিকলি। ভেজা চুলের পানিতে ভিজে গেছে তার মলিন শাড়ি। ব্লাউজবিহীন মেয়েটির শরীরের কর্মছাপ আর নির্মল হাসিটা রোলিকর্ড ক্যামেরায় ধরলেন সাইদা খানম। ১৯৬১ সালের মার্চ মাসে 'বেগম'-এর ঈদসংখ্যায় ছাপা হলো ছবিটা। আর তাতেই চারদিকে হইচই পড়ে গেল।
সাইদা খানমর তখন থাকতেন তার মেজ বোন অধ্যাপিকা হামিদা খানমের বাসায়। বকশীবাজারের ১০ নম্বর জয়নাগ রোডে ছিল তাদের বাসা। মেয়েটি তাদের বাসায় গৃহসহায়ক হিসেবে কাজ করত। থাকত পাশের একটি বস্তিতে। পত্রিকায় মেয়েটির ছবি ছাপা হওয়ার খবর এ-বাড়ি, ও-বাড়ি হয়ে পুরো মহল্লায় ছড়িয়ে পড়ে। মহল্লার লোকজন সাইদা খানমের বাড়ির সামনে এসে বিক্ষোভ শুরু করে। বিক্ষোভকারীদের কথা—'ক্যামেরাওয়ালা মেয়েটির কত বড় সাহস! নিজে মেয়ে হয়ে কী করে আরেকটি মেয়েকে বে-আব্রু করে ছবি তোলে!'
সাইদা খানমের ভগ্নিপতি অধ্যাপক এ এফ সালাহউদ্দীন আহমদ তখন রাজশাহী কলেজে ইতিহাসের শিক্ষক। মহল্লার লোকজন তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে। তিনি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেন। লোকজন খুবই ক্ষুব্ধ। তারা বলতে শুরু করল—'এই অপরাধের একটা বিহিত হওয়া দরকার।' সব শুনে তিনি শান্তভাবে বললেন, 'যার ছবি ছাপা হয়েছে, সে আমাদের বাসারই মেয়ে এবং ছবিটি তার সম্মতিতেই পত্রিকা অফিসে পাঠানো হয়েছে।' সালাহউদ্দীন আহমদের কথায় আশ্বস্ত হয়ে সেদিন তারা ঘরে ফিরে যায়।
ছবিটি তোলার পেছনের গল্পটিও বেশ চমকপ্রদ। একদিন সকালে তিনি দেখেন, তাদের বাসার মেয়েটি গোসলের পর কাপড় শুকাতে ছাদে যাচ্ছে। তার গায়ে ব্লাউজ নেই। ওই সময় কেবল অবস্থাপন্ন পরিবারের মেয়েরাই শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজ পরত। দরিদ্র মেয়েদের পক্ষে ব্লাউজ পরা সম্ভব ছিল না। মেয়েটিকে দেখে সাইদা খানমের মনে হয়, এটাই বাংলার নারীদের সংগ্রামের চিরন্তন রূপ। তিনি ছাদে গিয়ে মেয়েটির ছবি তুললেন। ছবিটার কারণে যে এত বিড়ম্বনায় পড়তে হবে, তা তার কল্পনায়ও আসেনি।
সাইদা খানমের সেজ বোনঝি ডা. সারা ফাতিমার কাছে মেয়েটির নাম জানতে চাইলাম। তিনি কিছু বলতে পারলেন না। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমার লেখা 'একজন সাইদা খানম' প্রকাশিত হয়। বইটা দিতে গেলাম সাইদা খানমের সেজ বোন মমতাজ হাসানের বাসায়। বড় ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটা দেয়ালে ঝুলছে। তাঁর কাছে ছবির মেয়েটির পরিচয় জানতে চাইলাম। বহু চেষ্টা করেও তিনি নাম স্মরণ করতে পারলেন না।
প্রতিবাদী পথশিশু
একটি সাদাকালো ছবি আমাদের আবেগকে প্রচণ্ডভাবে আলোড়িত করে। ইতিহাসের এক বিশেষ অধ্যায়ে যাঁরা বেড়ে উঠেছেন, তাঁরা জানেন কী অসাধারণ শক্তি জুগিয়েছিল ছবিটি। উনসত্তরের উত্তাল রাজপথে খালি গায়ে মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে স্লোগান দিয়ে চলেছে এক পথশিশু, পেছনে বিক্ষুব্ধ ছাত্রসমাজ। মিছিলের সামনে থাকা ওই পথশিশুর নেতৃত্বে যেন বঞ্চিত মানুষরা অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এগিয়ে চলছে। শিশুটির কণ্ঠে স্বৈরতন্ত্রের কবর রচনার হুংকার। দৃঢ় চোয়ালে অগ্নিস্পর্ধী সাহসিকতার বহিঃপ্রকাশ। পাঁজরগুলো যেন তিরের ফলার মতো শরীরের ভেতর থেকে বের হয়ে আসতে চায়। মিছিলের অগ্রভাগে থাকা অপ্রতিরোধ্য শিশুটি সেদিন সবার নজর কেড়েছিল। ছবিটি পরবর্তী সময়ে উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের আইকনিক ছবিতে পরিণত হয়। এই ছবি আমাদের সংগ্রামী অতীতকে স্মরণ করিয়ে দেয়। শিশুটির চোখ-মুখের ভাষা মনে করিয়ে দেয় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়নের কথা। ছবিটির দৃশ্য-ভাষা এতই শক্তিশালী যে, এর অন্তর্নিহিত বাণী এখনো মানুষের মনে শিহরণ জাগায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আহ্বান জানায়। এই ছবির স্রষ্টা রশীদ তালুকদার।
অনেকে মনে করেন, ছবিটি ১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারি স্বতঃস্ফূর্ত হরতালের দিনে তোলা। আসলে না। ছবিটি তোলা হয় হরতালের ৩-৪ দিন পর। তখন কারফিউ উঠে গেছে। কিন্তু দাবানল থামেনি। উনসত্তরে কিন্তু ছবিটি ছাপাও হয়নি। ছবিটি প্রথম ছাপা হয় ১৯৭০ সালের ১ জানুয়ারি 'দৈনিক সংবাদ'-এর বর্ষপরিক্রমা ক্রোড়পত্রে। দুই কলাম ভার্টিক্যাল ছবিটির নিচে লেখা হয়—'মুক্ত করো ভয়/ আপন মাঝে শক্তি ধরো/ নিজেরে করো জয়।'
কেমন করে এই ছবি আইকনিক হলো জানতে চাই—উনসত্তরে ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় কর্মী ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হকের কাছে। তিনি বললেন, 'ছবিটি আইকনিক হয়েছে উনসত্তরের পরে, পরবর্তী আন্দোলনে। আইকনিক হওয়া না-হওয়া নির্ধারণ করে 'সময়'। এই ছবির যে অন্তর্নিহিত বাণী, তা অনেক বেশি শক্তিশালী। কম্পোজিশন, কনটেন্ট ও ডিসাইসিভ মোমেন্ট সব মিলিয়ে রশীদ তালুকদারে ছবিটি মানুষের কাছে প্রতীক হয়ে ওঠে। ফলে পরবর্তী সময়ে সংবাদপত্রের পাতায় বারবার ছবিটি ছাপা হয়েছে। ইতিহাস আসলে এভাবেই লেখা হয়।'
ধানসিঁড়ি নদী
রাজশাহীর আঁচলঘেঁষা ধানসিঁড়ি নদী। নিথর স্বচ্ছ জল। সিলুয়েটে হারিয়ে যাওয়া থরথর সুদূর গ্রাম। কমলা-নীল আকাশের সাদা-কালোয় সাদামাটা পবিত্র নিস্তব্ধতা। দিবাশেষের শেষ সূর্যের ঘুমটি যখন পাচ্ছিল, তখন পথহারা এক টুকরো মেঘ সূর্যকে আলিঙ্গন করে বলে—'যেতে নাহি দিব'। এসবের সাক্ষী এক গোছা কাশবন আর কোনো এক রমণী। প্রকৃতির আলিঙ্গনে কাঁখে কলসি হাতে বালতি নিয়ে ধরা পড়লেন আজিজুর রহমানের লেন্সে। জানি না, এই নদীর ঘাটে শিল্পী আজিজুর রহমান অস্তমান রবিকে শুধিয়েছিলেন কি না—'কে তুমি?' আজিজুর রহমানের 'ধানসিঁড়ি নদী' শিরোনামের ছবি নিয়ে এই কথাগুলো লিখেছিলেন বরেণ্য আলোকচিত্রশিল্পী আনোয়ার হোসেন।
রাজশাহীতে ধানসিঁড়ি নদীর অস্তিত্ব নেই। আনোয়ার হোসেন হয়তো রূপক অর্থেই 'রাজশাহীর আঁচলঘেঁষা ধানসিঁড়ি নদী' লিখেছেন। আজিজুর রহমানের এই ছবিতে তিনি হয়তো জীবনানন্দ দাশের ধানসিঁড়ির রূপ দেখতে পেয়েছিলেন।
মাত্র ৩৭ বছরের জীবন ছিল আজিজুর রহমানের। এত স্বল্পায়ু জীবনে তিনি বিপুলা বাংলার কত না রূপ ক্যামেরায় ধরেছেন! পঞ্চাশের দশকে নাইব উদ্দিন, আমানুল আর নওয়াজেশ এ দেশে সৃজনশীল আলোকচিত্রের যে ধারা তৈরি করেছিলেন, আজিজুর রহমান যেন সে পথেই হাঁটছিলেন। ষাট ও সত্তর দশকের পত্র-পত্রিকা, সাময়িকপত্র আর বিভিন্ন ছবির বইয়ের পৃষ্ঠা ওল্টালে এই সত্যতার প্রমাণ মেলে।
পার্লামেন্ট
দূরে জাতীয় সংসদ ভবন। ভবনে ওঠার প্রথম সিঁড়িতে দুই হাত বাড়িয়ে চিত হয়ে শুয়ে আছেন এক শিল্পী। তার পরনে কালো কাপড়। পা দুটি সংসদ ভবনের দিকে। আর সাদা মুখোশটি পড়ে আছে রাস্তায়। মুখে ভাষা নেই। এ যেন শিল্পীর নীরব প্রতিবাদ। এই ছবির বাঁদিকের ফ্রি স্পেসে ঢুকে গেছে একটি হাত। আনোয়ার হোসেনের 'নার্সিসিজম' বা আত্মমগ্নতা সিরিজের একটি শক্তিশালী ছবি এটি। নার্সিসিজমের অন্তর্নিহিত বক্তব্য হলো ছবিতে নিজের অস্তিত্বের জানান দেওয়া।
নার্সিসিজম সিরিজটা কবে শুরু করেছিলেন—'কাউন্টার ফটো' ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আনোয়ার হোসেন বলেছিলেন, জন্মের পর থেকেই। মানে যেদিন থেকে বাংলাদেশের পানিতে নিজের চেহারা দেখলেন বা মায়ের চোখের দিকে তাকালেন। লোকে বলে, আনোয়ার তাঁর মায়ের কার্বনকপি। আবার ছেলে মেঘদূতও নাকি আনোয়ারের মতো দেখতে। সেই থেকে আনোয়ার হোসেনের মধ্যে আত্মরতির বোধ আসে।
১৯৯২ সালের মে মাসে এবি পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হয় আনোয়ার হোসেনের বিখ্যাত ফটো অ্যালবাম 'ঢাকা পোর্ট্রেট'। এই অ্যালবামের ৫৬ নম্বর পৃষ্ঠায় ছাপা হয় জাতীয় সংসদ ভবনের ছবিটি। ছবির ক্যাপশনে লেখা—'ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলী, ১৯৮৫'। আর ছবিটির বিবরণীতে লেখা—'অ্যান এমিনেন্ট মাইম আর্টিস্ট অব বাংলাদেশ, পার্থ প্রতিম মজুমদার ইন হিজ অ্যাক্ট অন দ্য নর্দান স্টেপস অব জাতীয় সংসদ বিল্ডিং ডিজাইন বাই দ্য ইউএস আর্কিটেক্ট লুই আই. খান'। আবার ১৯৯৭ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে 'নার্সিসিজম ভিএস ইন্ট্রোসপেকশন' শিরোনামে যে আলোকচিত্র প্রদর্শনী হয়, তার ক্যাটালগে এই ছবির ক্যাপশনে লেখা হয়—'পার্লামেন্ট, ঢাকা, ১৯৮১'। ধারণা করি, সালের এই হেরফের অনিচ্ছাকৃত। তবে ছবিটি ১৯৮৫ সালে তোলা বলেই প্রতীয়মান হয়।